মাদকাসক্তিতে জন্মে অস্বাভাবিক শিশু

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

কেস-১ রুনু বেগম (ছদ্মনাম) থাকেন রাজধানীর রামপুরায়। পারিবারিকভাবেই তার বিয়ে হয়। স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো। বিয়ের কয়েকদিন পর তিনি জানতে পারেন তার স্বামী মাদকাসক্ত। তিনি নিয়মিত ইয়াবা সেবন করেন। তার দাবি, স্বামীকে মাদক থেকে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ফেরানো সম্ভব হয়নি। দেড় বছরের মাথায় বিয়ে ভেঙে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। তিনি বাবাবাড়ি চলে আসেন। এরপর তিনি প্রতিশ্রুতি দেন মাদক ছেড়ে দেবেন। কয়েকদিন ঠিক থেকে আবার শুরু করেন। এ নিয়ে পরিবারে সুখ বলতে আর কিছুই থাকে না। এর মধ্যে সংসারে একটি পুত্রসন্তান আসে। রুনুর মতে, তার কপাল এত খারাপ যে সন্তানটি কিছুটা অস্বাভাবিক বা অ্যাবনরমাল হয়ে জন্ম নেয়।

রুনু বলেন, সন্তান জন্ম নেওয়ার পর ভেবেছিলাম অন্তত একটা অবলম্বন পেলাম। কিন্তু আমার দুঃখ আরো বেড়ে গেল। সন্তানটি স্বাভাবিক নয়। ডাক্তার বলেন, মাদকের প্রভাব সন্তানের ওপর প্রভাবিত হয়ে এমনটি হতে পারে। বিয়ের আগে রুনু জানতেন না তার স্বামী মাদকাসক্ত। যখনই জানতে পারেন তার স্বপ্নময় জীবনটি একেবারে ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে তার গায়েও হাত তুলেন মাদকাসক্ত স্বামী। অন্ধকার রাতে তার অব্যক্ত কষ্টের হাহাকার কেউ দেখতে পান না। এভাবে অসংখ্যা মাদকাসক্তের পরিবারে জন্ম নিচ্ছে অ্যাবনরমাল বা অস্বাভাবিক শিশু।

কেস-২। মণি থাকেন বাড্ডা। বিয়ের পরই তিনি জানতে পারেন স্বামী মাদকাসক্ত। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। স্বামীকে মাদকমুক্ত করতে বিভিন্ন মাদকাসক্ত কেন্দ্রে চিকিৎসাও করিয়েছেন। কিন্তু এরপরও তিনি মাদক ছাড়তে পারেননি। এর মাঝে তাদের কোলজুড়ে একটি পুত্রসন্তান আসে। কিন্তু ছেলেটি কিছুটা অস্বাভাবিক।

মণির ভাষায়, ‘আমি জানি না কেন এমন হলো। আমার সন্তানটা কিছুটা অ্যাবনরমাল মনে হচ্ছে। তার চিকিৎসা করাচ্ছি। ডক্তার বলছেন, সমস্যা সেরে যাবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাঁজা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, ফেনসিডিল ও ইয়াবার মতো মাদকে যারা আসক্ত হচ্ছেন, তাদের শরীরে এক ধরনের পরিবর্তন ঘটে। যা তার সন্তানের ওপর প্রভাবিত হয়। মাদকে শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। প্রজনন ক্ষমতার বিকাশকে ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত করে। মাদকের প্রভাবে সন্তান বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বা অস্বাভাবিক হয়ে জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে খুব বেশি।

স্বামী বা স্ত্রী মাদকাসক্ত হলে সন্তান কেন অ্যাবনরমাল হবে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোবিজ্ঞানী ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, গর্ভাবস্থায় কোনো মা যদি মাদক সেবন করেন তখন সেটা ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করে। এর প্রভাব সরাসরি সন্তানের ওপর পড়ে। আর বাবা যদি মাদকসেবী হয় এ ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ বা অ্যাবনরমাল শিশু জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মাদক সেবনের কারণে মা বা বাবার শরীরের কোষগুলো পরিবর্তন হয়ে যায়। এটা সন্তানের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া পরিবারে ঝগড়া, মারামারি, অশান্তি এসব সন্তানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে সন্তানও অনেক ক্ষেত্রে এ কারণে মাদকাসক্ত হয়ে যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান নাসরিন ওয়াদুদ বলেন, ‘আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক ঢুকে গেছে। এর জন্য কে দায়ী? দায়ী হলো এই সমাজের প্রভাবশালী মানুষ। যারা মাদক ব্যবসা করে নিজেরা কোটি কোটি টাকা বানিয়েছেন। তারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। আইন তাদের কিছুই করতে পারে না। আমি মনে করি, তাদের এখন থামানো উচিত। যত বড় ক্ষমতাধরই হোক জাতিকে, যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সীমান্ত দিয়ে যাতে মাদক আসতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

মাদক নেওয়ার ফলে এর প্রভাব সন্তানের ?ওপর পড়ছে। সন্তান অস্বাভাবিক হচ্ছে বাংলাদেশে এর কোনো পরিসংখ্যান আছে কি না জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে আমরা দেখি মাদকাসক্তদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। মা-বাবা যদি মাদক সেবন করেন, তাদের কারণে সন্তানের মধ্যে জার্ম বা ক্ষতিকর একটা প্রভাব প্রবেশ করে। যার কারণে সন্তানের মধ্যে কিছুটা অ্যাবনরমালিটি বা অস্বাভাবিকতা তৈরি হয় এবং এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। মাদক নেওয়ার কারণে অস্বাভাবিক সন্তান হতে পারে। তবে আমাদের দেশে এ নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা নেই। উন্নত দেশগুলোতে এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়।’

"