ভয়াল আইলার ৯ বছর আজ

মেরামত হয়নি বেড়িবাঁধ কাটেনি পানির সংকট

প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

আজ ২৫ মে। ২০০৯ সালের এই দিনে সামুদ্রিক ঝড় আইলা আঘাত হানে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে। এতে খুলনা, সাতক্ষীরা ও ভোলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নষ্ট হয় ফসলের জমি ও চিংড়িঘের। বিকল হয়ে পড়ে পানির কল এবং দূষিত হয় মিঠাপানির দীঘিগুলো। লন্ডভন্ড হয়ে পড়ে উপকূল সুরক্ষার বেড়িবাঁধ। তখন থেকেই এসব এলাকায় চলছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। এই সংকট আজও কাটেনি। শেষ হয়নি এই এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের ভোগান্তি। প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ-

শাহ আলম ও মজিবার রহমান কয়রা (খুলনা) থেকে জানান, ২০০৯ সালের এই দিনে জলোচ্ছ্বাস ‘আইলা’ আঘাত হানে খুলনার কয়রা উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায়। ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষ, গবাদিপশু ও ঘরবাড়ি। গৃহহীন হয়ে পড়ে শত শত পরিবার। জমির চিংড়িঘের এবং ফসলের খেত তলিয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় উপকূলরক্ষা বাঁধ আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সেই আঘাত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে খুলনার কয়রা উপজেলার মানুষ। তাদের সুরক্ষাদানকারী বেড়িবাঁধ এখনো মেরামত হয়নি। তবে কয়রা প্রশাসন ও একজন জনপ্রতিনিধির সূত্রে জানা গেছে, জনগণের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।

সর্বনাশা আইলার আঘাতে শুধু কয়রায় নিহত হয় ৪৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশু, আর আহত হয় দুই শতাধিক মানুষ। প্রলয়ঙ্করী আইলা আঘাত আনার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় অঞ্চল কয়রার ৬টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের হাহাকার এতটুকু থামেনি। দুমুঠো ভাতের জন্য জীবনের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। আইলার পর থেকে এসব এলাকায় সুপেয়পানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। আইলাকবলিত এ অঞ্চলের রাস্তাঘাট এখনো ঠিকমতো মেরামত হয়নি। বিশাল এ জনপদে খুবই কমসংখ্যক সাইক্লোন সেল্টার রয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের পাউবোর বেড়িবাঁধের ওপর শত শত মানুষ সেই থেকে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে শত কষ্টের মধ্য দিয়ে বেড়িবাঁধকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তারা।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সহায় সম্পদ বলতে যা কিছু ছিল তার সবটুকু জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাছাড়া ওই সময়কার নদীর প্রবল ভাঙনে শাকবাড়িয়া, কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। গাছপালা শূন্য কয়রা উপজেলার পরিবেশ এখনো সম্পূর্ণ ফিরে পায়নি তার আগের রূপ। স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সময় কৃষক তাদের জমিতে ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখনো লবণাক্ততার গ্রাস থেকে রেহাই পায়নি অনেক এলাকা।

আইলার ভয়াবহতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে বসবাসরত মানুষের চোখে-মুখে এখনো ভয়ংকর সেই স্মৃতি। আইলায় হারেজখালি ও পদ্মপুকুর ভাঙনের সেই হারেজখালি ক্লোজার এখন রীতিমতো ঠিক হয়নি। আইলার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এ জনপদের মানুষের যাতায়াতের পথ খুবই নাজুক। বর্ষার দিনে এ এলাকার মানুষের নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কবি শামসুর রহমান জানান, গত ৪ দিন আগে তার ইউনিয়নের জোড়শিং বাজারের বেড়িবাঁধ ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে বাঁধ রক্ষায় কাজ করা হলেও পাউবো কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পাউবোর আমাদী সেকশন কর্মকর্তা মো. মসিউল আবেদিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

আইলার ৯ বছর অতিবাহিত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূলরক্ষা বেড়িবাঁধগুলোর এখনো সংস্কার হয়নি। সামান্য ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে এ জনপদের কয়েক লাখ মানুষকে। এ মুহূর্তে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দুইটি পোল্ডারে কমপক্ষে ২১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো হলো মহারাজপুর ইউনিয়নের লোকা, পূর্ব মঠবাড়ি, দশাহালিয়া, কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা, গুড়িয়াবাড়ি স্লুইস গেট এলাকা, ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বানিয়াখালি, হড্ডা খেয়াঘাট এলাকা, তেঁতুলতলারচর ট্রলার ঘাট এলাকা, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নে গাতিরঘেরি, কাশিরহাট ও গাববুনিয়া এলাকা এবং দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চরামুখা, মাটিয়াভাঙ্গা, জোড়শিং ও ছোট আংটিহারা এলাকা। এসব এলাকার মানুষ ঝুঁকিতে আছেন। আছেন খাবার পানির তীব্র সংকটে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা জানান, এ এলাকার মানুষ সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। উপজেলা চেয়ারম্যান আখম তমিজ উদ্দিন বলেন, নদীভাঙন বা বেড়িবাঁধগুলো স্থায়ীভাবে সংস্কার করার জন্য এর আগে ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে একাধিকবার জানানো হয়েছে।

‘ঝুলন পাড়া’ : খুলনা প্রতিনিধি মো. শাহ আলম জানান, ওই সময় খুলনার দুটি উপজেলায় প্রবল জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে প্লাবিত হয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আইলা নামের ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানার পর দীর্ঘ ৯টি বছর অতিক্রান্ত হলেও আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের মানুষ।

ভিটেমাটি হারানো শত শত মানুষ এখনো বেড়িবাঁধের ওপর চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। বেড়িবাঁধের টংঘরই বসবাসের শেষ ভরসা হওয়ায় বদলে গেলে মানচিত্র। একটি এলাকার নাম হয়েছে ‘ঝুলন পাড়া’। এদিকে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে ধীরগতিতে। এ কাজের মান নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কালাবগী ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের একটি এলাকার কয়েকশ মানুষ বেড়িবাঁধের ওপর টংঘর করে অনেকটা নদীর চরে ঝুলে বসবাস করছে। ফলে ওই অঞ্চলটির নামকরণ হয়েছে ‘কালাবগী ঝুলন পাড়া’। যাদের একটি অংশ বাস করে কালাবগী ৯নং ওয়ার্ডের বিচ্ছিন্ন দ্বীপের ওপর। চারপাশে কোনো বেড়িবাঁধ নেই। কোনাে রকমে টংঘর করে আছে। নদীতে জোয়ার এলে সাঁতার কেটে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের নৌকায় চড়ে অথবা বই-খাতা হাতে নিয়ে সাঁতার কেটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। স্বাভাবিক অপেক্ষা নদীতে পানির চাপ একটু বেড়ে গেলেই তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়ে।

সূত্রমতে, এখানকার জনগোষ্ঠীর আয়ের উৎস বলতে কৃষি, চিংড়িপোনা আর বনের সম্পদ আহরণ। একদিকে জমিতে বালি এবং পলি পড়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আবাদি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী। এ কারণে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষাসহ মৌলিক চাহিদা মিটাতে না পেরে বহু মানুষ এলাকা ত্যাগে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ইউনিয়নের ৫২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা। চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫ ভাগ কাজ সমাপ্ত করেছে। দাকোপ উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ আবুল হোসেন বলেন, সাধারণ বাঁধ শিপসা নদীর ভাঙন থেকে ওই অঞ্চলকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে উপযুক্ত বাঁধ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দুর্যোগ ঝুঁকি অনেকাংশে কেটে যাবে। দাকোপে গভীর-অগভীর নলকূপ সফলতা না পাওয়ায় পানি সংকট নিরসনে কিছু পুকুর খনন করা হয়েছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আমরা চেষ্টা করছি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য পর্যাপ্ত ট্যাংকি বিতরণ এবং রিজার্ভ হাউস নির্মাণের।

সাতক্ষীরা থেকে আকরামুল ইসলাম জানান, ‘বৃষ্টির পানি শেষ হয়েছে আগেই। গত দুই মাস ধরে পুকুরের পানি খাচ্ছি। কিন্তু পানি কমে যাওয়ায় এখন ঘোলা আর দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেয়ে বেঁচে আছি।’ কথাগুলো উপকূলবর্তী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার খাগড়াঘাট গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বয়সী আমিরণ বিবির। তার সঙ্গে থাকা গৃহবধূ তাসলিমা বেগম জানালেন, তিন কিলোমিটার দূরবর্তী কাশিপুর গ্রাম থেকে খাবার জন্য পানি নিতে এসেছেন। সাত সদস্যের পরিবারের জন্য সকাল-বিকেল দুইবার তাকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ব্যবহারযোগ্য পানি টেনে নিতে হয়। তবে এমন দৃশ্য কেবল ওই খাগড়াঘাট গ্রামে নয়, বরং শ্যামনগর উপজেলার হেঞ্চি, তালবাড়িয়া, কাঁঠালবাড়িয়াসহ গোটা উপকূলীয় জনপদজুড়ে। সর্বত্রই সুপেয় খাবার পানির মারাত্মক সংকট।

২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার পর থেকে আজও উপকূলজুড়ে খাবার পানির তীব্র সংকট। স্থানীয়দের দাবি, আইলায় বেশির ভাগ নলকূপ নষ্ট হওয়ার কারণে পানির এই সংকট তৈরি হয়েছে।

খাবার পানি নিয়ে উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যা নিরসনে সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর থেকে ‘জেলা পরিষদের মালিকানাধীন পুকুর, দীঘি ও জলাধার পুনঃখনন প্রকল্প’ নামে সংরক্ষণসহ নিরাপদ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরসমূহের সমন্বয়হীনতা ও নানামুখী দুর্বলতার কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতে হোঁচট খেয়েছে।

কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামের সুভাস মন্ডল এবং মুজিবর রহমানসহ স্থানীয়রা জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দূরত্বভেদে কলসপ্রতি ১০-৩০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়।

উপজেলা সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকোশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শ্যামনগর এলাকার অধিকাংশ মানুষ পুকুরের পানি পান করে। কিন্তু ২০০৯ সালে আইলার অধিকাংশ পুকুরের পানি লোনা হয়ে গেছে। সংগত কারণেই উপজেলাব্যাপী পানির সংকট রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিভাগের সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম জানান, জেলা পরিষদের মালিকাধীন পুকুর, দীঘি ও জলাধার পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ৫৭টি পুকুর খনন করা হবে। ইতোমধ্যে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০টি পুকুর খননেন টেন্ডার হয়েছে। শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জে ১০টি পুকুর খননের কাজ শুরু হয়েছে।

"