গাজীপুরের মুচি জসিম এখন মূর্তিমান আতঙ্ক

১৬টি গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়েও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

রাজীবুল হাসান, শ্রীপুর (গাজীপুর)

নাম জসিম উদ্দিন ইকবাল। এক সময় জুতার কারখানায় পিয়নের চাকরি করত বলে এলাকায় মুচি জসিম নামে পরিচিত। এখন গাজীপুরের কালিয়াকৈরের এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম! জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি স্মৃতি সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সে। পুলিশের সোর্স পরিচয় দিয়ে অল্প দিনেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছে। বনের জমি থেকে শুরু করে চুক্তিতে অন্যের জমি দখলে তার হাত পাকা। দুইটি মামলার সাজাপ্রাপ্ত, ১৬টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাসহ ১৮টি বন মামলার রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বন বিভাগ কিংবা পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালাতেও তার হাত কাঁপে না। পুলিশের নাকের ডগায় প্রতিদিন সশস্ত্র মহড়া দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়ায় এই মুচি জসিম। তার কুকর্মের প্রতিবাদ করে অসংখ্য মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। উপজেলার চন্দ্রা এলাকার জসিম ইকবালের রয়েছে শক্তিশালী একটি ক্যাডার বাহিনী। উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বনের অন্তত ৩০০ বিঘা জমি দখল করে বেশ কয়েকটি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে সে।

জানা যায়, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে জসিম ইকবাল চন্দ্রা এলাকায় এসে একটি জুতা কারখানায় পিয়ন ছিল। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই জুতা বানিয়ে ওই কোম্পানিতে সরবরাহ শুরু করে। এ কারণে এলাকাবাসীর কাছে মুচি জসিম নামে সে পরিচিতি লাভ করে। তার আগে টোকাইয়ের কাজও করেছে। ২০১৫ সালের ২১ আগস্ট চন্দ্রায় জাতির পিতা কলেজ মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কালিয়াকৈর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলামকে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে। রফিকুল হত্যার আসামীদের ধরিয়ে দিতে থানা পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করে সে। কালিয়াকৈর থানা পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। হত্যাকান্ড সম্পর্কে কিছুই জানে না এমন মানুষজনকে ধরে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে আর জসিম মধ্যস্থতা করে তাদের ছাড়িয়ে আনে। থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে সে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০-১৫ লাখ করে টাকা আদায় করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক জানান, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়, পরে জসিমের মধ্যস্থতায় ৭ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা জোড়া পাম্প এলাকায় মহাসড়ক ঘেঁষা বিশাল একটি এলাকা। সেখানে বন বিভাগের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘নতুন পাড়া’। সরেজমিনে গিয়ে সোহেল নামের একজনকে ওই নতুন পাড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘জসিমের নতুন পাড়ায় কত পুলিশ, সাংবাদিক আইতাছে-যাইতাছে। জসিমের কিছুই করবার পারতাছে না।’

মহাসড়ক থেকে ইটের সলিং ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাড়ার ভেতরে প্রবেশ করলে প্রথমেই একটি বিশাল মসজিদ চোখে পরে। মসজিদটি জসিম তার মায়ের নামে করেছে। বনের অবৈধ জমিতে ওঠা মসজিদটি পুলিশের একজন বড় অফিসার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছে। ২৬১ বিঘা বনের জমি জবরদখল করা ‘নতুন পাড়ায়’ প্লট বিক্রি শুরু করে দিয়েছে জসিম। হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অন্তত ৩০০ পরিবারের কাছে এ প্লট বিক্রি করা হয়েছে। প্রত্যেকের কাছ থেকে আদায় করেন ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা। সেখানকার বাসিন্দারা টিন দিয়ে নতুন ঘর তৈরি করলেও দূর থেকে দেখে মনে হয় ঘরগুলো শত বছরের পুরনো। নতুন টিনে আলকাতরা দিয়ে প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। কেউ যাতে না বোঝতে পারেন এটা নতুন ঘর। বসবাসকারীদের ভূমিহীন বলে প্রচার চালান জসিম।

এ বিষয়ে জসিম ইকবাল বলেন, বনের জায়গার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলাও নেই। চন্দ্রা বিটের দায়িত্বে থাকা বিট কর্মকর্তা মাহমুদুল হক মুরাদ বলেন, জসিম ইকবাল এলাকার চিহ্নিত ভূমি দস্যু। তার বিরুদ্ধে আদালতে বনবিভাগ ১৮টি মামলা রয়েছে। সাধারণ মানুষ থানায় জিডি করেছেন ৮টি। ১৮টি মামলার মধ্যে ১৬টির গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। আর দুটি মামলায় আদালত থেকে ৬ মাসের করে সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে জসীমের দাবি, তার বিরুদ্ধে থানায় কোনো জিডি নেই। তবে আদালতে করা বনবিভাগের মামলাগুলোয় জামিনে রয়েছেন বলে জানান জসিম।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নতুনপাড়ায় রয়েছে মার্কেট, দোকান, মসজিদ ও রাস্তা। বিট কর্মকর্তা মাহমুদুল হক মুরাদ বলেন, ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ওই মসজিদ নির্মাণ নিয়ে সংঘর্ষ হয়। বাধা দেওয়ায় চন্দ্রা বন অফিসের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায় জসিমের লোকজন। এ প্রসঙ্গে জসিম বলেন, কালিয়াকৈরে বনের জমিতে ২৬টি মসজিদ রয়েছে। আর আমি একটি মসজিদ করেছি বলে অপরাধ!

অভিযোগ রয়েছে- চন্দ্রা এলাকা চলাচল করা ৮০০ ইজি বাইক ও অটো রিকশা থেকে প্রতিদিন জসীম ৩০-৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে, আর এককালীন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা চাঁদা না দিলে সড়কে কোনো গাড়ি উঠতে পারে না। এ প্রসঙ্গে জসীম বলেন, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

ওসমান পালোয়ান নামে এক কৃষক জানান, তার ভাতিজা রাজিবের পকেটে কৌশলে ইয়াবা ঢুকিয়ে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেয় জসীম। পরে সুদে ধার এনে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে তাকে ছড়িয়ে আনেন পরিবারটি। চুক্তিভিত্তিক তিনি জমি জবর দখল করে দেন। বিনিময় হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা।

কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, হরিণাহাটী এলাকায় দীর্ঘদিন তাদের দখলে থাকা ১৯৬ শতাংশ জমি ২ আগস্ট জসিম ও তার লোকজন জবরদখল করে নিয়ে যায়। মার্কেট ভাঙচুর করা হয়। উচ্ছেদ করা হয় ৪৩টি পরিবারকে। এ রকমভাবে ওই এলাকায় আরো ১৭টি কলোনীতে বসবাস করা পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সরিয়ে দেয় জসীম। জমি জবর দখল করে নেওয়ার পরও আবার আজাদুর রহমান খান নামের একজনকে বাদী সাজিয়ে কালিয়াকৈর থানায় তাদের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজির মামলা করান জসীম।

এ প্রসঙ্গে কালিয়াকৈর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্ত মুচি জসিম বলেন, এ ঘটনাটি তার জানা নেই। এত অল্প সময়ে তিনি কীভাবে এত বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন জানতে চাইলে জসীম বলেন, এ বিষয়ে আর আপনার সঙ্গে কথা বলব না।

গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার বলেন, ‘মাত্র কয়েকদিন হলো তিন গাজীপুরে যোগদান করেছেন। সকল বিষয় এখনো তার নলেজে আসেনি।’ বিষয়টি তিনি খুব শিগগিরই দেখবেন বলে জানান।

জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তিনি অভিযোগ পেয়েছেন। কোনোভাবেই সরকারের জমি দখল করতে দেওয়া হবে না। দুই-একদিনের মধ্যে অভিযানে যাবেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।’

"