ভূমিদস্যুর করাল গ্রাস

সরকারি জমিতে উঠছে বহুতল ভবন, রেহাই পায়নি কবরস্থান

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৮, ০০:০০

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

‘আমার আব্বার কব্বরডা অরা ভাইঙ্গা ঘর বানাইতাছে, চক্ষের সামনে কব্বরে মাডি ফালায়া দহল কইরা নিছে। কিছুই করবার পারলাম না’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নিজমাওনা গ্রামের ইসমাইল হোসেন। ৩০ বছর আগে তার বাবা শাহজাহান মুন্সি মারা গেছেন। বাড়ির পাশে পারিবারিক কবরস্থানে কবর দিয়েছিলেন বাবাকে। গত কয়েক মাস হলো সেই কবরস্থান জবরদখল করে প্রকাশ্যে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ করছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী। শুধু ইসমাইল হোসেনের বাবাই নয় আরমান ও জুলেখার পরিবারের সদস্যদের কবরও দখলবাজদের দখলে চলে গেছে। নিজমাওনার পাশের গ্রাম গাজীপুর। গাজীপুর বাজারের ভেতরও পাকা রাস্তা ঘেঁষে সরকারের জায়গায় প্রকাশ্যে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মসজিদের নামে ওয়াক্ফকৃত জমির ওপর নির্মাণ করা কবরস্থানও। গ্রামের অসহায় নারী পুরুষের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে মাসের পর মাস জেলে রেখে বসতভিটা জবরদখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে। সরকারি ভূমি রক্ষা ও সীমাহীন অত্যাচার থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়ে গতকাল রোববার এলাকাবাসীর পক্ষে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন দিয়েছেন সারোয়ার হোসেন নামে এক ভোক্তভুগী।

জানা যায়, গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইসমাঈল হোসেনের ছেলে খালেদ মাহমুদ ইকবাল হোসেন ক্ষমতার দাপটে প্রকাশ্যে গাজীপুর বাজারে এক নাম্বার খতিয়ানের আরএস ৪৭৫৫নং ও এসএ ১৩৪০নং দাগের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে বারবার জানানোর পরও তারা অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছেন।

এদিকে, অভিযোগটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাজারের এ জমিটি তার পৈতৃক সম্পত্তি। নামজারি ও জমাভাগ করা রয়েছে।’ অন্য দিকে গাজীপুর মৌজার নিজমাওনা গ্রামে কবরস্থান দখল করে ইকবাল নির্মাণ করছেন একটি ভবন। সরকারি জমি জবরদখলে গ্রামের কেউ বাধা দিলেই তার ওপর নেমে আসে অত্যাচার। সেই সঙ্গে করা হয় মিথ্যা মামলার আসামি। সম্প্রতি নিজমাওনা গ্রামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে আবু বকর গংয়ের দখলে থাকা ১৬ শতাংশ জমি জবরদখলের চেষ্টা করে বলে জেলা প্রশাসককের কাছে দায়ের করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। এ সময় আবু বকরের পরিবারের বৃদ্ধ ও নারীদেরকে বেদম পিটিয়েছে ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা। সোহেল নামে এক সন্ত্রাসীকে এলাকাবাসী আটকে রেখে গণপিটুনি দেয়। তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ করে গ্রামের সাধারণ মানুষ। ইকবালের অত্যাচারের শিকার আবু বকরের পরিবারের সদস্য ও এলাকার সাধারণ মানুষের নামে মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার পরপরই আলেয়া নামে এক নারীকে ধরে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। ছয় মাসের শিশুসন্তানকে বাড়িতে রেখে বেশ কিছুদিন জেলে থাকতে হয় আলেয়াকে। তার অপকর্মের প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলার আসামি করা হয়। এসব অভিযোগগুলো মিথ্যা বলে দাবি করেছেন ইকবাল। তিনি বলেন, কবরস্থানের জায়গা দখলের বিষয়টি ভিত্তিহীন।

জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ মিথ্যা এবং বানোয়াট বলে দাবি করেছেন খালেদ মাহমুদ ইকবাল হোসেন।’

জেলা প্রশাসক আরো জানান, ‘সরকারি জমি জবর দখলের খবর পেয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেখানে লোক পাঠানো হয়েছে। তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে মামলা দায়েরসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

ছবি.

১. গাজীপুর বাজারের নিজমাওনা রাস্তায় সরকারি জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন

২. নিজমাওনা নতুনবাজার এলাকায় কবরস্থান দখল করে ভবন উঠছে

"