রোহিঙ্গা বিষয়ে বিচারের এখতিয়ার আইসিসির নেই : মিয়ানমার

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নেই বলে গতকাল শনিবার দাবি করেছে মিয়ানমার সরকার। ‘বিচারের এখতিয়ার আছে’Ñ এই মর্মে গত বৃহস্পতিবার আইসিসির দেওয়া রুলিংয়ের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এই বিবৃতি দেওয়া হলো। তবে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাদের চালানো নৃশংসতা এবং অমানবিক কাজ তদন্তে আইসিসির রায়ের পক্ষেই সমর্থন দিয়েছেন বিশ্বনেতারা। তারা রোহিঙ্গা নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত মিয়ানমারের সেনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলার দাবি জানিয়েছেন।

মিয়ানমার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে আইসিসির রুলিংকে ‘ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া ও সন্দেহজনক আইনি ভিত্তির’ ফল হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এখতিয়ারের প্রশ্নে কোনো আইনি যুক্তির ওপর ভিত্তি না করা হয়নি। উপরন্তু আদালতের ওপর আবেগ দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিচারের

বিষয়ে আইসিসির প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদার একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইসিসি এই রুলিং দিয়েছে। এখন প্রাথমিক তদন্ত শুরু করতে হলে বেনসুদার পক্ষ থেকে একটি আবেদন আইসিসিতে করতে হবে। কিন্তু সে ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো করা হয়নি।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রায়ের পক্ষেই সমর্থন দিয়েছে একাধিক বৈশ্বিক সংস্থা এবং বিশ্বনেতারা। তারা রোহিঙ্গা নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত মিয়ানমারের সেনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলার দাবি জানিয়েছেন।

পাশাপাশি দাবি উঠেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারকে আইসিসিতে পাঠাক, যাতে এই নৃশংসতার পূর্ণ তদন্ত করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা যায়।

রোহিঙ্গা নৃশংসতার তদন্ত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উচিত মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পাঠানো। সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক অলাভজনক সংস্থা ফরটিফাই রাইটস শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছে।

ফরটিফাই রাইটসের বিবৃতিতে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথু স্মিথ বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে আইসিসি’র রায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিষয়টি একেবারেই প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। এ রায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে উৎসাহ জোগাবে। কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যদি মিয়ানমারকে আইসিসিতে যেতে বাধ্য করতে পারে তবে এ নৃশংসতার পূর্ণ চিত্র তদন্ত করতে আইসিসির জন্য সহজ হবে।’

আইসিসির আদেশের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিচারের পথ সুগম হয়েছে, উল্লেখ করে আরেকটি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিবৃতিতে বলেছে, ‘রোহিঙ্গা নৃশংসতার ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তদন্ত করার বিষয়ে আইসিসি (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে) যে রায় দিয়েছে তা অভূতপূর্ব। রোহিঙ্গাদের কারা বাড়ি ছাড়া করেছে, কারা রাখাইনের ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তা আইসিসি তদন্ত করলেই পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।’

সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মর্গট ওয়ালসট্রম গত শুক্রবার এক বার্তায় বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে জীবন বাঁচিয়েছে। এ ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’

মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য চালর্স শান্তিয়াগো এক বার্তায় বলেন, ‘আইসিসির রায় রাখাইনে ঘটে যাওয়া অমানবিক কাজের বিচার নিশ্চিত করবে।’

এদিকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মানবতাবিরোধী কর্মকা- চালানোর অপরাধে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচার করতে পারবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিসি গত বৃহস্পতিবার এক আদেশে এ তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র কিন্তু মিয়ানমার সদস্য নয়। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে আইসিসি মিয়ানমারের বিচার করতে পারবে কিনা সেই বিষয়ে গত বৃহস্পতিবারের শুনানিতে আইসিসির বিচারক পিটার কোভাকস, বিচারক মার্ক পেরিন ডি ব্রিচাম্বো এবং বিচারক রেনে এডিলেড সোপিয়ে আলাপিনি-গানসু রায় দেন যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিসি বিচার করতে পারবে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটেছে, তা তদন্তের জন্য আইসিসির বিচারকদের অনুমতি চেয়ে গত ৯ এপ্রিল আবেদন করেন ওই আদালতেরই ফাতোহ বেনসুডা নামের একজন আইনজীবী (চিফ প্রসিকিউটর)। যার পরিপ্রেক্ষিতে আইসিসির প্রি ট্রায়াল চেম্বারের বিচারকরা এ আদেশ দেন।

প্রসঙ্গত, গত বছর রোহিঙ্গা পল্লীতে সেনা অভিযানের পর থেকে এ পর্যন্ত সাত লাখ শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই অভিযানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ‘জাতিগত নির্মূল’ প্রচেষ্টা বলে আখ্যা দেয়। এখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ।

 

"