বাড়ছে ভেজাল, ছড়িয়ে পড়ছে রোগবালাই

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

পাঠান সোহাগ

প্রতি বছরই জনস্বাস্থ্য পুষ্টি ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ল্যাবরেটরিতে ভেজাল খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হয়। গত বছর জেলা সিভিল সার্জনের মাধ্যমে ৬০০ জন সেনেটারি ইন্সপেক্টর ভেজাল খাদ্যদ্রব্য শনাক্তকরণে কাজ করেন। তারা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দোকানে অভিযান পরিচালনা করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় হাজার ৪৭টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরে এসব নমুনা আইপিএইচ ল্যাবে পাঠানো হয়। সেখানে যাচাই-বাছাই শেষে ৬০টি দ্রব্যের পাঁচ হাজার ১৪৬টি নমুনা পরীক্ষা করেন ল্যাব কর্তৃপক্ষ। এতে এক হাজার ২৩৫টি নমুনায় মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। এসব খাদ্য দ্রব্যের মধ্যে জেলি, সন্দেশ, বুন্দিয়া , লাড্ডু, মিষ্টি, ডালডা, পনির, লাচ্ছি, পাউরুটি, খেজুরে ভেজাল পাওয়া গেছে। তবে আইপিএইচ এসব নমুনার পরীক্ষা-নীরিক্ষা সর্বোচ্চ গোপনীতার মাধ্যমে সম্পন্ন করেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শিশুদের প্রিয় চকোলেট, গরুর দুধ, সকল প্রকার ফলমূল, ফলের জুস, মসলা, ভোজ্য তেলেও ভেজাল পাওয়া গেছে। এক কথায় বলতে গেলে, হাতের কাছে যা পাওয়া যাচ্ছে তাতেই কম-বেশি ভেজাল রয়েছে। এ ভেজাল পণ্য শুধু দেশের কোনো বিশেষ এলাকায় নয়, সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে। এতে হুমকিতে পড়েছে জনস্বাস্থ্য।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রশিদ-ই মাহবুব বলেন, ‘এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মানবদেহে রোগব্যাধি আক্রান্তের হার মারাত্মক আকার ধারণ করবে। আগামী ২০ বছরে ৭০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হবে।’ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব খাদ্যপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত পর্যন্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

বিশেষ করে কিডনি রোগ, লিভারসিরোসিস, হার্ট অ্যাটাক, ক্যানসার, শ্বাসকষ্টসহ প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের মতো জটিলতাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আইপিএইচের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বাজার থেকে জেলি, সন্দেশ, বুন্দিয়া ও লাড্ডুর দুটি করে নমুনার সংগ্রহ করা হয়। এগুলোর সবকটিতেই ভেজাল ছিল। ২২৪টি মিষ্টির নমুনার মধ্যে ২২৩টিতে, আট ব্র্যান্ডের ডালডা, দই, পনির, লাচ্ছির ১২টি করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পাউরুটি, খেজুরের দুটি ও ছানার তিনটি নমুনা টেস্ট করে ভেজাল উপাদান পাওয়া গেছে। একইভাবে ১৪টি ব্র্যান্ডের ঘি পরীক্ষা করে সাতটিতেই ভেজাল পেয়েছে আইপিএইচ। গুড়ের ৫১টি মধ্যে ৩৭টি, মধু ও লিকুইড গ্লুকোজের ১২টি নমুনার মধ্যে ৮টিতে ভেজাল। এছাড়া ধনিয়া গুঁড়ার ১২৪টি নমুনার মধ্যে ৫৯টি, সেমাইয়ের ৩৮টি নমুনার মধ্যে ২৬ টিতেই ভেজাল। চকোলেট, টফি, লজেন্সের ১১টি নমুনার মধ্যে সাতটি ভেজাল। সয়াবিন তেলের ১০৬টি নমুনার ৭২টি, সরিষার তেলের ৩৪২টি নমুনার মধ্যে ১০৫টি, ও ৯টি অলিভ-অয়েল ব্র্যান্ডের নমুনার মধ্যে চারটিই ভেজাল। চাটনি, আচার ও সসের ৩০টি নমুনার মধ্যে ১০টি, শুঁটকি মাছের ১৫টি নমুনার মধ্যে ৩টি ও লবণের ৭৩৬ টি নমুনার মধ্যে ২৪৮টি ভেজাল। ছাড়াও ফলের জুস, সিরাপ, শরবত, তরল ও গুঁড়া দুধসহ বিভিন্ন খাদ্যের নমুনায় ভেজাল মিশ্রণ পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন গবেষণায় পরিক্ষা-নীরিক্ষার প্রাপ্ত ফল বিশ্লেষণ করে পুষ্টিবিদরা বলেছেন, ভোজ্যতেলে খনিজ তেল, সরিষা তেলে সায়ানাইড, অ্যালকোহল জাতীয় খাদ্যে মিথানল, সস্ ও পুডিংয়ে বেসিলাম সেরিয়াস, কোল্ড ড্রিংসে বোমিনেটেড ভেজিটেবল অয়েল, জিলাপি ও চানাচুর তৈরিতে পোড়া মবিল ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া হলুদ-মসলার গুঁড়াতে লেড ক্রোমেট, আপেল ও বিভিন্ন ফলে লেড আর্সিনেট, মুড়িতে ইউরিয়া সার, দুধে ডিটারজেন্ট, ইউরিয়া ও তেল ব্যবহার করা হচ্ছে।

অসাধু ব্যবসায়ীরা বরই, মাল্টা, কলা, কমলা জাতীয় ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, শুঁটকি মাছে ডিডিটি, মাছ চাষে ইউরিয়া, মিনিকেট চালে ইউরিয়া ও মোম, গুড় এবং মুড়িতে হাইড্রোজ ব্যবহার করে আসছে। রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত এসব খাদ্য গ্রহণ করে মানুষ স্নায়ুতন্ত্রের রোগ, খাদ্যনালির ক্যানসার, রক্তশূন্যতা, প্যারালাইসিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়া ও ব্রেন ড্যামেজের মতো রোগে ভুগছেন। এমনকি গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ক্যানসার, কিডনি রোগ, এমিনিয়া, অন্ধত্ব বরণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি ও ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির প্রধান ডা. শাহানা আলম বলেন, ‘আমাদের কাছে যে সকল নমুনা এসেছে তার সবগুলো পরীক্ষা হয়নি। বিভিন্ন রকম রাসায়কি পদার্থ পরীক্ষা করে নমুনা অনুসারে মাত্রা অতিরিক্ত রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যদি উন্নত দেশগুলোর মতো মাইক্রোবায়োলজিক্যাল টেস্ট চালু থাকত তবে ভেজাল শনাক্তের পরিধিও বাড়ত। এ জন্য উন্নত মেশিন চালু ও টেকনোলজিস্টদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।’

 

"