সন্দ্বীপে মনোনয়নকে ঘিরে আন্তঃকোন্দল চরমে

আওয়ামী লীগে আস্থা মিতা বিএনপিতে দুই পাশা

নির্বাচনী হাওয়া: চট্টগ্রাম-৩

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

দেশভাগ পূর্ব সময়ে এদেশীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সন্দ্বীপ। চট্টগ্রামের মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ উপজেলাটি নানা দিক থেকে পিছিয়ে আছে। এই উপজেলায় স্পর্শ করেছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দল রয়েছে চট্টগ্রাম-৩ আসন সন্দ্বীপে। প্রধান দুই দলে রয়েছেন প্রায় এক ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী। তারা যদি মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করেন তা হলে সন্দ্বীপে জয় পাওয়া দুই দলের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।

প্রায় তিন লাখ জনগণ অধ্যুষিত সন্দ্বীপের শিক্ষার হার মাত্র ৫১.৫ শতাংশ। আবার ৬৯৩ কিলোমিটার সড়কের ৪৮৪ কিলোমিটারই কাঁচা। বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের আওতায়ও নেই বেশি এলাকা। অবহেলিত সন্দ্বীপ থানাকে ১৯৮৪ সালে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। সন্দ্বীপে দুইবার সংসদ সদস্য ছিলেন প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমান। তার প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সন্দ্বীপ পৌরসভা। বর্তমানে পৌরসভা এবং ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে সন্দ্বীপের উপজেলা। মুস্তাফিজুর রহমানের হাত ধরে এই দ্বীপ উন্নয়নের যে ছোঁয়া পেয়েছে তা অব্যাহত আছে এখনো। দ্বীপবন্ধু হিসেবে যিনি এখনো দ্বীপের মানুষের কাছে পরিচিত। তার প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে মূল্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে সন্দ্বীপে নৌকার দায়িত্ব দিয়েছে তার সন্তান মাহফুজুর রহমান মিতাকে।

এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এ আসন থেকে নৌকার প্রার্থী। সেবার জিতেছিল বিএনপি। দ্বিতীয় হয়েছিলেন মিতা। তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। মিতা ২০০৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। যদিও পরে আর সে নির্বাচন হয়নি। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মিতা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে বাবা মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে ছেলে মাহফুজুর রহমান মিতা স্নেহভাজন হয়ে আছেন। ঢাকায় বসবাসের সুবাধে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তার ওঠা-বসাও বেশি।

অন্যদিকে এবারের সংসদ নির্বাচনে সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মাস্টার শাহজাহান, স্বাধীনতা চিকিৎক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী, পৌর চেয়ারম্যান জাফর উল্লাহ টিটু এবং উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আকরাম খান দুলাল। এদিকে সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যারা উপজেলা চেয়ারম্যান মাস্টার শাহজাহান, ডা. জামাল আর পৌর চেয়ারম্যান জাফর উল্লাহ টিটুর বিরোধী তারাই বর্তমান এমপি মিতার অনুসারী। বর্তমান এমপি মিতার প্রতিদ্বন্দ্বী এই তিন নেতার অনুসারীরা বর্তমানে বেকায়দায়। পালিয়ে বেড়াচ্ছে। গত ৩০ জুলাই সন্দ্বীপে অবস্থানকালে ডা. জামালের গাড়িবহরে হামলা হয়। এ ঘটনার জন্য ডা. জামাল বর্তমান সংসদ সদস্য মিতাকে দায়ী করে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন। ছাত্রলীগে, যুবলীগে এখন মিতার রমরমা অবস্থা। এলাকায় মিতার ভালো ভোট ব্যাংক আছে বাবার কারণে। আর এখন নিজেরও কিছু অনুসারী তৈরি করতে পেরেছেন। এমন নানা যোগ-বিয়োগে মিতার পাল্লা বেশ ভারী। আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌঁড়ে মিতার কাছাকাছি কেউ নেই।

প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, ‘দ্বীপের মানুষ আমার পিতার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে দ্বীপবন্ধু উপাধি দিয়েছিল। পিতার হাত ধরে আমার রাজনীতিতে আসা। সন্দ্বীপের এক নম্বর সমস্যা হলো বিদ্যুৎ না থাকা। ফাইবার অপটিক্যালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিড থেকে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগ যাওয়ার কাজ প্রায় ৬০ শতাংশ শেষ। আশা করা যাচ্ছে চলতি বছরেই জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতে আলোকিত হবে সন্দ¦ীপ। দ্বীপের ভাঙন রোধে খুব দ্রুততম সময়ে বেডিবাঁধে ব্লক এবং আরসিসি ঢালাইয়ের টেন্ডার হবে। এই উন্নয়ন কর্মকান্ড অব্যাহত রাখতে দ্বীপবাসী নৌকায় ভরসা রাখবে। আর দলীয় হাইকমান্ড আমার ওপর আস্থা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।’ এলাকায় দলীয় কোন্দল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাঝে কোনো কোন্দল নেই। প্রতিযোগিতা আছে। দলকে সমৃদ্ধ করতে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র থেকে শুরু করে সবাই আমরা একযোগে কাজ করি।’

সন্দ্বীপের নির্বাচনী ইতিহাস ঘেঁটে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্দ্বীপ স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালে মুসলিম লীগ, স্বাধীনতা পরবর্তীতে বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা হলেও এখানে মুস্তাফিজ পরিবার জাতীয় নির্বাচনে ফ্যাক্ট। সন্দ্বীপ থেকে ১ম সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এম ওবায়দুল হক, ২য় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন গণফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী এ কে এম রফিক উল্লাহ চৌধুরী, ৩য় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবং ৪র্থ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে এমপি হন অ্যাডভোকেট এ কে এম শামসুল হুদা। ৫ম সংসদ নির্বাচনে আ.লীগের জন্য আসনটি উদ্ধার করেন আলহাজ মুস্তাফিজুর রহমান। কিন্তু ৯৬-এর ৬ষ্ঠ নির্বাচনে এমপি হন বিএনপি প্রার্থী আলহাজ মোস্তফা কামাল পাশা। ৮ম ও ৯ম সংসদ নির্বাচনে তিনি আবার এমপি নির্বাচিত হলেও ৭ম নির্বাচনে এমপি হয়ে ছিলেন আ.লীগ প্রার্থী আলহাজ মুস্তাফিজুর রহমান। ১০ম নির্বাচনে সাবেক এমপি প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমানের জ্যৈষ্ঠ পুত্র এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আলহাজ মাহফুজুর রহমান মিতা নির্বাচিত হয়ে আসনটি আওয়ামী লীগের জন্য ধরে রেখেছেন। তবে গেল ৮ বছর ৮ মাসে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দলীয় কর্মীসহ ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে মগধারা ইউনিয়নে।

অন্যদিকে সন্দ্বীপে গ্রুপ-উপগ্রুপে বহুদা বিভক্ত বিএনপি। অধিকাংশ নেতাই এলাকায় সক্রিয় নন। সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপি রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট দ্বিধাবিভক্ত হলেও উপজেলা জামায়াতের সমর্থন রয়েছে তাদের প্রতি। বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন সাবেক এমপি মোস্তফা কামাল পাশা। তিনি কৌশলগতভাবে এগিয়ে আছেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের ধারণা। তবে তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চান চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য নুরুল মোস্তফা খোকন, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু তাহের। বিভক্তি দূর না হলে সন্দ্বীপ উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৩ আসনে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া বিএনপির জন্য কঠিন হবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (একাংশের) প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন সাবেক এমপি সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তফা কামাল পাশা এবার মনোনয়ন পেতে পারেন। এর আগে তিনি এমপি থাকাকালে অনেক উন্নয়ন করেছেন। মোস্তফা কামাল পাশাকে প্রতিনিধি হিসেবে বাছাই করবে সন্দ্বীপের মানুষ।’

এদিকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) থেকে আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুকতাদের আজাদ খান নির্বাচন করতে পারেন। এর বাইরে মহাজোট থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন হরিশপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির সন্দ্বীপ উপজেলা সভাপতি এম এ সালাম।

 

"