বর্ষায় আরো ভাঙনের আশঙ্কা

বেড়ার নদীরক্ষা বাঁধের ১৫০ ফুট যমুনাগর্ভে বিলীন

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৮, ০০:০০

পাবনা প্রতিনিধি

পাবনার বেড়ার পেঁচাকোলায় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যমুনা নদীর ডান তীর স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধের ১৫০ ফুট নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ধসে যাওয়া অংশ সংস্কার না করায় এর পরিধি বাড়ছে। প্রতিরক্ষা বাঁধের কোল ঘেঁষে যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করায় ধসে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার অনেক জায়গা থেকে সাপোর্টিং ব্লক চুরি হয়ে গেছে। এ কারণে প্রতিরক্ষা বাঁধের প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পানির ঘূর্ণায়মান স্্েরাতের টানে ও ঢেউয়ের আঘাতে হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের নাকালিয়া বাজার, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নদী-তীরবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদ ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে।

নদী ভাঙন প্রতিরক্ষা বাঁধটি গত সোমবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেড়ার মোহনগঞ্জ এলাকায় ৩টি পয়েন্টে নদী ভাঙন প্রতিরক্ষা বাঁধের ৮ ফুট দৈর্ঘ্যে ২ থেকে ৩ ফুট টপ এবং মালদাহপাড়ায় ২টি পয়েন্টে ১০ ফুট দৈর্ঘ্যে ৫ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত বাঁধের টপ দেবে গেছে। সিসি ব্লক আলগা হয়ে পড়েছে। প্রতিরক্ষা বাঁধের নিচে নদীতে ফেলা সাপোর্টিং ব্লক অনেক জায়গা থেকে চুরি হয়ে গেছে। মোহনগঞ্জ ও মালদাহপাড়ায় প্রতিরক্ষা বাঁধের সঙ্গে লাগানো দুটি ইটভাটার

লোড ট্রাক চলাচল করছে। ট্রাকের ঝাঁকুনিতে প্রতিরক্ষা বাঁধের সিসি ব্লক আলগা হয়ে যাচ্ছে। পেঁচাকোলা পয়েন্টে প্রায় এক বছর আগে ১৫০ ফুট এলাকার সিসি ব্লক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পাউবোর বেড়া কৈটোলা নির্মাণ বিভাগ থেকে আজ পর্যন্ত ধসে যাওয়া অংশ মেরামত বা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তারা বলছে, অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় সংস্কার কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এছাড়া মোহনগঞ্জ থেকে কৈটোলা পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাঁধের কোল ঘেঁষে বিভিন্ন পয়েন্টে নদীর তলদেশের ২৫-৩০ ফুট গভীর থেকে পাইপের সাহায্যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর যে স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে তার চারপাশের এলাকা ধসে যাচ্ছে। ফলে প্রতিরক্ষা বাঁধটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে যমুনা নদীর মূল ধারাটি সরাসরি মোহনগঞ্জ ও মালদাহপাড়ায় এলাকায় আঘাত করে। আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টগুলো সংস্কার না করা হলে ¯্রােতের টানে ও ঢেউয়ের আঘাতে বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০০০ সালে এক জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাবনার বেড়ায় গত ৪০ বছরের অব্যাহত নদী ভাঙনে যমুনা ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে সরে এসেছে। এ সময়ে যমুনার ভাঙনে ৭২টি গ্রাম, ১০ হাজার একর ফসলি জমি, ১২টি হাট-বাজার, ৩৫টি স্কুল-মাদ্রাসা, ১৫টি মসজিদ-মন্দির, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙনে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অন্য এলাকায় বাড়ি করেছেন, সহায়-সম্বল হারিয়ে ১৫ হাজার মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। নদী ভাঙনে ভূমিহীন হয়ে ৫ হাজার মানুষ শহরে বস্তিবাসী হয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে যমুনা নদী স্থায়ী ভাঙন রোধের সুপারিশ করা হয়। এই সুপারিশের আলোকে তৎকালীন সরকার বেড়ার মোহনগঞ্জ থেকে কৈটোলা পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার যমুনা নদীর পশ্চিম তীর স্থায়ী ভাঙন রোধ প্রকল্প হাতে নেয়।

পানি উন্নয়ন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় তৎকালীন জোট সরকারের আমলে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা-মেঘনা রিভার ইরোশন মিটিগেশন প্রকল্পের আওতায় যমুনা নদীর সবচেয়ে বেশি ভাঙনপ্রবণ পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ থেকে কৈটোলা পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী স্থায়ী ভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজ ২০০৪ সালে শুরু হয়ে ২০০৮ সালে শেষ হয়। প্রায় ৭ কিলোমিটার যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে (ডানতীর) প্রতিরক্ষা বাঁধ তৈরি করা হয়। প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে মোহনগঞ্জ থেকে রাকশা পর্যন্ত যমুনা নদীর ভাঙন বন্ধ হয়ে যায়। নদীর পশ্চিম পাড়ে জেগে উঠেছে চর। এই কাজে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে গ্লোবাল পজিশনিং (জিপিএস) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এতে গত ১১ বছর বেড়াবাসী যমুনা নদী ভাঙনের তান্ডবলীলা থেকে রক্ষা পেয়েছে। যমুনা নদী-তীরবর্তী এলাকাবাসীর মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু প্রতিরক্ষা বাঁধ সংস্কার না করা, সিসি ব্লক চুরি হওয়া এবং নদীর পাড় ঘেঁষে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে প্রতিরক্ষা বাঁধের ১৫০ ফুট ধসে গেছে। নদী-তীরবর্তী মানুষ ভাঙন আতংকে ভুগছে।

পানি উন্নয়ন বিভাগের কৈটোলা নির্মাণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সার্ভে করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। আগামী অর্থবছরে টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত সংস্কার কাজ করা হবে। ব্লক-জিও ব্যাগ চুরি ও নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

"