সিরিয়ায় প্রেম ও অন্য জীবনের ছবি আঁকেন যে শিল্পী

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

একটি ‘ক্রিসমাস ট্রি’ ঘিরে বসে বন্ধুরা গল্পগুজব করছে, দুজন লং ডিসট্যান্স প্রেমিক কথা বলছে টেলিফোনে, আর একজন পুরুষ তার বান্ধবীর জন্য ইন্টারনেট কানকেশনটা মেরামত করার চেষ্টা করছেন।

প্রথম দেখায় ডিমা নাচাউইর ছবিগুলো দেখলে মনে হবে এ ছবি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেরই ভালোবাসার ছবি হতে পারে। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, নাÑ এ ছবিতে সম্পূর্ণ অন্য গল্পও রয়েছে। সে গল্প বিমান হামলার, সে গল্প আঘাতের এবং মৃত্যুর।

আসলে এ ছবি হলো সিরিয়ার ইস্টার্ন ঘৌতা অঞ্চলে সত্যিকারের মানুষ কিভাবে বেঁচে রয়েছে এবং ভালোও বাসছে তারই।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ অঞ্চলকে বর্ণনা করেছেন ‘পৃথিবীর বুকে এক নরক’ হিসেবে।

ডিমার কথায়, ‘তবু কিন্তু এখানকার বাসিন্দারা তাদের রোজকার জীবনযাপন করছে, তারা প্রেমেও পড়ছে এবং ভালোবাসার জনকে বাঁচানোর চেষ্টাও করছে!’

ডিমা বড় হয়েছে সিরিয়ায়ই। কিন্তু বহু বছর আগে দেশ ছাড়ার পর তিনি এখন বৈরুতের বাসিন্দা আর সেখানেই একজন শিল্পী হিসেবে তিনি নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। সিরিয়ার পরিস্থতি নিয়ে নানা ধরনের সৃষ্টিশীল প্রকল্পেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন তিনি।

তার এই প্রেম হলো...’ কালেকশনটা সদ্যই সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এর ছবিগুলো সত্যিকারের মানুষের জীবন নিয়ে, আর তাদের সম্পর্কে সিরিয়ার সংঘাত কি প্রভাব ফেলছে- তা নিয়ে।

প্রতিটি ছবিতেই ডিমা তুলে ধরেছেন আলাদা আলাদা, অনামা কোনো দম্পতিকে আর তাদের পরিচয় সম্পর্কে খুব কম তথ্যই তিনি প্রকাশ করেছেন।

‘এই প্রজেক্টটা ছিল ভীষণই কঠিন - বিশেষ করে যে ছবিটায় মেয়েটি মারা যায়, সেটি’, ডিমা বলছিলেন নিচের ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে। ছবিটা কেমন দেখতে লাগবে সেটা যেমন আমি ভাবছিলাম, তেমনি ছবিটা আঁকার সময় আমার মনটাও ভারাক্রান্ত হয়েছিল।’

‘আসলে যার শেষটা সুখের নয়, সে ছবি আঁকাটা ভীষণ, ভীষণ কঠিন।’ ‘কিন্তু আমি কৃতজ্ঞ যে এই সুযোগে আমি সিরিয়ানদের জীবনের অন্য দিকটাও দেখার সুযোগ পেয়েছি। জীবনের এই দিকটায় তারাও বাঁচেন, তারাও ভালোবাসেন এবং তারা সেখানে কিন্তু ভিক্টিম নন।’

‘আমার ছবিগুলোতে আমি তাদের ঠিক সেই দিকটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’ এদিকে, বিদ্রোহী অধিকৃত ইস্টার্ন ঘৌতা থেকে দলে দলে মানুষের পালিয়ে যাওয়ার খবর আসছে, বলা হচ্ছে সেখানকার পরিস্থিতি ‘সংকটজনকের চেয়েও খারাপ।’

সামান্য কিছু ত্রাণ সেখানে পৌঁছেছে ঠিকই, কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো বলছে আরো অনেক বেশি সহায়তা পাঠানো দরকার। গত কয়েক সপ্তাহে সাত শ’রও বেশি মানুষ সেখানে মারা গেছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই শিশু।

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যেভাবে সিরিয়ার মানুষের ছবি তুলে ধরছে, ডিমা তাতে আদৌ খুশি নন।

‘মানুষ হিসেবে আমাদের যেন শরণার্থী ও ভিক্টিম হিসেবে স্টিরিওটাইপ করে ফেলা হচ্ছে’, গভীর খেদের সঙ্গে বলছিলেন তিনি।

‘আমি তো বরং সিরিয়ার মানুষের সঙ্গে সেটা নিয়েই কথা বলতে চাইব যে কিভাবে তারা বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, কিভাবে তাদের রোজকার দিন কাটছে।’

‘তবে যখনই আমার খারাপ লাগে, আমি কিছু না কিছু করার চেষ্টা করি। আমি জানি, আমার ছবির ভক্তরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছেন- আমি তাদের কাছে একটা বার্তা পৌঁছে দিতে চাই, সিরিয়া নিয়ে এমন কিছু তাদের জানাতে চাই যেটা তারা আগে জানতেন না!’

‘আমার ছবি আর শিল্পকলাই এই কাজে আমার একমাত্র হাতিয়ার। ঠিকই, আমি হয়তো সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব একটা বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারব না।’ কিন্তু আমি এটা জানি, আমার ছবি সিরিয়ার সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার কাজটা করছে, পরবর্তী প্রজন্ম যেটা দেখে জানতে পারবে আসলে সে দেশে তখন কী ঘটেছিল!’

"