শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বাড়ছে

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

এলএনজি আমদানির প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের আগে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সংযোগ বাদে অন্য ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। তবে এই বৃদ্ধিটা যেন ‘সহনীয় পর্যায়ে’ হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।

তিনি গতকাল শনিবার ঢাকায় এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেন, ‘অতিসত্বর গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে। তবে আমরা বিইআরসিকে বলেছি, দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে।’

গত জুনে এলএনজি আমদানি চূড়ান্ত হওয়ার পরই গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়। উত্তোলন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ছাড়া সব ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। জুনের ১১ তারিখ থেকে দাম বাড়ানোর ওপর শুনানি শুরু করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় দাম ৭ টাকা ৩৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৯৫ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে কোম্পানিগুলো। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় ৭৩ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর যুক্তি হিসেবে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বিইআরসিতে দেওয়া এক উপস্থাপনায় দেখানো হয়েছে, ২৫ টাকা ১৭ পয়সা দরে কিনে এর সঙ্গে ভ্যাট, ব্যাংক চার্জ, রিগ্যাসিফিকেশন চার্জসহ নানা ধরনের চার্জ যোগ করে আমদানি করা এলএনজির বিক্রয়মূল্য মূল্য দাঁড়াবে ৩৩ টাকা ৪৪ পয়সা। এই অঙ্ক দেশে বর্তমানে বিক্রিত গ্যাসের চার গুণ বেশি।

নতুন গ্যাস সরবরাহে পাইপলাইন নির্মাণে বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে জিটিসিএল প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের সঞ্চালন চার্জ দশমিক ২৬৫৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে দশমিক ৪৪৭৬ পয়সা অর্থাৎ ৬৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর শুনানি হয়।

অন্যদিকে, জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করা গেলে প্রচলিত দাম বহাল রেখেই আমদানি করা এলএনজির দাম সমন্বয় সম্ভব বলে মত দেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। শুনানি শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার। ওই হিসেবে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই বিইআরসিকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে শনিবার ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত ‘নেট মিটারিং’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে গ্যাসের দাম বাড়ানোর নানা প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, মহেশখালীতে দেশের প্রথম এলএনজি টার্মিনাল থেকে শুরুতে ১০০ মেগাওয়াট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। ভাসমান এই টার্মিনাল থেকে ৫০০ এমএমসিএফটি গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।

৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের আরো একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করছে বেসরকারি কোম্পানি সামিট পাওয়ার।

সব মিলিয়ে আমদানি করা গ্যাস আসতে শুরু করলে ধীরে ধীরে দাম বাড়ানো হবে বলেও ইঙ্গিত দেন জ্বালানি উপদেষ্টা।

বছরের শুরুর দিকে তখনকার জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে।

এরপর জ্বালানি বিভাগের বেঁধে দেওয়া হারে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয় বিতরণ কোম্পানিগুলো। শুনানি করে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম ১৪২ থেকে ১৪৩ ভাগ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে বিইআরসির কারিগরি কমিটি। একইসঙ্গে প্রত্যেকটি কোম্পানির বিতরণ মার্জিন বৃদ্ধির পক্ষেও সায় দিয়েছে কমিশনের কারিগরি কমিটি।

গ্যাস সংকট নিরসনে বিদেশ থেকে আমদানি করা ব্যয়বহুল এলএনজির প্রথম ধাপ জাতীয় সঞ্চালনে যোগ করলেও দাম অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব। বিইআরসির গণশুনানিতে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম দাম না বাড়ানোর পক্ষে তাদের যুক্তি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের মতোই তিতাসে ডাকাতি চলছে। অন্যান্য খাতেও গ্রাহক সেবার উন্নয়ন না করে বিভিন্ন চার্জ বসানো হয়েছে। এ ধরনের অতিরিক্ত মুনাফা থেকেই ব্যয়বহুল এলএনজির খরচ বহন করা সম্ভব।’

ক্যাবের হিসাবে, এলএনজি মিশ্রিত গ্যাসের মূল্যহার ভোক্তাপর্যায়ে ৯ টাকা ০৯ পয়সা। বিদ্যমান মূল্যহার ৭ টাকা ৩৮ পয়সা। ফলে এক টাকা ৭১ পয়সা ঘাটতি বিবেচনায় মোট ৫ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঘাটতি দাঁড়াবে।

এই ঘাটতি মূল্যহার বৃদ্ধি কিংবা সরকারি ভর্তুকি ছাড়াই এই খাতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েই সমন্বয় করা যাবে বলে দাবি করেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা।

এফইআরবির চেয়ারম্যান অরুণ কর্মকারের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন, সোলার মডিউল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মনোয়ার মিজবাহ মইন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করে সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক সদরুল হাসান।

"