তবু থামছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলন চলাকালে আট দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৪ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে চারজন শিক্ষার্থীও ছিল। এ সময় দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৪টি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় অনেকেই বিস্মিত হন। বিশিষ্টজনরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চালকরা আইন ও নিয়ম না মেনে যানবাহন চালানোর কারণে কমছে না সড়কে প্রাণহানির ঘটনা। সেই সঙ্গে পথচারী, চালক ও যাত্রীসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রশাসন যদি আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে, তবে সড়কে সুশৃঙ্খলভাবে যানবাহন চলবে এবং দুর্ঘটনাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো চালক যদি আইন অমান্য করেন, তবে তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তারা বলেন, যেসব দেশে আইনের শাসন রয়েছে সেসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি শূন্যের কোটায়। কারণ সেখানে সবাই আইন মেনে চলে। আর যেখানে আইনের প্রয়োগ নেই, সেখানে দুর্ঘটনাসহ নানা অপরাধ ঘটে থাকে। তাই সড়কে আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তবে সম্প্রতি সড়কে প্রাণহানি কমাতে আইন প্রণয়নসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কাজ দৃশ্যমান হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে সরকার।

গত ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আবদুুল করিম রাজু নিহত হয়। ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় বিমানবন্দর সড়কের বাঁ পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল তারা। এ সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস তাদের চাপা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলে মীম ও রাজু নিহত এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। আহতদের কুর্মিটোলা হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা জাবালে নূর পরিবহনের ওই বাসে আগুন দেয় ও ভাঙচুর করে বেশ কয়েকটি বাস। এরপর টানা আট দিন ঢাকাসহ দেশব্যাপী সড়ক দখল করে আন্দোলন চালিয়ে যায় শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে সরকারের দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি সড়ক থেকে ক্লাসে ফেরে তারা। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে কয়েক দফা দাবিও তুলে ধরে। এর মধ্যে বেশির ভাগ দাবিই পূরণ করেছে সরকার। কিছু দাবি পূরণে কাজ চলছে। শিক্ষার্থীরা বলছে, আইন সংশোধন করে ঘাতক চালকদের সর্বাচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করা হোক। কারণ সড়ক দুর্ঘটনার পর চালক আটক হলেও তার বিচার হয় না। কিছুদিন পর তারা জামিনে বেরিয়ে আসেন। মালিকপক্ষ সামান্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে সব কিছু মিটিয়ে ফেলে। কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যে জীবন ঝরে যায়, তা তো আর ফিরে আসে না। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অনেক পরিবার পথে বসে যাচ্ছে। তার পরও সড়কে থেমে নেই মৃত্যুর মিছিল।

মুন্সি আব্দুর রউফ কলেজের ছাত্র রেজওয়ান হাসান বলেন, ‘আমরা কোথায় আছি। সারা দেশে যখন আন্দোলন চলছে, তখনও রাজপথে বেপরোয়াভাবে যানবাহন কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। আমরা সড়কে আর কোনো লাশ দেখতে চাই না। আমরা নিরাপদ সড়ক চাই।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সড়কের নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কুফল হলো সড়ক দুর্ঘটনা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দেখানো পথে হাঁটতে হবে সরকারকে। তাদের দাবি অনুযায়ী সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খলতায় ফেরাতে আন্তরিকভাবে কাজ শুরু করেছে সরকার। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। সড়ক দুর্ঘটনা যে রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে, সেটি বলছি না। ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, সড়কে মনিটরিংয়ের অভাবে দুর্ঘটনা ঘটে আসছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় সড়কে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সবার চোখ খুলে দিয়েছে। তাই সরকারের সঙ্গে পরিবহন মালিক সমিতিরা একাত্মতা ঘোষণা করে কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যে চালকদের চুক্তি ভিত্তিতে নয়, মজুরি ভিত্তিতে কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে সেভাবেই চলছে। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কোনো চালক গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে পারছেন না। এসব নির্দেশনা খুব কঠোরভাবে মেনে চলা হচ্ছে।

এদিকে মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা হলে আমরা খুব টেনশনে থাকি। কারণ একটি দুর্ঘটনা মানে মানুষের জীবনের, পরিবহন ও মালিকের অনেক ক্ষতি। এটা আমরা কোনো দিনও চাই না। তাই যথাযথ নির্দেশনা মেনে এখন গাড়ি চালানো হচ্ছে।’

 

"