যে কারণে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি রাজধানীর হকার

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর ফুটপাত হকার মুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ করে দিতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আসলে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার দায় ঢাকা সিটি করপোরেশন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেউ নিতে রাজি নয়। সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহযোগিতায় ফুটপাত হকার মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, হকারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের লোকজন জড়িত। এ কারণে ফুটপাত হকার মুক্ত করা যাচ্ছে না। এই দুই প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক রেষারেষিতে গুলিস্তান থেকে শুরু করে পুরো ঢাকার সড়কে সড়কে হকার বেড়েছে। এই হকার সমস্যা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন উত্তরা, জসীমউদ্দীন, রাজলক্ষ্মী, মিরপুর, ফার্মগেট, শ্যামলী, রামপুরা ও মালিবাগসহ অধিকাংশ এলাকায় রাস্তায় ওপর বাজার বসানো হয়েছে। এসব বাজারের কারণে একদিকে যেমন পথচারীদের চলাচলের বিঘœ ঘটছে অন্যদিকে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বড় হকার মার্কেট গুলিস্তান। কোনোভাবেই গুলিস্তান থেকে হকার উচ্ছেদ করতে পারছে না। এর সঙ্গে ডিএসসিসির মতিঝিল ও দৈনিক বাংলার মোড়সহ অধিকাংশ এলাকায় রাস্তার ওপর বাজার বসছে। রাস্তার ওপর বাজার বসায় স্বয়ং মেয়র সাঈদ খোকন উদ্বেগে আছে।

গুলিস্তানের ফুটপাত হকার মুক্ত করতে ডিএসসিসির মেয়র কঠোর পদক্ষেপ নিলেও কোনো সফল হননি। ইদানীং গুলিস্তানে হকারদের উপস্থিতি নগর ভবনের সামনে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এরপরও ডিএসসিসি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যÑ নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব উচ্ছেদ অভিযান দায়সারা। ফুটপাত হকাদের দখলের ব্যাপারে ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, হকার উচ্ছেদ ও ফুটপাত দখল মুক্ত করতে পারলে ট্রাফিক যানজট কমবে। বর্তমানে উচ্ছেদ অভিযান যতটুকু পরিচালনা করছি এর চেয়ে ৫গুণ বেশি হকার রাজপথ দখল করছে। হকাররা শুধু গুলিস্তান নয় এখন পাড়া-মহল্লার ফুটপাত দখলে নিয়েছে। এভাবে ফুটপাতে হকার ছড়িয়ে পড়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এজন্য হকার উচ্ছেদের পর মনিটরিং জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, দেখা যাচ্ছে একটি এলাকায় কাঁচাবাজার আছে। এরপরও কিছু দোকানি কাঁচাবাজারের বাইরে রাস্তার ওপরে সবজি নিয়ে বসেছেন। বাজারে ক্রেতা কম আসে, রাস্তার ওপর থেকে বাজার করে বাসায় নিয়ে যান। মেয়রের কথার সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হকার উচ্ছেদ চলমান প্রক্রিয়া হওয়ায় এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান বেগবান করলে আস্তে আস্তে রাজপথ হকার মুক্ত সম্ভব। যা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, কাউন্সিলর, পুলিশ ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। এতে ফুটপাত হকার মুক্ত সম্ভব।

উত্তর সিটি করপোরেশনের এক ঊর্ধŸতন কর্মকর্তা বলেন, সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। একদিকে উচ্ছেদ চালানো হয় অন্যদিকে আবারও হকাররা ফুটপাতে বসে যায়। আবার উচ্ছেদ অভিযানের কথা হকাররা আগেই জানতে পেরে ফুটপাতে দোকান বসায় না। এভাবেই চলছে হকার ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে লুকোচুরি খেলা। সিটি করপোরেশন ও কাউন্সিলরদের ঐকমত্য না থাকতে পারে কিন্তু হকাররা বসা মাত্রই তারা একজোট হয়ে যায়। ফলে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় না।

হকার সমিতির পরিসংখ্যানে রাজধানীর ফুটপাতে ৩ লাখের ওপরে হকার। ঈদের সময়ে হকারের সংখ্যা ৪ থেকে ৫ লাখে পৌঁছে। মৌসুমি হকার ফুটপাতে বসার জায়গা না পেলে তারা পাড়া-মহল্লা ও গণপরিবহনে ব্যবসা করে। প্রত্যেক হকার স্থানভেদে চাঁদার পরিমাণ কমবেশি দিয়ে থাকেন। গুলিস্তানে একজন হকার ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দিতে হয়। আর মহাখালী প্রতি হকার ১৫০ টাকা চাঁদা দেয়। গড়ে ১৫০ টাকা চাঁদা হলে প্রতিদিন ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ওঠে। ক্ষমতাসীন দলের নাম ভেঙে মহল্লার কিছু প্রভাবশালীর পকেটে চাঁদার টাকা চয়ে যায়। রমরমা এই চাঁদাবাজির কারণেই সকালে হকার উচ্ছেদ করলে বিকালে পুনরায় বসে যায়।

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের উপদেষ্টা মুরশিকুল ইসলাম শিমুল বলেন, ফুটপাত হকার মুক্ত রাখার প্রক্রিয়ায় সিটি করপোরেশন যাচ্ছে না। আগে উচ্ছেদ পরে হকারদের বিকল্প ব্যবস্থা করার পক্ষে আমরা না। পরিকল্পিতভাবে হকারদের জীবন ধারণের ব্যবস্থা করে দিলে হকাররা ফুটপাতে বসে না। এরপরও পুলিশ প্রশাসন যদি কঠোর পদক্ষেপ নেয় তখন ফুটপাত হকার মুক্ত রাখতে পারবে। এছাড়া সম্ভব নয়।

 

"