বিনা বেতনে ৩৮ বছর শিক্ষকতা

মাদ্রাসাটি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)

“৩৮ বছর আগের কথা। সবে মাত্র দাখিল পাস করেছি। পড়াশোনার পাশাপাশি গ্রামে কিছু একটা করার তাগিদ থেকেই একটা মক্তব প্রতিষ্ঠা করি। গ্রামের শিক্ষার্থীরা এখানে বিনামূল্যে পড়াশোনা শুরু করে। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর মধ্যে আমিও আলিম পাস করে ফেলি। হঠাৎ মাথায় চিন্তা আসে মক্তবটাকে মাদ্রাসায় রূপান্তর করার। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার কথা শোনে ২৭ শতাংশ জমি দান করেন গ্রামের বাসিন্দা মেহের আলী ও শমসের আলী। আমিও দেই ১৩ শতাংশ জমি। গ্রামের লোকজনের সহযোগিতা নিয়ে ৪০ শতাংশ জমির ওপর একটি টিনশেড চালা ঘর নির্মাণ করে মাদ্রাসার নামকরণ হয় ‘গৌরীপুরের টিকুরী স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’। এরপর ১৯৮২ সালে ৭০ জন শিক্ষার্থী ও দুজন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু করে গৌরীপুরের টিকুরী স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাটি। তারপর গত ৩৮ বছর ধরে বিনা বেতনেই এখানেই শিক্ষকতা করছি।” এইকথাগুলো মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও সহকারী মৌলবি শিক্ষক আমজাদ হোসেনের। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, আলিম পাস করার পর অন্যত্র ভালো চাকরির সুযোগ থাকলেও গ্রামের শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে এখানেই বিনা বেতনে যৌবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছি। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়েও প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়নি, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই বিষয়টা আমাকে অনেক কষ্ট দেয়। মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত হয়েছেÑ মৃত্যুর আগে এটা দেখে যেত পারব তো?

গৌরীপুর উপজেলার মইলাকান্দা ইউনিয়নের টিকুরী গ্রামে অবস্থিত গৌরীপুরের টিকুরী স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৩ সালে মাদ্রাসাটি সরকারের নিবন্ধনভুক্ত হয়। প্রথম দিকে চালাঘর থাকলেও ২০১৫ সালে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান রিয়াদুজ্জামানের সহযোগিতায় এখানে পাঠদানের জন্য আধাপাকা ভবন নির্মাণ করা হয়।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসা ভবনে ৪টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে একটি কক্ষ অফিসের কাজ চলে। বাকি ৩টি কক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। তবে পাঠদান কক্ষগুলোতেও রয়েছে জরাজীর্ণতার ছাপ। কোনো পাঠদান কক্ষেই ৩টির বেশি বেঞ্চ নেই। ব্ল্যাকবোর্ড রয়েছে শুধু দ্বিতীয় শ্রেণির কক্ষে। একাধিক কক্ষে চেয়ার-টেবিল না থাকায় শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠদান করাতে হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় গরমের দিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও পোহাতে হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিনা আক্তার, শরিফ মিয়া কুলসুম আক্তারসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানান, বেঞ্চ না থাকায় ক্লাসে বেশি শিক্ষার্থী এলে আমাদের মেঝেতে বসতে হয়। তবে আমাদের স্যার ও আপারা খুব আদর করেন। মাদ্রাসায় নিয়মিত আসার প্রতিযোগিতায় আমাদের চকলেট দেন।

মাদারাসা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৩ সাল থেকে মো. আমজাদ হোসেন আজাদ, ১৯৮৫ সাল থেকে মেহেরুনন্নেছা, ২০০৫ সালে শরিফা আক্তার মাদ্রাসায় যোগদান করেন। এরপর ২০১১ সালে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি মূলে আবেদন করে ২০১১ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক পদে খাদিজা বেগম ও সহকারী শিক্ষক রাবিয়া খাতুন যোগদান করে শিক্ষকতা করছেন। তবে বেতন না পাওয়ায় প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দিয়ে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন পাঁচজন। মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানান, পাশের স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বিস্কুট ও উপবৃত্তি পায়। তবে মাদ্রাসায় বিস্কুট ও উপবৃত্তি সুবিধা গত কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। অথচ এখানেই দরিদ্র ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করছে।

এরই ফাঁকে ঘুওে ঘুরে গ্রামের নানা বয়সী মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসাটি গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে অনেকেই এখন বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। তবে নানা সীমাবদ্ধাতা ও সংকটের কারণে ভালো পরিবারের শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে চায় না। তবে আশপাশে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা এখানে এই মাদ্রাসাটিতেই পড়াশোনা করে।

গৌরীপুর আর কে সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুল বলেন, আমি ছোটবেলায় এই মক্তবে পড়াশোনা করেছি। তবে দীর্ঘদিনেও এই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় অনেক শিক্ষক অভাব-অনটনে আছেন।

মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক খাদিজা বেগম বলেন, এই মাদ্রাসা গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাদ্রাসার শিক্ষকরা বিনা বেতনে পাঠদান করে যাচ্ছেন। তাদের এমপিওভুক্ত দ্রুত প্রয়োজন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল আলম বলেন, এই মাদ্রাসা শিক্ষকরা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকার তাদের বিষয়ে দ্রুত একটি নীতিমালা করতে যাচ্ছে। তারপর হয়তো সরকার তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

"