ভাষসৈনিক লাইলী বেগমের শেষ ইচ্ছা

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মো. রাজু খান, ঝালকাঠি

ঝালকাঠির ভাষাসৈনিক লাইলী বেগম (৭৬), এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। জেলার ভাষা আন্দোলনের সাক্ষী হিসেবে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। ভাষা আন্দোলনের কথা উঠলেই স্মৃতি কাতর হয়ে পড়েন। তার নেতৃত্বে ছাত্রীদের মিছিল হয়েছিল ঝালকাঠিতে। ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলির খবরে সেই মিছিলে যোগ দিয়েছিল অন্যান্য ছাত্ররা। এ জন্য পাকিস্তানি মিলিটারিরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, শত নির্যাতনেও মুখ খোলেননি তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে নামে চিনতেন বলে জানান তিনি। জীবন সায়াহ্নে এসে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার শেষ ইচ্ছের কথা জানিয়েছেন লাইলী বেগম।

বাহান্নর সেই স্মৃতির কথা স্মরণ করে এ প্রতিবেদককে লাইলী বেগম জানান, ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নেমে বুকের তাজা রক্ত দিয়েছিল। খবরটি ঝালকাঠিতে এসে পৌঁছে ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে। তখন ঝালকাঠির স্কুলপড়–য়া শিক্ষার্থীরাও সেই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। সেদিনের আন্দোলনের পুরোভাগে যারা ছিলেন তাদের অনেকেই আজ জীবিত নেই। তখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন বলে জানান লাইলী বেগম।

লাইলী বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছি। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশও স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ভাষা সৈনিকদের কোনো স্বীকৃতি বা সম্মাননা মেলেনি। বয়স অনেক হয়েছে। চলাচল করতেও অনেক কষ্ট হয়। যেকোনো সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। মৃত্যুর আগে বঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথার বলার শেষ ইচ্ছা পোষণ করি।’

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে ঝালকাঠিতে এসেছিলেন। তিনি ডাক বাংলোতে অবস্থান কালে আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাই। ঝালকাঠির লাইলী বলে পরিচয় দিলে তিনি আমাকে চিনতেন। এখন আমাকে কেউ চিনে না।’ আক্ষেপের সুর ভেসে ওঠে তার কণ্ঠে।

তিনি স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৫২ সালে ঝালকাঠিতে কোনো কলেজ ছিল না, স্কুল শিক্ষার্থীরাই সেদিন ভাষা আন্দোলনের মিছিলে পথে নেমেছিল। ওই বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি স্কুল ছাত্রদের নিয়ে ৯ সদস্যের সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। কমিটিতে জহুরুল আমীন সভাপতি, আমীর হোসেন সহসভাপতি, মোহাম্মদ আলী খান সম্পাদক এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন আমিন হোসেন, মোজাম্মেল হক, মরতুজ আলী খানসহ আরো তিনজন। তবে তাদের নাম তিনি মনে করতে পারেননি।

সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে স্কুলগুলোতে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালনের চেষ্টা করা হলেও গ্রেফতারের ভয় দেখানোর ফলে তা সফল হয়নি। পরের দিন ঢাকায় গুলিবর্ষণের খবরে উত্তেজিত ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়ে। স্থানীয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো মিছিল বের হয়। মিছিলটি হরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে পৌঁছলে লাইলী বেগমের নেতৃত্বে ছাত্রীরা বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেয়। মিছিলটি উদ্বোধন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাছে পৌঁছালে সেখানকার শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দেয়। মিছিলের সম্মুখভাগে ছিলেন সংবাদপত্রের এজেন্ট আবদুর রশীদ ফকির। শহর প্রদক্ষিণ শেষে সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি জানান, ‘পরের দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি আমাকে বাসা থেকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যায়। ঝালকাঠি পৌরসভা সংলগ্ন ডাকবাংলোতে হাজির করে আমাকে প্রশ্নবানে জর্জড়িত করে। কে কে মিছিলে ছিল ? তাদের বাসা কোথায়? আমি সব জানা সত্ত্বেও কারোরই পরিচয় দিইনি। এ সময় তথ্য বের করার জন্য পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আমাকে লোভ দেখিয়েছিল। পরে কথা বের করতে না পেরে আমাকে গুলি করে সুগন্ধা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এভাবে তারা আরো কয়েকদিন স্বীকারোক্তির জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এখন ৮ মেয়ে ২ ছেলের জননী। তবে সন্তানদের কারো ভালো চাকরি না থাকায় সংসারে টানাপোড়ন রয়েছে। দীর্ঘ ৭৬ বছেরেও কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি, পাননি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও।

"