ঝড়-বজ্রপাতে নিহত ১২

লণ্ডভণ্ড বাড়িঘর : ফসলের ক্ষতি

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে মা-মেয়েসহ ১২ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক লোক। গতকাল শুক্রবার ও বৃহস্পতিবার রাতে নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, নেত্রকোনা, মেহেরপুর, ফেনী ও হবিগঞ্জ জেলায় কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। এতেই এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। এদিকে ঝড়ে খুলনা ও দ্বীপ জেলা ভোলায় আহত হয়েছে ১০ জন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত ও বিনষ্ট হয়েছে ফসলি জমি। এ ছাড়া হবিগঞ্জে শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

নীলফামারী : ডোমার ও জলঢাকায় কালবৈশাখীতে গাছ ও ঘর ভেঙে পড়ে মা-মেয়েসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন। বৃহস্পতিবার রাতে ডোমার, ডিমলা ও জলঢাকার ওপর দিয়ে বয়ে যায় স্মরণকালের কালবৈশাখী। প্রায় ২০ মিনিট স্থায়ী ওই ঝড়ের তান্ডবে অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, উপড়ে গেছে গাছপালা। এ সময় ঘর ও গাছ চাপা পড়ে ডোমার উপজেলায় চারজন, জলঢাকা উপজেলায় তিনজন নিহত হয়। আহত হয়েছে অন্তত ৫০ জন। মুষলধারে বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে উঠতি বোরো খেতের পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

নিহতরা হলেন জলঢাকার খচিমাথা গ্রামের আলম হোসেনের স্ত্রী সুমাইয়া বেগম ও তার তিন মাসের মেয়ে, মীরগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব শিমুলবাড়ি গ্রামের মমিনূর রহমানের ছেলে আশিকুর রহমান, ডোমারের বোতলগঞ্জ গ্রামের আবদার আলী, খানকাপাড়া গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে জামিউল ইসলাম, শাঁখারীপাড়া গ্রামের শুকারু মামুদের স্ত্রী খদেজা বেগম এবং গোমনাতি ইউনিয়নের মৌজাগোমনাতি চৌরঙ্গী বাজার গ্রামের আবদুল গনি।

এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ শিলাবৃষ্টিতে বোরো আবাদের ক্ষতির বিষয়ে বলেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।

নেত্রকোনা : ঝড়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ে আছে রাস্তায়। মারা গেছেন একজন। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলছেন, এর তান্ডবলীলা চলে মাত্র ১০ মিনিট। ¯্রফে ৬০০ সেকেন্ডেই লন্ডভন্ড হয়ে গেছে নেত্রকোনা জেলা। শহরের বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ে আছে রাস্তায়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঝড়ে মারা গেছেন একজন। আহত হয়েছে দেড় শতাধিক মানুষ।

ঝড়ে নিহত ব্যক্তির নাম আবদুল মালেক (৫০)। তিনি সদর উপজেলার কাটাখালী গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় কৃষক আবদুল মালেক ঘরের নিচে চাপা পড়ে মারা যান। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঝড়ে নেত্রকোনার তিনটি উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো হলো নেত্রকোনা সদর, পূর্বধলা ও আটপাড়া। নেত্রকোনা শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক গাছ উপড়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে বিদ্যুতের সরবরাহ। অনেক বাসাবাড়ির ওপর ভেঙে পড়েছে গাছ। গাছ উপড়ে অনেক সরকারি কার্যালয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে পুরো জেলায় বিদ্যুতের সরবরাহ বন্ধ।

নেত্রকোনা জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝড়ে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণের চেষ্টা চলছে।

কুড়িগ্রাম : ফুলবাড়ী ও নাগেশ্বরী উপজেলায় বজ্রপাতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন নাগেশ্বরী উপজেলার কালিগঞ্জ ইউনিয়নের আজিজুল হক (৪৯) ও ফুলবাড়ী উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের আব্দুল আউয়াল (২৫)। নাগেশ্বরীর কালিগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান জানান, সকাল ৯টার দিকে জমিতে ধান কাটার সময় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটলে আজিজুল হক মারা যায়।

অন্যদিকে ফুলবাড়ী উপজেলার ভাঙ্গা?মোড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বাবু জানান, বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতের ঘটনায় আব্দুল আউয়াল আহত হলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে শুক্রবার ভোররাতে তার মৃত্যু হয়।

মেহেরপুর : গাংনীর কাজিপুর গ্রামে বজ্রপাতে ভূট্টো হোসেন (৩৮) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বিকেল ৬টার দিকে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। নিহত ভূট্টো ওই গ্রামের মোল্লাপাড়া এলাকার আজাদ ইসলামের ছেলে। ভূট্টো মাঠে তার নিজ জমিতে কাজ করার সময় বৃষ্টিপাতের সঙ্গে হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলে তিনি মারা যান। পরিবারের লোকজন মরদেহ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়েয়ে গেছে।

ফেনী : ফুলগাজীতে বজ্রপাতে তাহমিনা পারভিন (১২) নামে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুরে উপজেলার দরবারপুর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তাহমিনা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। দুপুরে বাড়ির ছাদে ধান শুকাচ্ছিল তাহমিনা। এ সময় বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

খুলনা : কালবৈশাখীর হানায় বটিয়াঘাটার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। এতে ওই এলাকার ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়াসহ গাছপালা উপড়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, ঝড়ে বটিয়াঘাটা ছাড়াও খুলনা মহানগরীর বেশ কিছু এলাকায় ঘরবাড়ি ও গাছপালা ভেঙে পড়েছে। জমির ফসল ছাড়াও আমের ক্ষতি হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ চৌধুরী জানান, ঝড়ের কবলে পড়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

হবিগঞ্জ : নবীগঞ্জের রাধানগর গ্রামে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে গতকাল সকালে বজ্রপাতে রঙ্গ রাজ (৬০) এক কৃষক নিহত হয়েছেন। তিনি ওই গ্রামের রস রাজের ছেলে। এছাড়া বানিয়াচংয়ে শিলাবৃষ্টিতে প্রায় ২০০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলোতে আর কাস্তে লাগানো যাবে না বলে দাবি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের। গতকাল সকালে দফায় দফায় শিলাবৃষ্টি হয় দৌলতপুর ও মক্রমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওরে।

হবিগঞ্জের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, দুই ইউনিয়নের প্রায় ২০০ হেক্টর জমির ধান শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মামুন খন্দকার বলেন, শিলাবৃষ্টিতে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার খবর পেয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত খেত পরিদর্শন করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। ঝড়ে বাড়িঘর ও গাছপালা ভেঙে পড়েছে।

ভোলা : ঝড়ের আঘাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত এবং ২টি মসজিদ ও অর্ধশতাধিক ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাছপালা উপড়ে গেছে। আহত হয়েছে ১০ জন। বিনষ্ট হয়েছে ফসলি জমি।

মদনপুর ইউপি চেয়ারম্যান নাছির উদ্দিন নান্নু জানান, সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ করেই মদনপুরের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। এতে চর পদ্মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মসজিদসহ শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। অপরদিকে ভোলা সদরের দুর্গম জনপদ রামদাসপুর এলাকায় ঝড়ে ৫টি ঘর এবং একটি মসজিদ বিধ্বস্ত হয়েছে।

ভোলার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক জানান, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

"