বললেন অধ্যাপক

রফিকুল ইসলাম ১৯৪৭-র দেশভাগ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফসল

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

ঢাবি প্রতিনিধি

১৯৪৭ সালের দেশভাগ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফসল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল এদেশের হিন্দু মুসলিমদের বিভেদের শুরু। বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন ছিল কংগ্রেস এবং বঙ্গের অধিকাংশ মানুষের প্রথম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। সেখান থেকেই বিভেদের রাজনীতি শুরু হয়। বঙ্গভঙ্গের সময় দুইটি বিষয়ের উদ্ভব ঘটেছিল। এর মধ্যে প্রথমটি হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং অন্যটি হলো সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। এই দুইটি বিষয় বঙ্গভঙ্গের সময় প্রথম দেখা গেছে। বঙ্গভঙ্গ রদের পরেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফল। গতকাল শনিবার

সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে ‘পার্টিশন পলিটিক্স : ইম্প্যাক্টস অন সোসাইটি, ইকোনমি, কালচার অ্যান্ড ইন্দো-বাংলা রিলেশনস (১৯৪৭-২০১৮)’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সেমিনারের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রফিকুল ইসলাম বলেন, নিখিল ভারত মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যখন সর্বভারতীয় কংগ্রেস এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে কোয়ালিশন গঠন করেনি, তখন মুসলিম লীগ এগিয়ে আসে। তার সঙ্গে এই কোয়ালিশন গঠন না করে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতারা বড় ভুল করেছিলেন বলে আমি মনে করি।

তিনি বলেন, জিন্নাহ অফিসিয়ালি ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন, পাকিস্তান প্রস্তাব নয়। তখন বঙ্গ ব্যতীত কোথাও মুসলিম লীগের তেমন কোনো শাখা না থাকায় জিন্নাহ ফজলুল হককে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য অনুরোধ করেন। এতে বলা হয়, যখন ব্রিটিশরা এ দেশ ত্যাগ করে চলে যাবে, তখন তিনটি রাষ্ট্র হবে এবং পশ্চিম ও পূর্ব অংশে দুইটি রাষ্ট্র হবে। ১৯৪৫-৪৬ এ সারা উপমহাদেশে যখন সাধারণ নির্বাচন হলো, তখন বঙ্গ ব্যতীত অন্যান্য প্রদেশে মুসলিম লীগ তেমন কোনো আসন পায়নি। সেই সময় জিন্নাহ সকল নির্বাচিত সদস্যদের ডেকে ‘প্রিন্টিং মিসটেক’ এর দোহাই দিয়ে ‘রাষ্ট্রসমূহ’ শব্দটিকে ‘রাষ্ট্র’ তে রূপান্তর করেন। কিন্তু প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় আলাদা রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা ছিল।

ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান ও ভারতের জনগণ যে ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছিল তার চেয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষের ট্র্যাজেডির প্রকৃতি অন্যরকম ছিল বলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানের ৫৬ ভাগ মানুষ ছিল বাঙালি।

তিনি বলেন, ১৯৪০ সালের পর থেকে ভাষা ইস্যুতে জিন্নার সঙ্গে আমাদের বিরোধিতা শুরু হয় এবং ১৯৫২ সালে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা কখনো বাংলা হরফকে আরবি, কখনো রোমান হরফে বদলের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মহারানা প্রতাপ চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. জাসপাল কর ধাঞ্জু। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম এবং কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন জন-ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি এবং রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কালেক্টিভের (আরডিসি) চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের (কারাস) পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম।

সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য আখতারুজ্জামান বলেন, ইতিহাসবিদ এবং রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ কিছু কারণ শনাক্ত করেছেন, যা ১৯৪৭ সালের দেশভাগকে ত্বরান্বিত করেছে। তারা একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, অন্যান্য কারণ থাকলেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই দেশভাগের প্রধান কারণ। ’৪৭-এ দেশভাগের বেশ কিছু কারণ ছিল ঠিকই এর সঙ্গে এটাও সত্যি যে, দেশভাগের পর অনেকগুলো বিষয়ের জন্ম হয়। এর মধ্যে একটি হলো জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্ম আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সরাসরি ফল।

উল্লেখ্য, তিন দিনব্যাপী এই সেমিনারে ছয়টি প্লেনারি সেশন, ১০টি পেপার প্রেজেন্ট এবং ১০টি থিম পেপার উপস্থাপন করা হবে। দেশ-বিদেশের ৬০ জনের বেশি শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা এসব উপস্থাপন করবেন। জন-ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র ও রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কালেক্টিভ (আরডিসি) এই সেমিনারের আয়োজন করে। এই সেমিনারের সহযোগী হিসেবে আয়োজক হিসেবে ছিল সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস।

"