রাজশাহীতে ফোন নম্বর ক্লোনচক্র টার্গেট ইউএনও এমপি ওসি

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

এসএইচএম তরিকুল, রাজশাহী ব্যুরো

রাজশাহীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সেল ফোনের নম্বর ক্লোনকারী চক্র। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে চক্রটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অধীনস্তদের টার্গেট করছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় দিয়ে তারা অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে কেউ কেউ টাকাও দিচ্ছেন। প্রতারকরা বেশিরভাগ সময়ই উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের ফোন নম্বর ক্লোন করছে। বাদ পড়ছেন না এসিল্যান্ড, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), এমনিক সংসদ সদস্যও। এ নিয়ে থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এ নিয়ে গত সোমবার তানোরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) থানায় জিডি করেছেন। তার দুই দিন আগে বাঘার ইউএনও একটি জিডি করেছেন। গতবছরও তানোরের তৎকালীন ইউএনও এ বিষয়ে জিডি করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতারণা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও প্রতারক চক্রের একজনকেও আইনের আওতায় আনতে পারেনি প্রশাসন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মুঠোফোন ক্লোন বলতে সিম হ্যাক করাকে বোঝায়। ব্যালেন্স হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া অথবা সিমের একই নম্বর দুইজন ব্যবহার করলে বুঝতে হবে সিম ক্লোন হয়েছে। মূল সিম ছাড়াই কম্পিউটারের মাধ্যমে মিসড কল দিয়ে সিম ক্লোন করা সম্ভব। কোনো গ্রাহক যদি অপরিচিত ফোন থেকে পাওয়া মিসড কল ব্যাক করেন তাহলে তার সিম ক্লোন হয়ে যেতে পারে। আবার ভিন্ন দুইটি অপারেটরের সিমের কোড ছাড়া অন্য সব ডিজিট একই রকম হলে যেকোনো একটি সিম থেকে ফোন করা হলে এবং কলগ্রহীতার মোবাইলে নাম সেভ করা থাকলে সেই ব্যক্তিরই নাম দেখাবে। তবে নম্বরটি সেভ না থাকলে কলগ্রহীতার কাছে আলাদা আলাদা নম্বর দেখাবে। তাই প্রতারকরা সব ডিজিট মিল রেখে শুধু ভিন্ন অপারেটরের সিম ব্যবহার করেও প্রতারণা করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে শুধু সেই ব্যক্তিকেই টার্গেট করা হয়, যার মুঠোফোনে ঊর্ধ্বতন সেই কর্মকর্তার নম্বর সেভ করে রাখার আশঙ্কা আছে।

রাজশাহীতে মাঝে মাঝেই ফোন ক্লোন করার ঘটনা ঘটছে। বছরখানেক আগে এই প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন। তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে কিছু টাকার দরকার- তার ফোন নম্বর থেকে এমন ফোন পেয়ে কণ্ঠস্বরের দিকে খেয়াল না করে দুই আত্মীয় ও কয়েকজন কর্মী একটি বিকাশ নম্বরে বেশ কয়েক হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি গ্রামীণফোনের কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে অভিযোগ করেন। আয়েন বলেন, শুধু টাকা চাওয়াই নয়, তার ফোন থেকে অন্য মানুষকে গালিগালাজও করা হয়েছে। এই গালমন্দের শিকার হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক উপাচার্যও।

সবচেয়ে বেশি ক্লোন করা হচ্ছে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) মুঠোফোন। গত শুক্রবার তানোরের ইউএনও চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বীর ব্যক্তিগত মুঠোফোন ক্লোন করে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) কয়েকজন সচিব এবং কর্মচারীর কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ইউএনও তার পরিচালিত ‘উপজেলা প্রশাসন, তানোর, রাজশাহী’ নামে একটি ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়ে সবাইকে সতর্ক করেন। ওই পোস্টে ইউএনও তার ব্যক্তিগত নম্বরটি উল্লেখ করে লেখেন, আমার ব্যক্তিগত নম্বরটি ক্লোন করে কে বা কারা বাধাইড়, কলমা এবং তালন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সচিবসহ অনেকের কাছে চাঁদা দাবি করছেন। বিষয়টিতে সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

তানোরের বাঁধাইড় ইউপির সচিব মোমিনুল ইসলাম, কলমার মোস্তাফিজুর রহমান এবং তালন্দের সচিব রাসেল রহমান জানান, তাদের প্রত্যেককে ফোন করে বিভিন্ন কাজের কথা বলে ১২ হাজার টাকা করে চাওয়া হয়। টাকার জন্য তাদের একটি বিকাশ নম্বরও দেওয়া হয়। সচিবরা জানান, এ ধরনের ফোন পাওয়ার পর তাদের সন্দেহ হয়। তারা মনে করেন, ইউএনও নিজে এ ধরনের কথা বলতে পারেন না। তাই তারাই বিষয়টি ইউএনওকে অবহিত করেন।

গত শুক্রবার গোদাগাড়ীর ইউএনও শিমুল আকতারেরও মুঠোফোন ক্লোন করে উপজেলা পরিষদের অফিস সহকারী এমদাদুল হকের কাছে টাকা চাওয়া হয়। বিষয়টি জানিয়ে ইউএনও শিমুল আকতারও ফেসবুকে সতর্কতামূলক পোস্ট দিয়েছেন। ইউএনও শিমুল আকতার বলেন, যে অফিস সহকারীর কাছে তার ফোন থেকে টাকা চাওয়া হয়েছে তিনি সামনেই ছিলেন। এ জন্য সঙ্গে সঙ্গে তারা বিষয়টি ধরতে পেরেছেন।

একই দিন বাঘার ইউএনও শাহিন রেজার মুঠোফোন ক্লোন করে আড়ানী, গড়গড়ি ও বাউসা ইউপির সচিবসহ অনেকের কাছে টাকা চাওয়া হয়। এ নিয়ে ইউএনও শাহিন রেজাও ফেসবুকে সতর্কতামূলক পোস্ট দিয়েছেন। ইউএনও বলেন, যে তিনজন সচিবের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল তারা আমার কণ্ঠস্বর চেনেন। তাছাড়াও তাদের কাছে আমার টাকা চাওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক ব্যাপারÑ এটা তারা বুঝতে পেরেই ধমক দিয়েছেন। পরে এ নিয়ে আমি থানায় জিডি করি।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনের প্রচারণার সময় রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া এবং চন্দ্রিমা থানার ওসির সরকারি মুঠোফোন ক্লোন করা হয়। প্রতারকরা ওসির মুঠোফোনের নম্বর ব্যবহার করে দুইজন কাউন্সিলর প্রার্থীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। প্রলোভন দেয় নির্বাচনে বিজয়ী করে দেওয়ার। এ নিয়ে থানার ওসিরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। তবে তারাও প্রতারকদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। পুলিশ বলছে, প্রতারকদের শনাক্ত করার মতো জেলা পর্যায়ে কোনো প্রযুক্তি তাদের কাছে নেই।

এর আগে গত জুনে তানোরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুনের মুঠোফোন নম্বর ক্লোন করে বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নাজির, নায়েবসহ অধীনস্তদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কামারগাঁও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার লুৎফর রহমান বিকাশের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকাও দেন। লুৎফর রহমান জানান, এসিল্যান্ডের পরিচয়ে তাকে ফোন করে অসুস্থতার কথা বলে ১০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। তিনি বিকাশের মাধ্যমে টাকা দেন। তবে টাকা চাইলে অফিসে গিয়ে দেওয়ার কথা বলেন তানোর ভূমি অফিসের নাজির ফিরোজ সরকার। তখন ফোনের লাইনটি কেটে দেওয়া হয়।

একইভাবে গত বছরের ৮ জুন তানোরের তৎকালীন ইউএনও শওকত আলীর মুঠোফোন ক্লোন করে সাতটি ইউপির চেয়ারম্যান ও দুটি পৌরসভার মেয়রের কাছে টাকা চাওয়া হয়। প্রতারক চক্র বিভিন্ন বরাদ্দ প্রদানের কথা বলে টাকা দাবি করে। বিষয়টি জানতে পেরে ইউএনও শওকত রেজা তানোর থানায় একটি জিডি করেন।

নগরীর দুটি থানার ওসির ফোন ক্লোন করার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখায়ের আলম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘প্রতারকদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। মূলত এ ঘটনার তদন্ত করছে আরএমপির এলআইসি শাখা।’ তিনি বলেন, এরকম ক্ষেত্রে ফোন কেটে দিয়ে ওই নম্বরে ‘কল’ করতে হবে। যদি ওই নম্বরে ফোন না ঢোকে তাহলে বুঝতে হবে এটা প্রতারকের কাজ। নম্বরটি নতুন করে ফোনে টাইপ করে অথবা সংরক্ষিত থাকলে সেখান থেকে ফোন দিলে প্রকৃত ব্যক্তির কাছে ফোন যাবে। ইফতেখায়ের বলেন, এ ধরনের ঘটনার পর অর্থ লেনদেন হলে থানায় ডায়েরি করলে যে নম্বরে টাকা বিকাশ করা হয়েছে পুলিশ সেই নম্বর অনুসরণ করে প্রতারককে ধরতে পারে।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, ‘বিকাশের নম্বর অনুসরণ ছাড়া ফোন ক্লোনকারী প্রতারকদের সরাসরি শনাক্ত করার জন্য যে প্রযুক্তি দরকার তা জেলা পর্যায়ে নেই। ক্লোনিংয়ের ঘটনায় যেসব জিডি হচ্ছে, সেগুলো আমরা পুলিশ সদর দফতরে পাঠাচ্ছি। সেখান থেকেই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

"