উত্তর কোরিয়ার মানুষ কেমন আছে

প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

উত্তর কোরিয়ার শিশুরা স্কুলে যায় বটে, তবে অল্প সময়েই তারা ঝরে পড়ে। শিক্ষার আলো আর ফুটে না তাদের জীবনে। এ ছাড়া দেশটির নাগরিকরা নিজ দেশেই মৌলিক অধিকারহীন। তারা শিকার হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের। পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুর কাছে এই মানবাধিকারের প্রশ্ন চাপা পড়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের আলোচনায় ঠাঁই পায়নি দেশটির মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা। যদিও জাতিসংঘ উত্তর কোরিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নিয়ে সোচ্চার রয়েছে। আজ মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে আলোচনায় বসছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন। বিবিসি গতকাল সোমবার এ কথা জানায়।

উত্তর কোরিয়ায় সবকিছুই সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কিম পরিবারের নেতারা তিন পুরুষ ধরে শাসন করে আসছেন দেশটিকে। বর্তমান নেতা কিম জং উন এবং তার পরিবারের প্রতি পুরোপুরি আনুগত্য দেখিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে দেশটির নাগরিকদের। প্রত্যেক নাগরিকের ওপরই ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। দেশের অর্থনীতি, সেটি তো সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। মানুষের খাদ্য, জ্বালানিসহ মৌলিক বিষয়গুলোতে ভয়াবহ সংকট রয়েছে। তবে কিম জং উনের সরকার অর্থ ব্যয় করছে পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস মনে করেন, উত্তর কোরিয়া একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র। পরমাণু কর্মসূচির পেছনে অর্থ ঢালতে গিয়ে সরকার দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের খাবার কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমই দেশটির মানুষের তথ্য জানার একমাত্র জানালা। গণমাধ্যমও সরকারের পুরো নিয়ন্ত্রণে।

উত্তর কোরিয়ায় গণমাধ্যমের বিন্দুমাত্র স্বাধীনতা নেই। গণমাধ্যমের টুঁটিটা শক্ত করে চেপে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স সর্বশেষ বিশ্বের ১৮০টি দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার যে সূচক প্রকাশ করেছে, তাতে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান ১৮০তম। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকেই নাগরিকদের খবর, বিনোদন বা সব ধরনের তথ্যের খোরাক মেটাতে হয়। কিন্তু তাতে থাকে শুধু সরকারের প্রশংসা। পরিস্থিতি সেখানে এতটাই ভয়াবহ যে কেউ দেশের বাইরের বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে কিছু জানার চেষ্টা করলে তাকে জেলে যেতে হয়। ধনীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। তাতেও নজরদারি আছে। দেশের বাইরে ফোন করা যায় না। দক্ষিণ কোরিয়ায় আছে উত্তর কোরিয়াদের স্বজনরা। তাদের কাছে উত্তর কোরিয়ার কেউ চিঠি লেখলে তা লিখতে হয় মাত্র ৩০ শব্দে। সেই চিঠিও আবার খোলে দেখে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দারা।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, কালো বাজারে কিছু চীনা মোবাইল ফোন পাওয়া যায়, গোয়েন্দা সংস্থার নজরে পড়লে, ফোন ব্যবহারকারী ব্যক্তিকে হয়রানি পোহাতে হয়। উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ংয়ে অভিজাতদের কেউ কেউ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এই সেবাও নজরদারির বাইরে নয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা কতটা আছে? উত্তর কোরিয়ার সংবিধান কিন্তু নিজস্ব বিশ্বাসের অধিকারের কথা বলা আছে। দেশটিতে বৌদ্ধ, শামানিস্ট এবং স্থানীয় চন্দোইজম ধর্মের অনুসারী রয়েছে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গির্জাও সেখানে আছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বক্তব্য হচ্ছেÑ ধর্ম নিয়ে সেখানে লোক দেখানো কিছু কর্মকান্ড আছে। ধর্মীয় কোনো স্বাধীনতা নেই। দেশটিকেই বিশ্বের উন্মুক্ত কারাগার বলা যায় বলে মন্তব্য করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ব্র্যাড অ্যাডামস। সরকারের সন্দেহ হলেই জেলে যেতে হয়। আর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা সেখানে কোনো বিষয়ই নয়। প্রকাশ্যে শিরñেদও করা হয়। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হলে তার পুরো পরিবারকেই চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া হয়। কেউ যদি দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা বা ডিভিডি অথবা কিছু দেখে, তাহলে তাকেও বন্দি করা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ায় সোয়া লাখের বেশি মানুষ কারাগারে।

নাগরিকের শ্রমের ওপরও জবরদস্তি চলে। দেশের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশকে বছরের কোনো না কোনো সময় সরকারের কাছে বিনামূল্যে শ্রম দিতে হয়। চীন, কুয়েত ও কাতারে উত্তর কোরিয়ার হাজার হাজার নাগরিককে ক্রীতদাসের মতো নামমাত্র পারিশ্রমিকে কাজ করতে পাঠানো হয়। তারা নামমাত্র যে পারিশ্রমিক পান, তারও বড় অংশ সরকার নিয়ে নেয়। উত্তর কোরিয়া নিজেদের সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও সেখানে নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার। তাদের শিক্ষা এবং কাজের সুযোগ নেই বললেই চলে। আর আহরহ ঘটে যৌন হয়রানির ঘটনা।

স্কুলের পাঠ্যক্রম রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী দুই লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে।

 

"