জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

রং হারাচ্ছে সবুজ ক্যাম্পাস হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

তহিদুল ইসলাম, জাবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় (জাবি) প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি বিশ^বিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে অতিথি পাখি, আছে দৃষ্টি নন্দন লেক আর ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ শান্ত সবুজ শ্যামল প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। যা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছে এমন এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যে, ভ্রমণপিপাসুরা প্রায়ই বেড়াতে আসেন এখানে। কিন্তু এই প্রাকৃতিক পরিবেশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে প্রশাসন কিছু কিছু শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের সম্মিলিত আগ্রাসনে। বিশ্ববিদ্যালয় হারাচ্ছে তার চিরাচরিত সৌন্দর্য। ‘পরিবেশ সুরক্ষা’ নামে দিন দিন জঙ্গল পরিষ্কার করে ফেলা হচ্ছে। কখনো কখনো পরিষ্কারের নামে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে গাছপালা আচ্ছদিত বিস্তীর্ণ সবুজ অঞ্চল। এতে হুমকির মুখে পড়ছে এখানে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী, কীট-পতঙ্গ ও পাখপাখালীর জীবন। এসব কথা স্বীকার করলেন গবেষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপকগণ এমনকি প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও।

ধারণা করা হয়, বিশ^বিদ্যালয়ের আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানি ও এক-তৃতীয়াংশ গাছপালায় ঘেরা। এসব গাছপালা, জলাশয় এই বিশ^বিদ্যালয়ের আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে, যা বাংলাদেশের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওয়া যায় না। এখানকার জলাশয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিচরণ করে। শীতকালে জড়ো হয় পারিযায়ী পাখি। আর গাছপালা আচ্ছাদিত ঝোপঝাড়ে বাস করে কীট-পতঙ্গ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির নিশাচর প্রাণী। দিন দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় এসব প্রাণীর জীবন এখন হুমকির মুখে। বিশ^বিদ্যালয়ে এখন আর আগের মতো সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক ঝোপঝাড় আর দেখা যায় না। এর প্রভাব পড়ছে সেখানকার বন্যপ্রাণীর ওপর।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ^বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পাশর্^বর্তী স্থান, ভিসির বাসভবনের পাশর্^বর্তী পুকুরের সামনে, বেগম খালেদা জিয়া হলের সামনে, সুইমিংপুলের সংলগ্ন স্থান, টিএসসির পাশর্^বর্তী স্থান, আল-বেরুনী হলের পেছনের মাঠ, কেন্দ্রীয় মসজিদের পশ্চিম পাশে, পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের পশ্চিম পাশে, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের পূর্ব পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। এর কোথাও কোথাও কেটে ফেলা হয়েছে আবার কোথাও বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ঘন জঙ্গল আচ্ছাদিত এসব এলাকা এখন খা খা করছে।

সম্প্রতি ঝোপঝাড় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা অনেক বেশি ঘটছে। বিশ^বিদ্যালয়ের কর্মচারীরা ‘আগাছা’ পরিষ্কারের নামে ঝোপঝাড় পুড়িয়ে ফেলছে। আবার কখনো কখনো কিছু কিছু শিক্ষার্থীও আগুন দিয়ে এসব ঝোপঝাড় পুড়িয়ে ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও বহিরাগতরা মাঝে মাঝে এসে আগুন লাগায় বলে অভিযোগ প্রশাসনের। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি আবাসিক হলের আশপাশের গাছপালা ও ঝোপঝাড় সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য কেটে ফেলা হয়েছে।

এদিকে, ঝোপঝাড় পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এক সময় রাত নামলেই ক্যাম্পাসে শিয়ালের ডাক শোনা যেত। তবে আবাসস্থল কমে যাওয়ার এখন শেয়ালের ডাক তেমন শোনা যায় না। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শেয়ালরা দিনের বেলায় ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নিত। ক্যাম্পাসে পরিচিত আরেক প্রাণীর মধ্যে অন্যতম হলো গুঁইসাপ। কিছুদিন আগেও পথে চলতে গেলেই সামনে পড়ত প্রাণীটি। তবে এখন এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এছাড়াও বাগডাশা, বন বিড়াল, বেজি নেই বললেই চলে।

কমেছে বিভিন্ন পাখির বিচরণও। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এর জলাশয়গুলোতে প্রতি বছর প্রচুর দেশি-বিদেশি পাখি আসে। এবারও বেশ আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে অতিথি পাখি আসে। তবে বেশি দিন থাকেনি। বিশেষজ্ঞরা এর কারণ হিসেবে লেকের পাড়ে আগাছা, ঝোপঝাড় পরিষ্কারকে কারণ হিসেবে দায়ী করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১১০ প্রজাতির প্রজাপতি শনাক্ত করা হয়েছে। বহু আগে থেকেই এখানকার প্রকৃতিতে এসব প্রজাপতির বাস। তাছাড়া এখানে প্রাণীটি রক্ষায় গণসচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর প্রজাপতি মেলার আয়োজন করা হয়। তা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রজাপতির প্রজাতি ও সংখ্যা কমছে। বর্তমানে এর সংখ্যা এক শ’র নিচে নেমে এসেছে। আর এর কারণ হিসেবে গবেষকরা অবকাঠামো বেড়ে যাওয়া, গাছ কাটা, লতাগুল্ম কমে যাওয়া প্রভৃতিকে দায়ী করছেন।

এছাড়া আরেকটি কারণেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতির পরিবেশ হুমকির মধ্যে পড়েছে। সেটি হলো দর্শনার্থী বা ভ্রমণপিপাসুদের আগমন। ছুটির দিনে ক্যাম্পাসে তাদের উপচেপড়া ভিড় থাকে। এরাও এখন কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে সবুজ ক্যাম্পাসের জন্য। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিস থেকে বলা হচ্ছে, দর্শনার্থীদের গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে শহীদ মিনারে বাগান করা যাচ্ছে না।

প্রাণী গবেষকদের আশঙ্কা, যেসব প্রজাতির প্রাণী এখনো টিকে আছে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ক্যাম্পাসে তাও আর দেখা যাবে না। তারা বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত প্রয়োজনে কিছুটা ঝোপঝাড় কেটে ফেলা প্রয়োজন হতে পারে। তবে অপ্রয়োজনে ঝোপঝাড়, গাছপালা যেন না কাটা হয়।

বন্যপ্রাণী গবেষক প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বলেন, অবকাঠামোর প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছপালা, ঝোপঝাড় কিছুটা কাটা পড়তে পারে। তবে অপ্রয়োজনে যেন ঝোপঝাড় পরিষ্কার না হয়ে যায় সে বিষয়টা আমাদের খেলায় রাখতে হবে। ঝোপঝাড় কমে যাওয়ার কারণে শিয়ালের সংখ্যা কমে গেছে। কারণ এরা দিনের বেলায় ঝোপঝাড়ে অথবা গর্তে লুকিয়ে থাকে। সুতরাং, ঝোপঝাড়ই যদি না থাকে। তবে এরা থাকবে কোথায়? এছাড়া ছোট ছোট প্রাণী, কিছু পাখি ঝোপঝাড়ে বিচরণ করে টিকে থাকে। এদের সংখ্যাও কমতে পারে।

প্রজাপতি গবেষক প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, শীতকালে ঝোপঝাড় এমনিতেই কমে যায়। তার ওপর আমাদের এখানে শীতকালে ঝোপঝাড় কেটে ফেলা হয়। অপ্রয়োজেনও ঝোপঝাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। আগের চেয়ে প্রজাপতি অনেক কমে গেছে। আর যেভাবে ঝোপঝাড় পরিষ্কার হচ্ছে তাতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে প্রজাপতি যা, আছে তাও থাকবে না। এছাড়া গুঁইসাপ দেখা যেত, এখন প্রাণীটি কমে গেছে। কমেছে শিয়াল, গিরগিটিসহ নানান প্রাণী। আর বাগডাশা তো নেই বললেই চলে। আর ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার কারণে অতিথি পাখি এবার আগেই চলে গেছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেটের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিন বলেন, গাছপালা কেটে ফেলার কারণে সবুজ ক্যাম্পাস আর সবুজ থাকছে না। অনেক সময় অপ্রয়োজনে গাছপালা কেটে ফেলা হয়। আইবিএ ইনস্টিটিউট ভবন করার জন্য বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশে বহু গাছ কেটে ফেলেছে। তবে কোনো অনুমতি নেয়নি। এখন আবার তারা অন্য জায়গায় ভবন করবে। এতে সে জায়গায়ও গাছা কাটা লাগবে। আর ঝোপঝাড়ে অনেক সময় বহিরাগতরা এসে আগুন দেয়। ছাত্র-ছাত্রীরাও ঝোপঝাড়ে আগুন লাগায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি।

"