প্রথম কলাম

ভারতে জাতপাতের বলি প্রেমিক স্বামী

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিবিসি বাংলা

শ্বশুড়ের ভাড়া করা গুন্ডারা প্রণয় পেরুমল্লাকে (২৪) কয়েক দিন আগে ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের মিরিয়ালগুড়া শহরে মেরে ফেলে। কারণ সে ‘নীচু জাতের’ মানুষ। তার গর্ভবতী স্ত্রী অমৃতা বর্ষিণীকে (২১) হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে বেরিয়ে আসার সময়েই তাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। জেরায় অমৃতার বাবা জানিয়েছেন, প্রণয় নীচু জাতের ছেলে ছিল।

এদিকে অমৃতা বর্ষিণী বলেছেন, প্রণয় একেবারে নিজের মায়ের মতো আমার খেয়াল রাখত। আমাকে স্নান করিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে খাইয়ে দেওয়া, রান্না করা সব কিছুই করত ও। আমার রোজকার জীবনের একটা অংশই ছিল প্রণয়।

স্কুলে আমার থেকে একবছরের উঁচু ক্লাসে পড়ত ও। ছোট থেকেই দুজন দুজনকে পছন্দ করতাম। আমি যখন ক্লাস নাইনে, আর ও টেনে, তখনই প্রেম করতে শুরু করি। বেশি কথাবার্তা হতো ফোনেই।

প্রথম থেকেই কখনো প্রণয়ের জাত বা আর্থিক অবস্থার কথা ভাবিনি আমি। আমার কাছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আমি ওকে ভালোবাসি আর একে অপরকে ভালো বুঝতে পারি। আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারটাও জেনে গিয়েছিল বাড়িতে। ধমক, ভয় দেখানো তো চলতই, গায়ে হাতও পড়েছে আমার বাড়িতে। তখনই আমরা ঠিক করি যে বিয়ে করব।’

‘আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, সেকেন্ড ইয়ারে, তখনই ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে আমরা বিয়ে করি। বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করাইনি তখন আমরা। আমার বাড়ির লোকজন ব্যাপারটা জানতে পেরে ঘরে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিল আমাকে।

‘আমার কাকা প্রণয়কে ভয় দেখিয়েছিল, আমাকে ডাম্বেল দিয়ে মেরেছিল। সবকিছুই হয়েছিল কিন্তু আমার মায়ের সামনে। আরো প্রায় জনা কুড়ি আত্মীয়স্বজনও সেখানে ছিল। কেউ আমার পাশে দাঁড়ায়নি।’

তারপরই ঘরে আটকিয়ে রাখা হয়। রোজ কিছুটা ভাত আর আচার দেওয়া হতো আমাকে খাবার জন্য। সবাই চাইছিল আমি প্রণয়কে যাতে ভুলে যাই। একটাই আপত্তি সবার প্রণয় তপশীলি জাতির ছেলে।

ছোট থেকেই আমার মা অন্য জাতের বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে বারণ করত। কিন্তু সেটা যে এই পর্যায়ে চলে যাবে, ভাবিনি কখনো।

অনেক দিন ঘরে আটকিয়ে রাখার পরে এ বছরের ২০ জানুয়ারি আর্য সমাজ মন্দিরে যখন আমরা আবার বিয়ে করতে যাই।

প্রণয়ের বাড়িতেও অবশ্য কেউ আমাদের বিয়ের ব্যাপারে জানত না। বিয়ের পরই আমরা চলে গিয়েছিলাম হায়দরাবাদে। সেখানে আমার বাবা খোঁজ নেওয়ার জন্য কয়েকটা গুন্ডা ভাড়া করেছিল। তাই আবার আমরা মিরিয়ালগুড়ায় প্রণয়ের বাড়িতে থাকার জন্য ফিরে আসি। ভেবেছিলাম পরিবার পরিজনের মধ্যে থাকলে ভয়ের কিছু থাকবে না।

আমার বাড়ির লোকদেরও জানিয়েছিলাম যে মা হতে চলেছি। প্রথম থেকেই ওরা বলছিল গর্ভপাত করিয়ে নেওয়ার জন্য। ভয় একটা সব সময়েই ছিল যে আমার বাবা আর তার ভাড়া করা গুন্ডারা ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটা যে এরকম ভয়ানক হবে, দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। সেদিন একটু দেরি করে উঠেছিলাম ঘুম থেকে। ১১টা নাগাদ।

প্রণয় আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর যখন ডাক্তার ভেতরে ডাকলেন, তখনই আমার বাবা ওই ডাক্তারকে ফোন করেন। গর্ভপাত করানোর ব্যাপারে কথা হয় দুজনের। ‘আমি হাসপাতালে নেই’ বলে ডাক্তার বাবার ফোনটা কেটে দিয়েছিলেন। ডাক্তারকে দেখিয়ে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়েছিলাম আমরা। আমি প্রণয়কে কী যেন একটা জিজ্ঞাসা করছিলাম। জবাব না পেয়ে ওর দিকে তাকাতে গিয়ে দেখি ও মাটিতে পড়ে আছে আর একটা লোক ওর ঘাড়ে কোপ মারছে।

সঙ্গে আমার শাশুড়িও ছিলেন। তিনি ওই লোকটাকে ধাক্কা মারা চেষ্টা করেন। হাসপাতালের ভেতরে দৌড়ে যাই আমি লোকদের সাহায্য চাইতে।

‘বাবা কিছুদিন আগে থেকেই বোধহয় প্ল্যান করছিলেন আমাদের বড়সড় ক্ষতি করার। এখনো পর্যন্ত আমার বাড়ির কেউ আমার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলেনি। ওরা সবাই দোষী এই ঘটনার জন্য। ওদের বাড়িতে আর কখনো ফিরব না আমি। প্রণয় খুন হয়ে যাওয়ার পরে মাঝে মাঝেই নারী সংগঠন বা দলিত সংগঠনগুলো বাড়িতে আসছে। ‘জয় ভীম’ বা ‘প্রণয় অমর রহে’র মতো স্লোগান দিচ্ছেন ওরা।

ওই স্লোগান শুনেই আমার শাশুড়ির চোখে জল এসে যায়। আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে অজয়ই তো এখন আমার ভাই। আর এই ঘরেই আমার সন্তান জন্ম নেবে।

একটা ফেসবুক পেজ বানিয়েছি আমি ‘জাস্টিস ফর প্রণয়’ নামে। সমাজ থেকে জাতপাতের ব্যাপারটাই যাতে উঠে যায়।

‘আমার ইচ্ছা আছে ওর একটা মূর্তি শহরের ঠিক মাঝখানে বসাব। যেখান থেকে যা অনুমতি লাগে জোগাড় করব। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজনরা ভয় পাচ্ছেন, আমার আর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যও ওরা ভাবছেন। তবে আমি চাই, আমার আর প্রণয়ের সন্তান বেড়ে উঠবে একটা সাম্যের পৃথিবীতে।’

"