নদী ভাঙন

পদ্মায় স্বপ্ন বিলীন শঙ্কা ভিটে ছাড়ার

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বর্ষায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সুগন্ধা যেন ফিরে পেয়েছে তার প্রমত্ত রূপ। তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। ভাঙছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বহুতল বাণিজ্যিক ভবনও। নদীতে বিলীয় হয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন। এখন শঙ্কা ভিটে ছাড়া হওয়ার। পদ্মার ভাঙনে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় অর্ধশত পাকা স্থাপনাসহ কয়েক হাজার বসতবাড়ি, ব্যবসা প্র?তিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে গেছে। বরিশালে সুগন্ধা নদীর ভাঙন তীব্র হয়ে উঠেছে। দুটি স্কুল ও একটি মসজিদসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের প্রবেশদ্বারখ্যাত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু। ধসে গেছে শিলাইদহ কুঠিবাড়ী রক্ষাবাঁধের একাংশ। ভাঙন বাড়ছে দেশের প্রায় সব নদ-নদীর তীরবর্তী এলাকায়। সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের কান্নার আওয়াজও। দেশের উত্তরাঞ্চলের ধরলা, তিস্তাও ভাঙছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, পদ্মার স্মরণকালের ভয়াবহ ভাঙনে নড়িয়া উপজেলা শহর বিলীন হওয়ার পথে। গত সাত দিনের অব্যাহত ভাঙনে অর্ধশত পাকা স্থাপনাসহ কয়েক হাজার বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চ?লে গে?ছে। সেই সঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে ধীরে ধীরে বোনা স্বপ্নও। অসহায় হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। এক দিন আগেও যারা সম্পদশালী ছিলেন তারাও রাতারাতি নিঃস্ব হচ্ছেন।

পদ্মার তীব্র ভাঙনে ইতোমধ্যে নড়িয়া পৌরসভা, মোক্তারেরচর ইউনিয়ন ও কেদারপুর ইউনিয়নের তিন হাজারের বেশি মানুষের বসতবাড়ি, মসজিদ, মন্দিরসহ কেউ হারিয়েছেন শেষ সম্বলটুকু। ওয়াপদা, বাঁশতলা, সাধুর বাজার এবং শত বছরের পুরনো মূলফৎগঞ্জ বাজারের পাঁচ শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বিলীন হয়ে গেছে। অনেকেই আবার জমি-জিরাত হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। এসব মানুষের সঙ্গী এখন শুধুই কান্না। এখন ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে বহুতল ভবনসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিও।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘সরকারের ওপর মহলে ভাঙনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা ভাঙনকবলিতদের সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’

রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, শহররক্ষা বাঁধসংলগ্ন পদ্মার ডান তীর সংরক্ষণ বাঁধের চরধুঞ্চি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। রাজবাড়ী বেড়িবাঁধের তীর সংরক্ষণ বাঁধের চরধুঞ্চি গ্রামে শুরু হয় নদী ভাঙন। এতে প্রায় ৫০০ মিটারের বেশি সিসি ব্লক বাঁধ তলিয়ে গেছে। এলাকার মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী প্রকাশ কৃষ্ণ সরকারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বরিশাল প্রতিনিধি জানান, সুগন্ধার ভাঙন তীব্র হয়ে উঠেছে। দুটি স্কুল ও একটি মসজিদসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে। হুমকিতে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু।

তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, সেতু নিয়ে শঙ্কা নেই। আর পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ভাঙনরোধে তৈরি করা হয়েছে ২৬০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। সুগন্ধার ভাঙনে দিশাহারা বাবুগঞ্জবাসী। হঠাৎ করেই এই ভাঙনে ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে মোশারফ-রাশিদা একাডেমি, মহিষাদী সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় এবং একটি মসজিদ। এ ছাড়া মহিষাদী গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ জমি ও ঘরবাড়িও বিলীন হয়েছে।

ভাঙনের খবর শুনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সুশীল সমাজের নেতারা।

বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, সেতুটির অ্যাপার্টমেন্ট, অ্যাপ্রোচ রোড থেকে পানি কিংবা নদী অনেক দূরে রয়েছে। এর ভেতরেই আমরা এটাকে ব্লক করে ফেলব যেকোনো জায়গা থেকে। সুতরাং এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রমজান আলী প্রামাণিক বলেন, ‘এটার এস্টিমেট আমরা রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে ডিপার্টমেন্টকে দিয়েছি। এ প্রকল্পটা একনেকে অনুমোদন হলে আশা করি পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কাজটা খুব দ্রুত শুরু করব।’

নাটোর প্রতিনিধি জানান, লালপুরে প্রমত্তা পদ্মায় পানি বাড়ার পাশাপাশি তীব্র ভাঙনে সিসি ব্লক ধসে নদীগর্ভে বিলীন হতে চলেছে। ফলে হুমকিতে রয়েছে নদীতীরবর্তী নূরুল্লাপুর গ্রামের মানুষ। আতঙ্কে কাটছে তাদের দিন।

মঙ্গলবার বিকেলে দেখা যায়, নদীতীরবর্তী নূরুল্লাপুর আতাউরের আমতলা নামক স্থানে সিসি ব্লক নির্মিত তীররক্ষা বাঁধে প্রায় ৩০০ গজ ধস নেমেছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নূরুল্লাপুর পয়েন্টে ব্লক ধসে যাওয়ার চিত্র দৃশ্যমান। নূরুল্লাপুর গ্রামের আমজাদ হোসেন, সামির উদ্দিন, রেজাউল, আবু বক্কর, আহাদ আলী মালিথা জানান, গত কয়েক বছর আগে নির্মিত এই বাঁধ পানি বাড়ায় ধসে গেছে। দুদিন আগে ধসের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ গজ। কিন্তু এখন তা প্রায় ৩০০ গজ ছাড়িয়ে গেছে।

স্থানীয় নূরুল্লাপুর গ্রামের বাসিন্দারা নদী ভাঙন রক্ষায় বিশেষ দোয়া প্রার্থনা ও মিলাদ মাহফিল করেছেন এবং স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ ও কাশফুল দিয়ে ভাঙন রোধের শেষ চেষ্টা করছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নাটোরের নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার জানান, নূরুল্লাপুর পয়েন্টে ব্লক নদীগর্ভে ধসের খবর শুনেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মুল বানীন দ্যুতি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে হালকা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হুহু করে বাড়তে শুরু করেছে ধরলা ও বারোমাসিয়া নদীর পানি। এতে এ দুটি নদ-নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল পাবিত হ?য়ে শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের তালুক শিমুলবাড়ী গ্রামের কৃষক মোজাম আলী, রহিজ উদ্দিন, জোবেদ আলী, এনামুল ও বেলাল মিয়ার প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিঘা আমন ধানখেত পানিতে ডুবে গেছে।

এ ছাড়া ধরলার তীরবর্তী দক্ষিণ সোনাইকাজী গ্রামে গত সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত প্রায় বিশটি পরিবারের ঘরবাড়ি ধরলা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আরো ভাঙনের শিকার হতে পারে শতাধিক পরিবার। অনেক পরিবার আগাম ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে।

দক্ষিণ সোনাইকাজী গ্রামের ধরলা নদীতে ভাঙনের শিকার হয়েছেনÑ এহেলা বেগম, নূর ইসলাম, হোসেন আলী, হাসেম, শাহাদোৎ, নুরুল হক, বাচ্ছানী বেগম, সৈয়ত আলী, বেলাল হোসেন, হালাল মিয়া, শফিকুল, শাহাদোৎ হোসেন, বেলাল হোসেন, দুলাল মিয়া, লাকি বেগম, মিজানুর, সেকেন্দোর, ছাইদুল, কাদুরা চন্দ্র, নেপাল চন্দ্র।

তালুক শিমুলবাড়ী ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোজাম্মেল হক জানান, সোমবার বিকাল থেকে হঠাৎ ধরলার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমার গ্রামের ২০ থেকে ২২টি ঘরবাড়ি ধরলায় বিলীন হয়ে গেছে। তারা দুই দিন থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক কষ্টে আছে। আমি বিষয়টি চেয়ারম্যান ও পিআইও অফিসে জানিয়েছি।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

"