জাফলংয়ে বন বিভাগের গাছ লুট : জমি দখল

দেখার কেউ নেই : দাবি স্থানীয়দের

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ জুন ২০১৮, ০১:১৪

এম এ রউফ, সিলেট

জাফলংয়ে বন বিভাগের শত একর সরকারি ভূমি হরিলুট করে বন উজারের মহোৎসব চলছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ভূমি হরিলুটে জড়িতদের নামে মামলা না করে মামলা করা হচ্ছে নিরীহ মানুষের নামে। এতে স্টোন ক্রাশার মেশিন মালিক ও রাঘববোয়ালরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই অনিয়ম দেখার কেউ নেই বলে জানিয়েছেন এলাকার মানুষ।

বন বিভাগের ভূমি হরিলুটের পেছনে প্রধান নিয়ামক হিসাবে কাজ করছেন বন বিভাগের একাধিক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে দিনের পর দিন সরকারি ভূমি হরিলুটের কাজ চলছে। বন বিটের অসাধু কর্মকর্তা আবদুল খালেক সরকারি ভূমি হরিলুটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত? বন কর্মকর্তা আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগসাজশে স্টোন ক্রাশার মেশিন মালিকরা বন বিভাগের সবুজ বন উজার করে নামে বেনামে শতাধিক স্টোন ক্রাশার মিল স্থাপন ও কয়লা, এলসির ভাঙা পাথর রাখার ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরি করেছেন। অবৈধভাবে শতাধিক স্টোন ক্রাশার মেশিন স্থাপনের কারণে বেদখল হয়ে যাচ্ছে শত একর সরকারি ভূমি। হারিয়ে যাচ্ছে জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধ্বংস হচ্ছে জাফলংয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য। স্থানীয় একটি সঙ্গবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ে বন বিটের কর্মকর্তা আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগসাজশ করে বন বিভাগের রোপণকৃত গাছপালা উজাড় করে ওইসব ভূমিতে কয়লা পাথর ও এলসির ভাঙা পাথর রাখার অবৈধ ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরি করছে। সরেজমিন স্থানীয় সোনাটিলা এলাকার লোকজনদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে জাফলংয়ের সোনাটিলা এলাকায় ১১০ ঘর মোহাজের (১৯৬৫ সালের সম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়ে ভারতের আসাম থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা) পরিবার বসবাস করেন। কিন্তু ওই এলাকায় নেই কোনো মসজিদ-স্কুল-মাদ্রাসা বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের। জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় তামাবিল সোনাটিলা গ্রামে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এই মসজিদ নির্মাণে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সারী বন বিটের কর্মকর্তা আবদুল খালেক। যার জন্য আজও মসজিদের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া মসজিদের পাশে মোহাজেরদের নিজস্ব ভূমিতে একটি বেসরকারি বিদ্যালয় নির্মাণ করেন এলাকাবাসী। বিদ্যালয় ও খেলার মাঠ সংস্কার কাজের জন্য গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবদুল হাকিম চৌধুরী এবং পূর্ব জাফলং ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মো. হামিদুল হক ভুইয়া বাবুল অর্থ সহায়তা দেন। বন কর্মকর্তা আবদুল খালেক উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিদ্যালয়টি ভেঙে দেন। মসজিদ আর বিদ্যালয় বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বন কর্মকর্তার আক্রোশের শিকার হয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম ও জাকির হোসেন মানিক। তাদের বন বিভাগের মামলার আসামি হতে হয়। মসজিদের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে এলাকার অনেকই মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বন বিভাগের ৫০টি মাামলার আসামি। ১০টি মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। ওই ১০টি মামলায় তিনি বেকসুর অব্যাহতি পেয়েছেন। বাকি ৪০টি মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। এর পর তাকে নতুন করে আরো পাঁচটি মামলা জড়ানো হয়েছে। সোনাটিলা ছাড়াও আশপাশের এলাকার মোহাজের লোকজন মিথ্যা মামলা হামলার ভয়ে এলাকাছাড়া। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বন বিভাগের অতি নিকটবর্তী স্থানে বৃক্ষ নিধন করে স্টোন ক্রাশার মিল স্থাপন করে কয়লা পাথর ও এলসির ভাঙা পাথর রাখার ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই কেন? অনেকের দাবি এসবের নেপথ্য রয়েছে জাফলং বন বিট অফিসের কর্মকর্তা আবদুল খালেক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, জাফলং বন বিভাগের এই কর্মকর্তা তার দালাল, বনায়নের নামে জায়গা বরাদ্দ পাওয়া লোক এবং চোরদের দিয়ে সরকারি গাছপালা কেটে উজার করছেন। বিনিময়ে প্রতি মাসে তার পকেটে ওঠে কাড়ি কাড়ি ঠাকা।

জাফলং বন বিভাগের ভূমির পরিমাণ ৭ হাজার ৬৫৫ একর। এর মধ্যে শত একর সরকারি ভূমি চলে গেছে অবৈধ দখলদারদের কাছে। এর মধ্যেই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুমন চন্দ্র দাস, বন বিটের সিলেট বিভাগী কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তা, পুলিশ, বিজিবির সমন্বয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এই জমি উদ্ধারে। অবৈধ স্থাপনা ও স্টোন ক্রাশার মেশিন ৭ কার্যদিবসের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো অবৈধ ক্রাশার মেশিন অপসারণ করা হয়নি। অভিযান পরিচালনার আগেই আগাম খবর পৌঁছে যায় অবৈধ দখলদারদের কাছে। জানা গেছে, জাফলং বন বিভাগের রক্ষকরাই ভক্ষকের কাজ করছেন।

"