বিশ্বকাপের আলোচিত হ্যান্ডবল

প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৮, ০০:০০

আমির হোসেন

ফুটবল ইংরেজি শব্দ। বাংলায় এটার অর্থ দাঁড়ায় ‘পাদগোলক’। পা দিয়েই খেলতে হয় ফুটবল। খেলা চলাকালীন একমাত্র গোলরক্ষক ছাড়া আর কারোরই অনুমতি নেই হাত দিয়ে বল ধরার। আর সেটা কেউ করলে হ্যান্ডবল হয়। মুখোমুখি হতে হয় নানা রকম শাস্তির। তারপরও যুগে যুগে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়, উদ্দেশ্যহীন কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হ্যান্ডবল হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবলে। কিছু কিছু দৃষ্টিকটু হ্যান্ডবল রেফারির দৃষ্টিগোচর হয়নি। যেমন দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের ক্ষেত্রে। কিছু কিছু হ্যান্ডবল রেফারির চোখে লেগেছে। সেক্ষেত্রে খেলোয়াড়রা পেয়েছেন সর্বোচ্চ শাস্তি লালকার্ড ও নিষেধাজ্ঞা। যেমনটা ২০১০ বিশ্বকাপে পেয়েছিলেন লুইস সুয়ারেজ। আর মঙ্গলবার রাতে জাপানের বিপক্ষে পেয়েছেন কলম্বিয়ার কার্লোস সানচেজ। বিশ্বকাপের এমন সব আলোচিত হ্যান্ডবল নিয়েই আজকের আয়োজন।

কার্লোস সানচেজ (২০১৮ বিশ্বকাপ, জাপান-কলম্বিয়া) : ‘এইচ’ গ্রুপের ম্যাচে গেল মঙ্গলবার রাতে মুখোমুখি হয়েছিল জাপান-কলম্বিয়া। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড। পাল্টা আক্রমণে জাপানের ইউইয়া ওসাকো বল নিয়ে কলম্বিয়ার ডি বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন। কলম্বিয়ার গোলরক্ষক ডেভিড ওসপিনা তাকে আসতে দেখে সামনে এগিয়ে আসেন। ওসাকো তার বরাবরই মেরে দেন। ওসপিনা শুয়ে পরে বল ফিরিয়ে দেন। ফিরতি বল চলে যায় শিনঝি কাগাওয়ার কাছে। তিনি ফাঁকা পোস্টের দিকে শট নেন। কার্লোস সানচেজ গোল বাঁচাতে হাত দিয়েই ফিরিয়ে দেন বল। রেফারির সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে লালকার্ড বের করেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম সময়ে লালকার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন সানচেজ। পেনাল্টি পায় জাপান। কাগাওয়া গোল করে ৩ মিনিটেই এগিয়ে নেন জাপানকে। বাকি সময় ১০ জন নিয়ে খেলে জাপানের বিপক্ষে কুলিয়ে উঠতে পারেনি কলম্বিয়া। এই এক হ্যান্ডবলই হারিয়ে দেয় কলম্বিয়াকে।

স্যামুয়েল উমতিতি, (২০১৮ বিশ্বকাপ, ফ্রান্স-অস্ট্রেলিয়া) : ১৬ জুন ফেভারিট ফ্রান্সের কঠিন পরীক্ষা নেয় অস্ট্রেলিয়া। প্রথমার্ধে কোনো গোলের দেখা পায়নি ফরাসিরা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ৫৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ফ্রান্সের অ্যান্তোনিও গ্রিজমান। ৬২ মিনিটেই সমতায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়াকে সমতা ফেরাতে সহায়তা করেন ফ্রান্সের স্যামুয়েল উমতিতি। এ সময় তিনি পেনাল্টি বক্সের মধ্যে হাত দিয়ে বল ফেরানোর চেষ্টা করেন। বল তার হাতে লেগে বাইরে চলে যায়। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) সহায়তায় দেখা যায় বল উমতিতির হাতে লেগেছে। অস্ট্রেলিয়া পেনাল্টি পায়। পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফেরান মিলে জেদিনাক। এই সমতা ৮০ মিনিট পর্যন্ত থাকে। এরপর গোল লাইন প্রযুক্তির সহায়তায় ৮১ মিনিটে আত্মঘাতী গোলে জয় পায় ফ্রান্স।

লুইস সুয়ারেজ (২০১০ বিশ্বকাপ, উরুগুয়ে-ঘানা) : কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল উরুগুয়ে ও ঘানা। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়েরও শেষ মুহূর্তের খেলা চলছিল। এ সময় ডি বক্সের ডানপাশে ফ্রি-কিক পায় ঘানা। ফ্রি-কিক থেকে বল উড়ে আসা বলে ঘানার কেভিন প্রিন্স বোয়েটাং হেড দেন। বল গিয়ে পড়ে পেনাল্টি বক্সের মধ্যে। সেখান থেকে শট নেন স্টিফেন আপিয়াহ। তার নেওয়া শট গোল লাইনের সামনে থেকে পা দিয়ে ফিরিয়ে দেন সুয়ারেজ। ফিরতি বলে আবার হেড দেন ঘানার ডমিনিক আদিয়াহ। এবার গোল লাইনের ওপর লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে বল ফিরিয়ে দেন সুয়ারেজ। তিনি না ফেরালে নিশ্চিত গোল হতো। ঘানার খেলোয়াড়রা হ্যান্ডবলের আবেদন করে। রেফারি এসে পেনাল্টির নির্দেশ দেন। ইচ্ছাকৃতভাবে হাত দিয়ে বল ঠেকানোয় সুয়ারেজকে লালকার্ড দেখান। জার্সিতে মুখ লুকিয়ে মাঠ ছাড়েন সুয়ারেজ। অবশ্য পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ঘানার অধিনায়ক জন মেনসাহ। পরবর্তীতে টাইব্রেকারে উরুগুয়ের কাছে ৪-২ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেবেই বিদায় নেয় ঘানা। সুয়ারেজ হাত দিয়ে বল ফিরিয়ে দলের জন্য ভালোই করেছেন। ওই গোলটি হয়ে গেলে অতিরিক্ত সময়েই হেরে যেত উরুগুয়ে। টাইব্রেকারের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু সুয়ারেজের এক হ্যান্ডবল সেমিফাইনালে তোলে উরুগুয়েকে।

দিয়েগো ম্যারাডোনা (১৯৮৬ বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড) : কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবে। দ্বিতীয়ার্ধের ৫১ মিনিটের মাথায় গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। আর এই গোলটিই ফুটবল বিশ্বে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত। ইংল্যান্ডের ফুটবলপ্রেমীরা অবশ্য এটাকে এখনো ‘হ্যান্ড অব ডেভিল’ বলে। কী হয়েছিল সেদিন? ৫১ মিনিটের সময় ডি বক্সের সামনে থেকে চার-পাঁচজনকে কাটিয়ে ডানদিকে বল বাড়িয়ে দেন ডি বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন ম্যারাডোনা। ডি বক্সের বাইরে থেকে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার স্টিভে হগ হুক করে বল ক্লিয়ার করতে যান। কিন্তু বল চলে যায় ডি বক্সের মধ্যে। ম্যারাডোনা দৌড়ে যান। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন পাঞ্চ করে বল ক্লিয়ার করতে সামনে চলে আসেন। কিন্তু ম্যারাডোনা লাফিয়ে ওঠায় শিলটন পাঞ্চ করতে পারেননি। লাফিয়ে উঠে ম্যারাডোনা হাত দিয়েই বল জালে পাঠিয়ে দেন। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক ও খেলোয়াড়রা রেফারিকে বার বার বলতে থাকেন যে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল দিয়েছেন। কিন্তু রেফারি তাতে কর্ণপাত করেননি। পরবর্তীতে ম্যারাডোনা নিজেই হাত দিয়ে গোল করার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং এটাতে ঈশ্বরের হাত বলে উল্লেখ করেন।

"