যুবলীগ নেতা রাশেদ হত্যা

দুই মাসেও ধরা পড়েনি খুনিরা

প্রধান আসামি ‘সুন্দরী সোহেল’ ভারতে

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

রাজধানীর মহাখালীতে যুবলীগ নেতা কাজী রাশেদ হত্যাকান্ডের দুই মাস পার হলেও ইউসুফ সরদার সোহেল ওরফে সুন্দরী সোহেলসহ মূল অভিযুক্ত কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। খুনিরা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে, সে জন্য সুন্দরী সোহেলসহ আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ডিঙিয়ে সুন্দরী সোহেল এখন সদলবলে ভারতে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে। সেখানে বসেই তিনি ফোনে বনানীর অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেনÑ দাবি এলাকাবাসীর।

সম্প্রতি ভারতের +৬৮১২৭৩৯৯৫১২৮ নম্বর থেকে সুন্দরী সোহেল কাজী রাশেদের পরিবারকে হুমকি দিয়েছেন। একই নম্বর থেকে পরিচিতজনের কাছে ফোন করে এলাকার খোঁজ-খবরও নিচ্ছেন। সোহেল বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। এদিকে, রাশেদ হত্যায় একমাত্র গ্রেফতার সোহেলের ভাতিজা যুবলীগ নেতা জাকিরের জবানবন্দি ও তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যে জড়িত হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের কারো অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নয় পুলিশ। ফলে উল্টো হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে রাশেদের পরিবার।

কাজী রাশেদের পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকান্ডের প্রায় দুই মাস হতে চললেও হত্যাকান্ডের মূলহোতা বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ইউসুফ সরদার সোহেল ওরফে সুন্দরী সোহেলসহ অভিযুক্তরা গ্রেফতার না হওয়ায় বিচার নিয়ে শঙ্কিত তারা। এ ছাড়া খুনিদের হুমকি-ধমকি তো আছেই। সুন্দরী সোহেল দেশের বাইরে পালিয়েছে বলেও ধারণা তাদের। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সুন্দরী সোহেল দেশে নাকি দেশের বাইরে পালিয়েছে তা নিশ্চিত নয়। বিমানবন্দর দিয়ে পালানোর সুযোগ নেই। দেশেই আত্মগোপন করে থাকতে পারে। তার অবস্থান নিশ্চিত নয় পুলিশ।

কাজী রাশেদের স্ত্রী মৌসুমী বলেন, এক সপ্তাহ আগে ব্যক্তিগত কাজে তিতুমীর কলেজের সামনে যাই। সেখানে অপরিচিত একজন এসে হুমকি দেন। বলেন, বেশি দৌড়াদৌড়ি কইরো না। নইলে পা ভেঙে দেব। পরিবারের ক্ষতি করব। বিষয়টি থানায় জানানো হলেও প্রতিকার মেলেনি। অপরিচিত লোক পাঠিয়ে মামা মেহেদি, সেজো দেবর রাজীবকেও সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মৌসুমী বলেন, বাইরের নম্বর থেকে ফোন আসে। রিসিভ করলে কথা বলে না। আমরা হতাশ। খুন করে আর প্রতিবারই ছাড় পায় সুন্দরী সোহেল। ওসিও নাকি ওদের ভয় পায়। খুন করলেও পার পেয়ে যায়। এবারও যদি ছাড় পায় তাহলে আমাদের থাকাই তো কঠিন হয়ে যাবে। রাশেদের মামা মেহেদি জানান, রাজু নামে একটা ছেলে হুমকি দিয়েছে। চল্লিশার অনুষ্ঠানের দিনে হঠাৎ করে হাজির হয়ে বলে, বেশি বাড়াবাড়ি না করতে। এ ছাড়া প্রতিবেশীদের নম্বরে দিনরাত কল করে খোঁজখবর নেয়, আমরা কে কখন কোথায় যাচ্ছি, আসছি। বিষয়গুলো আমরা তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়েছি।

খুনিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে রাশেদের ভাই রাজীব জানান, সুন্দরী সোহেল সদলবলে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে শুনতেছি। মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে ভিওআইপি নম্বর থেকে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। তাদের হুমকি-ধমকিতে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের পরিদর্শক মনিরুজ্জামান বলেন, কাজী রাশেদ হত্যাকান্ডে জড়িত জাকির হোসেন ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। জাকির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের গ্রেফতারে জোর চেষ্টা চলছে। আমরা সবাইকে ট্রেস করার চেষ্টা করছি। সুযোগ পেলেই গ্রেফতার করা হবে। কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন কি না তা নিশ্চিত নন বলেও জানান তিনি।

গত ১৫ জুলাই ভোরে সুন্দরী সোহেলের অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘রেইনবো টোয়েন্টিফোর নিউজ ডটকম’ অফিসের পেছনের গলি থেকে রাশেদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সিসি ক্যামেরায় উঠে আসে, রাশেদকে হত্যার পর তার লাশ পলিথিন জড়িয়ে সুন্দরী সোহেলের ‘দেহরক্ষী’ হাসু ও জহিরুল, দিপন ওরফে দিপু এবং মহাখালী দক্ষিণপাড়ার ডিশ ব্যবসায়ী ফিরোজ ধরাধরি করে রেইনবো কার্যালয় থেকে বের করে নিয়ে যায়। এরপর ১৯ জুলাই সোহেলের অফিসে তল্লাশি চালিয়ে চারটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও ১২২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। ঘটনার পর খিলক্ষেতের বরুয়া রাজাপুর এলাকায় রাশেদ হত্যাকান্ডে জড়িত জহিরুলের বাসা সিলগালা করে দেয় পুলিশ। রাশেদ হত্যা মামলায় গ্রেফতার হন বনানী থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জাকির হোসেন সরদার ওরফে ‘ভাতিজা জাকির’ (সোহেলের চাচা)। জাকির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, রাশেদ হত্যায় সুন্দরী সোহেল সরাসরি জড়িত।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জাকির আরো বলেন, ঘটনার দিন ১৪ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে সোহেল মোবাইল ফোনে জাকিরকে রেইনবো কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। তিনি কঙ্কাল বাড়িতে গিয়ে দেখেন সোহেল, ফিরোজ, দিপু, হাসু, জহিরুল, কাজী রাশেদসহ (নিহত) আরো দুই-তিনজন দাঁড়িয়ে আছেন। সোহেল ও ফিরোজ একটু দূরে তাকে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘আজ রাশেদকে ফালাইয়া দিমু, তুই নিচে পাহারায় থাকিস। কেউ যেন ওপরে যেতে না পারে।’ রাশেদকে নিয়ে সোহেল, ফিরোজ, হাসু, দিপু ও আরো দুই-তিনজন তিন তলায় সোহেলের অফিসে যায়। কয়েক মিনিট পর একাধিক গুলির শব্দ শুনতে পান জাকির। এর কিছুক্ষণ পর সোহেল ও অপরিচিত একজন নিচে নেমে এসে জাকিরের হাতে একটি ছোট বাক্স ধরিয়ে দিয়ে চলে যান।

এর কিছু সময় পর হাসু, দিপু, জহিরুল ও ফিরোজ রাশেদের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ ধরাধরি করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে এনে গেটের বাইরে দেয়ালের পাশে ফেলে দেয়। এ সময় তাদের হাতে পলিথিন জড়ানো ছিল। গত ৮ আগস্ট ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে এই জবানবন্দি দেন জাকির।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মনিরুজ্জামান বলেন, কাজী রাশেদ হত্যাকান্ডে জড়িত জাকির হোসেন ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। জাকির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন শোনা যাচ্ছে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যদিও লিগ্যাল ডকুমেন্টস না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

"