ভিএআরের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?

প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৮, ০০:০০

আমির হোসেন

আয়েশ করে চেয়ারে বসে রিমোট চেপে টিভিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে বসছেন। হঠাৎ দেখলেন রেফারি তার কানে হাত দিয়ে কী যেন বলছেন হাত উঁচু করে। এক সময় চারকোনা টিভি স্ক্রিনের মতো এঁকে কিছু একটা সংকেত দিচ্ছেন। কখনো কখনো দৌড়ে মাঠ থেকে বের হয়ে একটা ছোট টিভি স্ক্রিনে কিছু একটা দেখে এসে সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন।

এসব দেখে আপনি হয়তো একটু ভড়কে যেতে পারেন। কিন্তু রেফারির এই কর্মকা-ে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এবারের এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে এই নতুন প্রযুক্তি। যার নাম ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি; সংক্ষেপে ভিএআর পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মাঠের রেফারিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করছে।

মাঠের রেফারি ভিএআরের সাহায্য চাইতে পারবেন চারটি ক্ষেত্রে। সেগুলো হলো গোলের ক্ষেত্রে (অফসাইড হল কিনা), পেনাল্টির ক্ষেত্রে (যথাযথ হলো কিনা), সরাসরি লালকার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে (সত্যিই লালকার্ড পাওয়ার মতো ফাউল কিনা) ও সঠিক খেলোয়াড় নির্ধারণ করতে (সত্যিকার অর্থে দোষী খেলোয়াড়কে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে)। তবে ক্রিকেটের মতো ভিএআরের জন্য আবেদন করতে পারেন না ফুটবলারা। ম্যাচকর্তাই সর্বেসর্বা। প্রয়োজনবোধ করলে কেবল রেফারিই সহায়তা নেবেন ভিএআরের। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত মিলিয়ে দেখতে পারবেন তিনি। ভুল হলে শুধরে নেওয়ার সুযোগ আছে তার। তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির পরামর্শে সন্তুষ্ট না হলে নিজে গিয়ে টিভির স্ক্রিনে পুরো বিষয়টি রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তিনি।

রাশিয়া বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-ডেনমার্ক ম্যাচ পর্যন্ত (২০ ম্যাচে) ১১টি পেনাল্টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ভিএআরের সহায়তায়। তার আগে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ ১৮টি পেনাল্টি দেওয়ার রেকর্ড ছিল। অবস্থা এমন যে এবার গ্রুপ পর্বেই নড়বড়ে হয়ে উঠছে রেকর্ডটা। এক আসরে সর্বোচ্চ পেনাল্টির রেকর্ডটা ভেঙে গেলে তাতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

তবে প্রশ্ন উঠেছে ভিএআরের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। অনেকে এটার প্রয়োজন আছে বলে মত দিলেও বিরোধিতা করছেন কেউ কেউ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের রেফারি মার্ক হালসে সরাসরি ভিএআরের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, ‘ভিএআর ব্যর্থ, ধারাবাহিক নয়। এই টুর্নামেন্টের এটার ব্যবহার উচিত নয়।’ তবে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ভিএআর ব্যবহার নিয়ে খুব সন্তুষ্ট।

ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ডেভিড ইলারি ভিএআরের প্রভাবকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজেই ভিএআর রেফারিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ইলারি বলেছেন, ‘সবশেষ ২০ ম্যাচে মাত্র পাঁচটি রিভিউ হয়েছে। তার মানে প্রতি তিন ম্যাচের একটিতে ভিএআর ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত আসছে। ভুল সিদ্ধান্ত কম হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ অবাধ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষেই দলগুলো যথাযথ সুবিধা পাচ্ছে। খেলোয়াড়দের ব্যবহার ভালো হচ্ছে। ২০ ম্যাচে মাত্র একটি লালকার্ড হয়েছে। হলুদকার্ড দেখার গড় কমেছে। রেফারির সঙ্গে খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্ব কম হচ্ছে।’

শুধু তাই নয় বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সবকয়টি দলের সমর্থকদের কাছ থেকে বিবিসি স্পোর্টস ভিএআরের কার্যকরিতার বিষয়ে মতামত নিয়েছে। তার মধ্যে অধিকাংশই মতামত দিয়েছেন ভিএআরের কার্যকারিতার পক্ষে। ভিএআর নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান তারা।

তবে এই পদ্ধতি নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে ব্রাজিল ও ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত তাদের বিপক্ষে গেছে। সেগুলোতে ভিএআরের সহায়তা নিলে হয় তো সেলেকাওরা পূর্ণ ৩ পয়েন্ট নিয়েই মাঠ ছাড়তে পারত। ভিএআরের প্রতি রেফারিদের অনীহার দাবি তুলে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দিয়েছিল ব্রাজিল।

মোটা দাগে দুইটি বিষয় নিয়ে ব্রাজিলের ফুটবল কনফেডারেশন নাখোশ। একটি হলো ৫০ মিনিটে সুইজারল্যান্ডের স্টিভেন জুভের করা গোলের সময়। কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলে হেড করার আগে ব্রাজিল ডিফেন্ডার মিরান্ডাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। তারপর বিনা বাধায় বলে মাথা ছুঁয়ে বল জালে জড়ান। কুড়ি মিনিট পর ডি-বক্সে গ্যাব্রিয়েল জেসুসকে বাজেভাবে ফেলে দেন সুইস ডিফেন্ডার ম্যানুয়ের আকানজি। ওই ফাউলটি বেশ দৃষ্টিকটু ছিল। রেফারি ভিএআরের সহায়তা চাইলে হয়তো পেনাল্টি হলেও হতে পারত ব্রাজিল।

অন্যদিকে ইংল্যান্ড নাখোশ তিউনিশিয়ার বিপক্ষে হ্যারি কেনকে ডি-বক্সের মধ্যে করা দু-দুইটি মারাত্মক ফাউল নিয়ে। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মতে ওই দুইটি ফাউল স্পষ্ট পেনাল্টি ছিল। কিন্তু রেফারি সেটি দেননি। তাহলে ভিএআরের প্রয়োজনীয়তাটা থাকল কোথায়? ইংল্যান্ডের ফরোয়ার্ড মার্কাস রাশফোর্ড তো বলেই ফেলেছেন, ‘তিউনিশিয়ার বিপক্ষের ম্যাচে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রেফারির উচিত ছিল অন্তত চেক করে নেওয়া। আসলে ভিএআরের আরো উন্নতি প্রয়োজন। আমি মনে করি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা হয়েও যাবে। খেলায় ভিএআর আনাটা ভালো উদ্যোগ। তবে উন্নতির জায়গা রয়েছে।’

"