বিকল্প নেই বড় দুই দলে

আ.লীগে একরাম, বিএনপিতে শাহজাহান

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

জুয়েল রানা লিটন, নোয়াখালী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা কাজ করে যাচ্ছে। দলীয় সভানেত্রী ও চেয়ারপারসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় আওয়ামী লীগ থেকে সংগঠনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি) একরামুল করিম চৌধুরী এবং বিএনপিতে কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি মোহাম্মদ শাহজাহান। তবে ছোট দলগুলো থেকে প্রার্থিতার চেষ্টা করছেন অনেকে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মতো এবারের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নেপথ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

শহর থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জের হাটবাজারগুলোতে বইতে শুরু করেছে নির্বাচন হাওয়া। এ মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে অঘোষিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। আর ভোটাররাও বিএনপি-আওয়ামী লীগের স্থানীয় উন্নয়নসহ বিভিন্নকর্মকা- নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ অব্যাহত রেখেছেন। জেলা সদরের এ আসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের। বিএনপি তাদের হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে সর্ব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, তার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ তাদের আসনটি যেন হাতছাড়া না হয় সে চেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমান সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী ২০০৮ সালের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানকে পরাজিত করে ১৯৭৩ এরপর প্রথম বারের মতো আওয়ামী লীগের পক্ষে আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। তারপর থেকে আসনটি তারই দখলে আছে। এবারও তার মনোনয়ন পাওয়া অনেকটাই নিশ্চিত। বিএনপি থেকে এই আসনে বিএনপির চেয়ারপারসনের আস্থাভাজন মোহাম্মদ শাহজাহানের মনোনয়ন পাওয়াও প্রায় নিশ্চিত।

২০০৮ সালে নির্বাচনে বর্তমান সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী ১ লাখ ৩১ হাজার ৭০৬ ভোট পেয়েছে। তার প্রতিপক্ষ মোহাম্মদ শাহজাহান পান ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৫৬ ভোট। অপরদিকে, বিকল্প ধারার প্রার্থী মেজর আবদুল মান্নান পান ৩১ হাজার ৪৯৬ ভোট। তবে বিকল্প ধারার প্রার্থীর সাড়ে ৩১ হাজার ভোট পাওয়া আ.লীগ নেতা একরামুল করিম চৌধুরীর বিজয় সহজ করে বলে অনেকে মনে করেন।

নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনটি নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলা এবং নোয়াখালী সদর উপজেলার চর মটুয়া ইউনিয়ন, আন্ডার চর ইউনিয়ন, বিনোদপুর ইউনিয়ন, দাদপুর ইউনিয়ন, ধর্মপুর ইউনিয়ন, এওজবালিয়া ইউনিয়ন, কাদির হানিফ ইউনিয়ন, কালাদরফ ইউনিয়ন, নোয়াল্লাই ইউনিয়ন,পূর্ব চর মটুয়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এক সময়ের বিএনপি অধ্যুষিত নোয়াখালী-৪ আসন এখন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য অবশ্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বকেই সাফল্যে চাবিকাঠি বলে দাবি করছেন জেলার নেতৃবৃন্দ। তবে সম্প্রতি এমপি পুত্রের দুর্ঘটনায় পথচারী মৃত্যুর ঘটনা তার ইমেজকে খাটো করেছে বলে জানা যায়।

আ.লীগের সংগঠনিক সূত্র জানায়, জেলার সাংগঠনিক কাঠামো যখন প্রায় শূন্যের কোটায় তখন ২০০৪ সালে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে দলের অবস্থান জোরালো করতে কাজ করেন তিনি। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এতই বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল এক পর্যায়ে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন ছিলেন একরামুল। পরে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ অনুরোধে তিনি পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এর পরে শুরু হয় একরামুলের নেতৃত্বের ক্যারিসমা। ফলে তার নেতৃত্বে ‘বিএনপির দুর্গ’ এখন ‘আওয়ামী লীগের দুর্গ’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ উপজেলা ও ইউপি চেয়ারম্যান পদ এখন আওয়ামী লীগের দখলে। এটা একরামুলের দৃঢ় নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন দলের নেতা কর্মীরা।

এদিকে, নিজের আসন পোক্ত করার জন্য দলীয় সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নেও সমান মনোযোগী এমপি একরামুল করিম চৌধুরী। ফলে তিনি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন দিনের পর দিন। তার সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে দীর্ঘ ২৪ বছর পর ২০০৮ সালে নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এরপর বিগত দশম জাতীয় নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন। এর আগে আওয়ামী লীগ কার্যালয় বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা পুড়িয়ে দিলে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন তিন তলা ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন একরামুল। ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে আবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি উপজেলা পর্যায়েও দলকে চাঙা করতে থাকেন।

এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একরামুল করিম চৌধুরী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলকে আরো সুসংগঠিত করার জন্য কাজ করছেন। ইতোমধ্যে সদর-সুবর্ণচরের প্রতিটি ইউনিয়নে জনসভা করে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের চিত্র তুলে ধরেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে তিনি নেতাকর্মীদের মধ্যে সাহায্য সহযোগিতা করতেও কার্পণ্য করেন না। একরামুল করিম চৌধুরীর মতে, দেশের সব জায়গার চেয়ে নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগকে বেশি শক্তিশালী করতে চান। আর সেটা সম্ভব করবেন নেতাকর্মীদের নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আলম চৌধুরী সেলিম জানান, একরামুল করিম চৌধুরীর বিকল্প আর কেউ নেই। একই অভিমত ব্যক্ত করেন, পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ পিন্টু, জেলা যুগ্ম সম্পাদক এ কে এম শাছুদ্দীন জেহান, আবদুল মোমিন বিএসসি ও সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম শামছুদ্দিন সেলিমসহ অনেকে।

এদিকে, বিএনপির চেয়ারপারসনের আস্থাভাজন বলে বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর)আসনের চার বারের সাবেক এমপি মোহাম্মদ শাহজাহানের। মোহাম্মদ শাহজাহান দলীয় কর্মকা-ে অত্যন্ত সক্রিয় ও জনপ্রিয়। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে মোহাম্মদ শাহজাহানের নেতৃত্বে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নির্বাচনমুখী কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। নোয়াখালী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এড. আবদুর রহমান জানান, নোয়াখালী মানুষের প্রিয় নেতা চারবারের এমপি মোহাম্মদ শাহজাহান ছাড়া বিএনপির আর কোনো প্রার্থী নেই। তিনি সারা দেশের বিএনপির সমন্বয়ক ছাড়াও এ আসনে তার জনপ্রিয়তা ও দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থাভাজন হওয়ায় তার বিকল্প আর কেউ নেই বলে তিনি জানান।

জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিন আহমেদ মিঠু। তার মনোনয়নের জন্য তিনি দলীয় হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি জাতীয় পার্টি এবং মহাজোট থেকেও মনোনয়ন লাভের চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। জামায়াতে ইসলামী এ আসনে জোটবদ্ধ নির্বাচন না হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া জেলা জাসদ (ইনু) সভাপতি সলিম উল্যাহ ও সাবেক সভাপতি নুর আলম চৌধুরী পারভেজ, কেন্দ্রীয় জাসদ (রব) মেম্বর ফিরোজ আলম মিলনসহ ছোট দলগুলোর অনেকেই মনোনয়ন চাইতে পারেন। এদিকে, দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ সীমাবদ্ধ থাকছে না। তবে জোট রাজনীতির কারণে অনেকই জোট মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন করেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

"