চাঁপাইয়ে দরপতনে দিশাহারা আমচাষি

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

বাম্পার ফলনেও মাথায় হাত পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের। বেশি ফলনে বাজারে দরপতন এমন পর্যায়ে যা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। বাজারে ক্রেতা না থাকায় গত বছরের চেয়ে অর্ধেকেরও কম দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা। পুঁজি হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবার তাদের ক্ষতি হয়েছে ৮০০ কোটি টাকা।

ব্যাপারিরা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল না থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারাও। ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে প্রয়োজন আমের ‘ব্র্যান্ডিং’।

এদিকে আম ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিউসার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এবার আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের ৮০০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। এই অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও আমচাষিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটি। অন্যদিকে স্থানীয় জেলা প্রশাসন বলছেন, ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ চলছে। খতিয়ে দেখা হচ্ছে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও। নেওয়া হচ্ছে আম সংরক্ষণ ও রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ।

দেশের সর্ববৃহৎ আম বাজার কানসাট। যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে আমের কেনা-বেচা। এবার চলতি মৌসুমে আমের অব্যাহত দরপতনের কারণে আমের সরবরাহ থাকলেও নেই কাক্সিক্ষত ক্রেতা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এই বাজারদর মণপ্রতি ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত কম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে এরই মধ্যে শেষ হয়েছে গুটি, গোপালভোগ ও ক্ষীরশাপাত জাতের আম। এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে আম্রপালি, বোম্বাই ক্ষীরশা, ল্যাংড়া ও ফজলি জাতের আম। আর কিছুদিন পরেই বাজার দখল করবে আশ্বিনা জাতের আম। কিন্তু বাজারের মন্দাভাব কিছুতেই কাটছে না।

গত শুক্রবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এদিন কানসাট ও সদরঘাট আম বাজারে ল্যাংড়া আম বিক্রি হয়েছে ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকা মণ দরে, বোম্বাই ক্ষীরশা ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা, ফজলি বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা, আম্রপালি ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা, লক্ষণা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে।

আম ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, ‘গত এক সপ্তাহ থেকে আমের দাম একটু বেড়েছে। আগে আরো কম দামে আম বিক্রি হয়েছে কানসাট আম বাজারে।’ আমচাষি, ব্যবসায়ী, পাইকার সবাই বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত অখ্যাত আম ঢাকা বা চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম’ বলে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ক্রেতারা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন তেমনি বদনাম হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের।

শিবগঞ্জের আমচাষি সেনাউল ইসলাম জানান, ‘আমরা অত্যন্ত যতœ করে আম উৎপাদন করি। যাতে ফলন ভালো হয় এবং আমের গুণগত মান ও স্বাদ ঠিক থাকে। এসব করতে গিয়ে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু অন্য জেলায় আমের উৎপাদন খরচ কম। তাই বাজারে দামের দিক দিয়ে টিকতে পারছে না এ জেলার আম।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আরামবাগের আম ব্যবসায়ী তৌহিদুর রহমান জানান, ‘গত এক দশকের মধ্যে আমের দামের এমন বিপর্যয় কখনো হয়নি। আমার ২২ লাখ টাকায় কেনা আম বাগানে শ্রমিক খরচ ও বিষ বাবদ আরো ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ গত দেড় মাস ধরে মাত্র ৪ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছি।’

কানসাট এলাকার আম বাগান মালিক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে যে আম বাগান আমি সাড়ে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি, এবার তা বিক্রি করেছি ৩ লাখ টাকায়।’ তিনি আরো জানান, ‘আম শিল্পকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম নির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নামবে।’

কানসাট বাজারে কথা হয় ফরিদপুরের ব্যাপারি ফরহাদ মোল্লার সঙ্গে। গত ১৫ বছর ধরে কানসাট বাজার থেকে আম কিনে ফরিদপুর, ঢাকা ও মাদারীপুরে বিক্রি করেন তিনি। এই ব্যবসায়ী জানান, ‘আমার ব্যবসায়িক জীবনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের এত কম দাম দেখিনি। তবে আমের দাম কম হলেও আম কিনে লাভবান হচ্ছি না আমরাও।’

কানসাট আম আড়ৎদার ব্যবসায়ী সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. কাজী এমদাদুল হক জানান, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের উৎপাদিত আমের স্বাদ ভালো হওয়ায় ক্রেতারা একটু বেশি দাম হলেও তা কিনতে চান। কিন্তু ক্রেতাদের কাছে যে আমটি যাচ্ছে সেটি যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম তার নিশ্চয়তা কী? তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ‘ব্র্যান্ডিং’ জরুরি হয়ে উঠেছে। এটা নিশ্চিত করতে পারলেই আমের দরপতন ঠেকানো সম্ভব।’

বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিউসার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ আমের ব্র্যান্ডিং প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘জলবায়ুর প্রভাবও এখানে অনেকাংশে দায়ী। এ বছর আম পাকার মৌসুমে টানা খরায় একসঙ্গে আগাম জাতের আম পেকে যায়। রমজানে আমের চাহিদা কম থাকে। এছাড়া ঈদের আগে পরে দুই সপ্তাহ পরিবহন বন্ধ থাকায় বাজারজাত করা সম্ভব হয়নি। ফলে চাষি ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে কম মূল্যে আম বিক্রি করতে বাধ্য হয়।’

এ ব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হাসান জানান, এ বছর আমচাষিদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এছাড়া সদ্য শেষ হওয়া ম্যাংগো ফেস্টে কৃষিবিদ, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের এক সেমিনারে আম সংরক্ষণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মঞ্জুর হোসেনের উদ্ভাবিত হিমাগার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এই হিমাগারটির মাধ্যমে ২৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত আম সংরক্ষণ করা যাবে। আর এই হিমাগারটি নির্মাণে (প্রতি ৩ টনের জন্য) খরচ পড়বে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।

"