ফুঁসে উঠছে পদ্মা যমুনা

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। পদ্মার ভাঙনে বিলীন হতে চলেছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার দুইটি ইউনিয়ন। এদিকে ধুনটে যমুনার পানি বাড়ছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টÑ

নড়িয়া (শরীয়তপুর) : গত দুই দিনে পদ্মার আগ্রাসী থাবায় ভিটাবাড়ি হারা হয়েছে আরো ৬৫টি পরিবার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন কেদারপুর ইউনিয়নের আঃ জব্বার খান এর দুই মেয়ে সালমা খান ও আসমা খানের তিনতলা বিশিষ্ট একটি পাকা ভবন গত মঙ্গলবার দুপুর ২টার সময় হঠাৎ নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। তবে পদ্মায় পানি বৃদ্ধি ও স্রোত কম থাকায় ভাঙনের তীব্রতা কয়েক দিন আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। স্থানীয়রা জানায়, পানি কমতে শুরু করলে আবারও ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে।

গত তিন মাসে পদ্মার ভাঙনে নড়িয়ার তিনটি ইউনিয়নে ও পৌরসভার দুটি ওয়ার্ডে প্রায় ছয় হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে। কয়েক হাজার একর কৃষি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি প্রশাসন।

এদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে তিনটি খনন যন্ত্র দিয়ে গত সোমবার থেকে নড়িয়ায় চর কেটে নদী খননের কাজ শুরু করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি খনন কাজ। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, চলছে নদীর গভীরতার পরিমাপ ও ¯্রােতের গতিপথসহ জরিপের কাজ। এই সার্ভেটা না করলে আসলে আমরা কোনো লাইনে ড্রেজিংটা করব তা নির্ণয় করা যাবে না। আমরা চেষ্টা করছি নদীর গতি পথটা পদ্মার ডান তীর থেকে মাঝ নদীতে নেওয়ার। ইতিমধ্যে একটি ড্রেজার চলে এসেছে। সার্ভে শেষ করেই শুরু করব ড্রেজিংয়ের কাজ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরে পদ্মা নদীর ৩৯ কিলোমিটার তীর রয়েছে। গত পাঁচ বছরে গৃহহীন হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার এর অধিক পরিবার। এই এলাকার মধ্যে নড়িয়ার সুরেশ্বর এলাকায় ১ কিলোমিটার লম্বা বাঁধ রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে বাঁধটির প্রায় ৫০ মিটার নদীতে বিলীন হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্তরা বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে সামান্যই। বহুতল পাকা ভবনের বেশির ভাগই ভেঙে নেওয়ার সময় সুযোগ পাননি। বাজারের পাকা দোকানগুলোর কিছু ইট ও রড সড়িয়ে নিলেও বড় বড় মার্কেটগুলোর কিছুই নেওয়া যায়নি।

এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে

মোক্তারের চর ইউনিয়ন : এর মধ্যে মোক্তারের চর ইউনিয়নে প্রাইমারি স্কুল দুইটি, মসজিদ ১৩টি, একটি কমিউনিটি

ক্লিনিকসহ শত শত একর ফসলি কৃষি জমি ও কয়েক হাজার পরিবার ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে দুইটি ওয়ার্ডের ৭টি গ্রাম সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অন্য দিকে চেরাগ আলী বেপারিকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে।

নড়িয়া পৌরসভায় : প্রাইমারি স্কুল ০২টি, মসজিদ ০৪টি, লাইফ কেয়ার ক্লিনিক, গ্রাম ৪টি, বাঁশতলা বাজারসহ মুলফৎগঞ্জ বাজারের পৌরসভার একাংশ সম্পূর্ণ রূপে নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। টিন শেড ও পাকা বাড়ি ৮ শতাধিক ও কয়েক হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। কেদারপুর ইউনিয়নের ৪০০ বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী মুলফৎগঞ্জ বাজারের একাংশ সম্পূর্ণভাবে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে মার্কেট তিনটি, দোকানঘর ৩৫০, চারতলা ভবন বিশিষ্ট দেওয়ান ক্লিনিক, নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মসজিদ ৬টি, লঞ্চঘাট দুটি, মন্দির ১টি, ওয়াপদা বাজার, সাধুর বাজার ও চন্ডিপুর বাজারসহ কয়েক হাজার পরিবার তাদের বসতবাড়ি এবং ফসলি জমি নদীতে হারিয়েছে। এছাড়া নড়িয়া থেকে মুলফৎগঞ্জ, চন্ডিপুর ও নড়িয়া পৌরসভার প্রায় ৫ কিমি. পাকা রাস্তা, ৪টি ব্রিজ ও ২টি কালভার্ট নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

কেদারপুর ইউনিয়ন ৩নং ওয়ার্ড মেম্বার মুন্নি খান বলেন, পদ্মার ভাঙনে আমাদের যা কিছু ছিল সব শেষ। এখন আমরা ঘরভাড়া করে আছি। মঙ্গলবার দুপুরে সর্বশেষ আমাদের বাড়িতে আমার দুই বোনের একটি তিনতলা বিল্ডিং ছিল তাও গেছে পদ্মার পেটে। এর কিছু দিন আগে নড়িয়া পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডে আমার আরেক বোন ঝর্ণা বেগম একটি পাঁচতলা ভবন, একটি দুই তলা ও একটি তিন তলা ভবনসহ বাড়ির মসজিদটি চোখের পলকে নদীগর্ভে চলে গেছে। তিনি বলেন, আমরা ভাঙন কবলিত নড়িয়াবাসীরা ত্রাণ সহায়তা চাই না বেড়ি বাঁধ চাই।

বাঁশতলার মিতুল মোল্লা বলেন, আমাদের ভিটা বাড়ি জায়গা জমি কিছুই নাই। নদী কেড়ে নিয়েছে বাবা ও দাদা-দাদির কবর। নড়িয়া পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড কমিশনার আব্দুল লতিফ জানায়, আমি একজন জনপ্রতিনিধি হয়েও সব হারিয়ে নিঃস্ব। জোসনা বেগম জানায়, বাড়িঘর সরানোর লোক না পাওয়ায় বাকিঘরটা সস্তায় বিক্রি করে ফেলছি। মোক্তারের চরের আলেয়া বেগম বলেন, আমাদের বাড়ি এই পর্যন্ত দুই বার ভেঙেছে। আমার দুই মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ। আমরা কোনো সরকারি সাহায্যও পাই নাই।

এ ব্যাপারে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইসলাম বলেন, ভাঙন কবলিতদের আশ্রয়ের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভাঙনকবলিত ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার ৮১ পরিবারকে ত্রাণ ও ৩৭৫ পরিবারকে ৭৫০ ভান্ডিল ঢেউটিনসহ বিভিন্ন খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বাররা আমাদের যে, তালিকা দেয় আমরা তারই পরিপ্রেক্ষিতে সাহায্য দিয়ে থাকি। এর বাইরে যদি কেউ বাদ পড়ে থাকে তা আমার জানা নাই। বঞ্চিতরা আমার কাছে এলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেব।

দৌলতদিয়ায় মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে দুটি ইউনিয়ন

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হতে যাচ্ছে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়ন। গত তিন-চার দিনের অব্যাহত নদীভাঙনে এই দুই ইউনিয়নের হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি বিলীন ও শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জানান, ফেরিঘাট এলাকায় নদীভাঙন শুরু হওয়ায় ৬ নম্বর ঘাটটি হুমকিতে রয়েছে।

গত ১৫ বছরে এ উপজেলার ৫০টি গ্রাম পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলার ১১৪টি গ্রামের মধ্যে এখন পদ্মাবেষ্টিত হয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দৌলতদিয়ার বেপারীপাড়া, যদুমাতবরপাড়া, সিরাজখারপাড়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের চর বরাট, অন্তর মোড়, দেলুনদী, তেনাপচা, দেবগ্রামসহ গ্রামে ভাঙনের তীব্রতা বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি ‘রিলিফ চাই না, চাই নদী শাসন’।

দেবগ্রাম মধু সরদারপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙনকবলিতরা বসতভিটে থেকে ঘর ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। ঘর, গরু-ছাগল নিয়ে ট্রলার বোঝাই করে অন্যত্র আশ্রয়ের জন্য যাচ্ছেন অনেকে। তাদের অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় দিচ্ছেন প্রতিবেশীরা। বিদায় নেয়া পরিবারের সদস্য লালন সরদার (৪৮) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘নদী আমাগো একসঙ্গে থাকতে দিল না।’

ধুনটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

ধুনট (বগুড়া) : বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, গত সোমবার বিকাল থেকে যমুনা নদীতে পানি বাড়েনি। কিন্তু গত বুধবার সকাল থেকে আবারো পানি বৃদ্ধি পায়। প্রায় ১৮ ঘণ্টায় ২ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুল করিম আপেল বলেন, যমুনা নদীর অভ্যন্তরের গ্রাম ও চরের নি¤œাঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বুধবার কয়েকটি গ্রামের বসতবাড়ীর ভেতর পানি প্রবেশ করেছে। পানি বন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষ। তিনি জানান, পানিবন্দি বৈশাখী চর, রাধানগর চর ও নদী তীরের সহড়াবাড়ী, শিমুলবাড়ী, কৈয়াগাড়ী, বানিয়াজান ও ভান্ডারবাড়ীর গ্রামের (আংশিক) মানুষের জন্য নিরাপদ পানি প্রয়োজন।

ধুনট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি।

"