ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে তথ্যগুলো জানা দরকার

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বাংলাদেশের পার্লামেন্টে বুধবার পাস হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮, যে আইনের প্রস্তাবের পর থেকেই উদ্বেগ, বিতর্ক আর সমালোচনা চলছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, আগের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মতো এই আইনেরও অপব্যবহার হতে পারে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বিলটি পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। আইনটি প্রস্তাবের পর থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন গণমাধ্যম এবং সামাজিকমাধ্যমের কর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, আইনটির অনেক ধারায় হয়রানি ও অপব্যবহার হতে পারে।

তবে মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সংসদে দাবি করেছেন, সংবাদকর্মীরা যেসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তা সংশোধন করা হয়েছে।

এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কি রয়েছে? তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন যারা ভালো মানুষ তাদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই। সরকার এই আইন কারো বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করবে না। সাইবার অপরাধ ঠেকানোর জন্য এবং এই ডিজিটাল মাধ্যমের অপরাধীদের আইন ও শাস্তির আওতায় আনার জন্য এই আইন করা হয়েছে। কী আছে এই আইনে-

১. ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জন শৃঙ্খলা ক্ষুণœ করলে বাজাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে। এক্ষেত্রে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেফতার করতে পারবে।

এদিকে আইনটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যাহত করবে বলে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে সম্পাদকদের পরিষদ।

২. আইনে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য উপাত্ত ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, বা প্রকাশ করে বা কাউকে করতে সহায়তা করে ওই আইন ভঙ্গ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে, ২৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড হতে পারে।

৩. কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য উপাত্ত যদি কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে তা গুপ্তচরবৃত্তি বলে গণ্য হবে এবং এজন্য ৫ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।

ফেসবুকে মানহানিকর বা অবমাননাকর বক্তব্যের জন্য প্রস্তাবিত আইনে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে।

৪. আইন অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১০ বছরের কারাদন্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড হতে পারে।

৫. ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতি প্রদর্শক তথ্য উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা ব্যবহার করলে জেল জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত সাত বছরের কারাদন্ড, জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। দ্বিতীয়বার এরকম অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদন্ড হতে পারে।

৬. ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা করলে অনধিক ৫ বছরের কারাদন্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

৭. কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের বিষয়েও বিধান রয়েছে এই আইনে। সেখানে ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম কম্পিউটার সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম বা ডিজিটাল নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার ব্যাহত করে, এমন ডিজিটাল সন্ত্রাসী কাজের জন্য অপরাধী হবেন এবং এজন্য অনধিক ১৪ বছর কারাদ- অথবা এনধিক এক কোটি অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।

৮. ছবি বিকৃতি বা অসৎ উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে কারো ব্যক্তিগত ছবি তোলা, প্রকাশ করা বা বিকৃত করা বা ধারণ করার মতো অপরাধ করলে পাঁচ বছরের কারাদন্ড হতে পারে। ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি ও শিশু পর্নোগ্রাফির অপরাধে সাত বছর কারাদন্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। ৯. কোন ব্যাংক, বীমা বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে কোন ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া অনলাইন লেনদেন করলে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। ১০. বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বসে বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন তাহলেই তার বিরুদ্ধে এই আইনে বিচার করা যাবে।

১১. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এর মধ্যে করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।

"