বিদেশ ফেরত নারীশ্রমিকের সংখ্যা জানে না কেউ

কোনো সংস্থা এমনকি মন্ত্রণালয়েও তথ্য নেই

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

কর্মসংস্থানের আশায় অনেক নারীই পাড়ি জমান বিদেশে। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাদের খোঁজ রাখা হয় না। নানা কারণে অনেক নারীশ্রমিক প্রায় প্রতিদিনই ফিরে আসছেন। কেউ চাকরি নিয়ে যাওয়ার এক মাসের মধ্যে, কেউবা ছয় মাসের মধ্যে। অভিবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করছেন, নারী শ্রমিকরা ফেরত আসছেন। কিন্তু ঠিক কত নারীশ্রমিক এভাবে দেশে ফেরত আসছেন, তার সঠিক হিসাব কেউ দিতে পারেনি।

শাহ্ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্যানুযায়ী, গত তিন দিনে সৌদি আরব থেকে ৯২ জন নারীশ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে ৬৬ জন এসেছেন শনিবার রাতে এবং ২১ জন রোববার রাতে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবাননসহ বিশ্বের ১৮টি দেশে জনশক্তি রফতানি করা হয়। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালে অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, যা মোট অভিবাসীর সংখ্যার ১৩ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বেশি নারী বিদেশে যাওয়ার রেকর্ড। ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত অভিবাসনপ্রত্যাশী নারীশ্রমিকদের একা বিদেশে যেতে দেওয়া হতো না। ২০০৩ ও ২০০৬ সালে সেই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারীশ্রমিকদের অভিবাসন হার বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মোট অভিবাসনের ১৯ শতাংশে। ২০১৬ সালে অভিবাসী নারীশ্রমিকের সংখ্যা নেমে আসে ১৬ শতাংশে এবং ২০১৭ সালে হয় ১২ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি নারীশ্রমিক যায়। আবার নানা কারণে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে সেখান থেকেই সবচেয়ে বেশি নারী ফেরত আসেন। তবে কোনো সংস্থা কিংবা মন্ত্রণালয়, কারো কাছে ফেরত আসা শ্রমিকের বিষয়ে সঠিক তথ্য নেই।

শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, সৌদি আরব থেকেই সবচেয়ে বেশি নারীশ্রমিক ফেরত আসছে। গত কয়েক মাসে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেরত আসা নারীদের অনেকেই জানিয়েছেন, গৃহশ্রমিক হিসেবে যাওয়ার পর অনেকেই গৃহকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেকে যৌন নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন। এছাড়া কাজ না পারার অজুহাতে অনেক নারী শ্রমিককে চুক্তি মোতাবেক বেতন দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজের কোনো কর্মঘণ্টা না মানার পাশাপাশি বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দেওয়া, অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়। এমনকি যেসব এজেন্সির মাধ্যমে তারা বিদেশ যান, তাদের বিদেশের অফিসে নিয়ে এসেও তাদের নির্যাতন করার ঘটনা ঘটে।

শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ২০১৭ সালে তারা ১৭ জন নারীশ্রমিককে ফেরত এনেছেন। এসব নারীর সবাই প্রবাসে বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার। ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নারীশ্রমিকরা ফেরত এলেও তার সঠিক সংখ্যা আমাদের জানা নেই। এছাড়া তাদের ব্যাপারে আর অন্যান্য তথ্যও খুব বেশি নেই। আমাদের কাছে কোনো কেস এলে তা জানতে পারি।

বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শেখ রোমানা জানান, গত জানুয়ারি মাসে তার তত্ত্বাবধায়নে ১৮ জন নারীশ্রমিক দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন ছিল সুনামগঞ্জের। তবে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসে ৩৫ জন নারী ফেরত আসার জন্য জড়ো হয়েছিলেন।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালেই প্রতি মাসে গড়ে ২০০ করে নারীশ্রমিক দেশে ফিরেছেন। সৌদি আরবের রিয়াদ এবং জেদ্দায় সেফ হোমগুলোতে গড়ে ২০০ জন করে নারীশ্রমিক আশ্রয় নিয়েছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, বিগত ২-৩ বছরে অন্তত হাজার পাঁচেক নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। এই নারীদের একটি বড় অংশ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার। আমি সংখ্যার দিক দিয়ে বিবেচনা করতে চাই না। কারণ, বাংলাদেশের একটি মেয়ে নির্যাতনের শিকার হলে সেটা আমাদের কাছে বড় বিষয় হওয়া উচিত।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কাছে সৌদি আরবে যাওয়া নারীশ্রমিকের পরিসংখ্যান থাকলেও ফেরত আসা নারীশ্রমিকের ব্যাপারে তথ্য নেই। বিএমইটি’র ইমিগ্রেশন এবং প্রটোকল বিভাগের পরিচালক ড. আতিউর রহমান বলেন, আমাদের নারীশ্রমিকদের বিষয়ে একটা সেল আছে। সেখানে পরিসংখ্যান বিভাগের কর্মকর্তার কাছে এই তথ্য থাকতে পারে। আর পরিসংখ্যান বিভাগের কর্মকর্তা মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, এ সম্পর্কে তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কাছে থাকতে পারে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, কত সংখ্যক নারীশ্রমিক চুক্তি শেষ করার আগেই দেশে ফেরত আসছেন, তা বলা মুশকিল। গত ৩-৪ বছর আগের একটি সরকারি হিসাব ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ফেরত আসা নারীশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার।

শামীম আরো বলেন, এসব নারী নানা কারণে ফেরত এসেছেন। সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে এসব নারীকে ফেরত আনা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তাদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে কত নারীশ্রমিক এভাবে দেশে ফিরে আসছেন, তারও একটা হিসাব পাওয়া সম্ভব হবে।

"