শক্ত অবস্থানে আ.লীগ চ্যালেঞ্জে বিএনপি

আ.লীগের আস্থা শাহজাহান খান, বিএনপির একাধিক প্রার্থী

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

আবদুল্লাহ আল মামুন, মাদারীপুর

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের দিন-তারিখ ঘোষণা হয়নি এখনো। তবে এরই মধ্যে মাদারীপুর-২-এর নির্বাচনী এলাকার সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। সারা দেশের মতোই বিভিন্ন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নানা কৌশলে এখন মাঠে থাকছেন। ভোটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময়ের পাশাপাশি করছেন গণসংযোগ। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোয়ও থাকার চেষ্টা করছেন তারা। এলাকার মোড়ে মোড়ে সাজানো হয়েছে প্রার্থীদের ছবিসংবলিত বিলবোর্ড ও ব্যানার। তারা নানা অজুহাতে প্রত্যন্ত এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-২ আসনে ছয়বার আওয়ামী লীগ, দুবার বিএনপি, একবার জাতীয় পার্টি ও একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় লাভ করেন। আসনটি পৌরসভাসহ সদর উপজেলার ১০টি ও রাজৈর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এতে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ২৯ হাজার ১০০।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় জেলায় দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নড়াচড়া চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিনের রাজনীতিতে থাকায় আওয়ামী লীগের আস্থা বর্তমান নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের ওপর। তবে জেলা সংগঠনের প্রথম সারির নেতার নামও শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপিতে শোনা যাচ্ছে একাধিক প্রার্থীর নাম। ফলে আন্তদলীয় প্রতিযোগিতায় নামতে হয়ে প্রার্থীদের। এ ছাড়া অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরাও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করতে চাইছে নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে।

আওয়ামী লীগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশব স্মৃতিবিজড়িত মাদারীপুর বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর সদরে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রয়াত মৌলভি আচমত আলী খান। তার উত্তরসূরিতা ধরে রেখেছেন ছেলে বর্তমান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এ আসন থেকেই সর্বশেষ নির্বাচনেও এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তা ছাড়া পরিবহন শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের ওপর তার একচ্ছত্র প্রভাব ও স্থানীয় জনপ্রিয়তার বলে আসন থেকে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ আসন থেকেই ছয়বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ফলে মনোনয়নের কাঁটা পুরোপুরি তার দিকেই ঝুঁকে থাকবে বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা। তবে সংগঠনের ভেতর থেকেই আরেক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে মনোনয়ন দৌড়ে বর্তমান এমপিকেই এগিয়ে রাখছেন সবাই।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মাদারীপুর-২ আসনের সদর উপজেলা ও রাজৈর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের সাধারণ ভোটার ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে রয়েছে তার গভীর সম্পর্ক। মরা কুমার নদ খনন করে তিনি প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। এ ছাড়া হবিগঞ্জ সেতু, সেখপুর, শম্ভুক সেতু, শ্রীনদী-কবিরাজপুর সেতু, রাজৈর পৌর ভবনসহ বেশ কিছু স্থাপনা ও সংস্কারকাজের জন্য তাকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা। নির্বাচনের কৌশলে এগিয়ে থাকার জন্য শাজাহান খান মাসের চার থেকে পাঁচ দিন মাদারীপুরে থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য শাজাহান খান বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দায়িত্ব। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য একটি বোর্ড রয়েছে। সেখান থেকেই প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি মনোনয়ন চাইব এবং আমার বিশ্বাস মাদারীপুর-২ আসনে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী এমপিদের তাদের নিজ নিজ এলাকায় অসমাপ্ত কাজের উন্নয়ন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং এমপিরা সেভাবেই এলাকার উন্নয়ন করছেন। আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় যেসব উন্নয়ন করেছি, তা এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তারপরও এখন অনেক উন্নয়ন করার মতো কাজ বাকি আছে। আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার সরকার বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে এবং উন্নয়নের ধারা বজায় রাখবে। সে হিসেবে মাদারীপুরেও উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাবে বলে আমি আশা করছি।

এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি সাহাবুদ্দিন মোল্লা এবং জেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলা দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা যায়। তবে এ আসনে তাদের তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচারণা বা কার্যক্রম চোখে পড়েনি। তাই অনেকেই মনে করেন, এ আসনে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ছাড়া আর কোনো বিকল্প প্রার্থীর তেমন কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে।

বিএনপি

মাদারীপুর-২ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বহু পক্ষের নাম শোনা যাচ্ছে। বোঝা যায়, দলীয় মনোনয়নের জন্য আন্তদলীয় সংগ্রামটাও কম হবে না। তবে দীর্ঘ সময় ধরে আসনটি দলের হাতছাড়া থাকায় আসনটি দখল নেওয়াই এখন দলটির প্রধান লক্ষ্য।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে সংগঠনের জেলা সাধারণ সম্পাদক জাহান্দার আলী জাহান আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন। ছাত্ররাজনীতি সময় থেকে দুঃসময়ে দলের পাশে থেকে অন্দোলন করে আসছেন। জেলও খেটেছেন কয়েকবার। ফলে, দলের ভেতর ও বাইরে জাহানের জন্য সহানুভূতি আছে সবার। প্রবীণ এই রাজনীতিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে আসছেন। সংসদীয় রাজনীতির আগে তিনি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, জেলা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে সরকারি নাজিমুদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ নির্বাচনে জিএস পদেও নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। নির্বাচনের প্রসঙ্গে তিনি মাদারীপুর সদর ও রাজৈরবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।

এ ছাড়া মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সম্পাদিকা হেলেন জেরিন খান। ইডেন কলেজের সাবেক ভিপি ও জাতীয়তাবাদী দলের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। মনোনয়নের জন্য তিনি মাদারীপুর-২ আসনে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন। কর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে তার রয়েছে যোগাযোগ। আগামী নির্বাচনে এ আসনে তার মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত বলে অনেক নেতাই জানান।

মনোনয়ন দৌড়ে আছেন সাবেক এম এল এ লুৎফর রহমান হাওলাদারের ছেলে বিশিষ্ট শিল্পপতি হাবিবুর রহমান (কাওছার) হাওলাদার। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। এ জন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীদের খোঁজখবরও নিচ্ছেন নিয়মিত। বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিভিন্ন সময় তাকে মানসিক চাপে পড়তে হয়েছে। আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক।

ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিল্টন বৈদ্যর নামও শোনা যাচ্ছে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। এর আগে তিনি রাজৈর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু ভূঁইয়ার ছেলে ও জেলা বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম তুষার ভূঁইয়াও আছেন বিএনপির মনোনয়প্রত্যাশী হিসেবে। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। দল যদি মনোনয়ন দেন, তাহলে নির্বাচনে অংশ নেব। জনগণের ভোটে যদি আমি নির্বাচিত হতে পারি, তাহলে প্রথমে শিক্ষাবিস্তারের জন্য কাজ করব। জেলায় মাদকের ভয়াবহতা বেড়েছে, তাই মাদক ও আইনশৃঙ্খলা নিয়েও ব্যাপকভাবে কাজ করতে চাই।

একইভাবে এ আসনে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. শাজাহান মিয়া স¤্রাট আলোচনায় রয়েছেন। এ জন্যই তিনি এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ করেন ও প্রিয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তবে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কিছুই করবেন না তিনি।

মাদারীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহান্দার আলী জাহান বলেন, জাতীয়তাবাদী সক্রিয়তা ও জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বে ২০-দলীয় ঐক্যজোট আগামী নির্বাচনে সরকার গঠন করবে। আমরা আশা করছি, এই সহায়তা সব নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছ থেকে আমরা পাব এবং বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা যায়।

জাতীয় পার্টি, জাসদ ও ইসলামী আন্দোলন

মাদারীপুর-২ আসনে জাতীয় পার্টির তেমন কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি তাদের কিছু কার্যক্রম চোখে পড়ছে। এ আসন থেকে একক প্রার্থী হিসেবে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি জাকারিয়া অপুর নাম শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক মাওলানা লোকমান হোসেন জাফরী এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা যায়।

মাদারীপুরে জাসদের জেলা কমিটি রয়েছে। তবে জাসদের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও জাসদের জেলা কমিটির সভাপতি শেখ বজলুর রশিদ ছাড়া দলের আর কোনো ব্যক্তি নেই যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। এ আসনে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও মস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী আবুল বাশার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এখনো জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আবদুস সোবাহান খানের নামও শোনা যাচ্ছে। জামায়াত সংগঠন থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার মতো কোনো প্রচার-প্রচারণা ও তেমন কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

"