ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে সুন্দরবনে বাঘশুমারি

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা জানতে গতকাল বুধবার থেকে শুরু হয়েছে বাঘশুমারি। এই বনে বর্তমানে কতগুলো বাঘ আছে, ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতির এই শুমারির মাধ্যমে সেটাই গণনা করা হবে। কীভাবে হয় এই বাঘশুমারি? এত বিশাল একটি বনে, অনেকটা একই রকম ডোরাকাটা দেখতে বাঘগুলোকে কীভাবে সনাক্ত করা হয়?

বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী জানিয়েছেন, ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘের মোট সংখ্যা বের করা হবে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে সুন্দরবনে বাঘশুমারি করা হয়েছিল। সেই শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ১০৬টি বাঘ রয়েছে। তার আগের ২০০৪ সালের পাগ-মার্ক বা পায়ের ছাপ পদ্ধতিতে হওয়া শুমারি অনুযায়ী বনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৩০টি।

ক্যামেরা ট্র্যাপিং বা ক্যামেরার ফাঁদ পেতে ছবি তোলার এই পদ্ধতির জন্য সুন্দরবনের কিছু জায়গা স্যাম্পল হিসেবে নিয়ে তিনটি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। এসব ব্লকের ২৩৯টি পয়েন্টে ৪৭৮টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরার সামনে দিয়ে বাঘ বা কোনো প্রাণী চলাফেরা করলেই ছবি উঠবে। আগে পাগ-মার্ক বা পায়ের ছাপ পদ্ধতিতে বাঘ গণনা করা হলেও, সেই পদ্ধতিতে ভুলভ্রান্তি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হতো। ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে এখন প্রায় সব দেশ অনুসরণ করে থাকে।

আমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘একজন মানুষের আঙুলের ছাপের সঙ্গে আরেকজনের ছাপের যেমন মিল নেই, তেমনি একটি বাঘের ডোরাকাটার সঙ্গে আরেকটি বাঘের মিল থাকে না। ক্যামেরায় তোলা এসব ছবি সংগ্রহের পর কম্পিউটারের সফটওয়্যারে প্রতিটি বাঘ আলাদা করা যাবে। তখন ছবি ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই জানা যাবে সুন্দরবনে ঠিক কতগুলো বাঘ রয়েছে। এই কাজে বাংলাদেশ ও ভারতের বাঘ বিশেষজ্ঞরাও সহায়তা করছেন।’

ক্যামোফ্লেজ রং করা ক্যামেরাগুলো সর্বক্ষণ সচল থাকে। সামনে কোনো নড়াচড়া ধরা পড়লেই ক্যামেরাটি ছবি তোলে। কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানান, এর আগে সাতক্ষীরা ব্লকের ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন নমুনা হিসেবে সুন্দরবনের দুটি ব্লকে ৪৭৮ বর্গকিলোমিটার জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছে। এসব ব্লকে আবার প্রতি দুই কিলোমিটার জায়গা নিয়ে ঠিক করা হয়েছে একেকটি গ্রিড, যেখানে দুটি করে ক্যামেরা থাকবে।

তিনি বলছেন, ক্যামেরায় একেকটি বাঘের হয়তো শতাধিক ছবি উঠতে পারে। সব মিলিয়ে হয়তো কয়েক হাজার ছবি উঠবে। এসব ছবি বিচার বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যাটি বের করা হবে।

আড়াই মাস ধরে ক্যামেরায় ছবি সংগ্রহের এই কর্মকা- চলবে। এ জন্য সেখানে বন বিভাগের ৬০ জন কর্মকর্তা কাজ শুরু করেছেন।

কীভাবে কাজ করে ক্যামেরা ট্র্যাপিং? কর্মকর্তারা বনের গভীরে গিয়ে এমন সব জায়গায় ক্যামেরা স্থাপন করবেন, যেখান দিয়ে বাঘ চলাচলের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় বারো ফুটের মতো বৃত্তাকার জায়গায় গাছপালা কেটে পরিষ্কার করে দুপাশে দুটি খুঁটি পোতা হয়। সেই খুঁটিতে বাঘের আনুমানিক উচ্চতায় ক্যামেরা বসানো হয়। বৃত্তের চারপাশে থাকে জাল দিয়ে ঘেরা। বৃত্তটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, কোনো বাঘ বা কোনো প্রাণী প্রবেশ করলেই সেটি ক্যামেরার সামনে পড়বে।

ক্যামেরার সামনে বাঘকে আকষর্ণ করার জন্য বৃত্তের মতো খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে সেখানে একটি ছোট্ট পাত্রে পানি রাখা হয়। আর একটি কাঠির মাথায় কাপড়ে বেধে রাখা হয় স্টিংক বম্বের দ্রবণ। এই দ্রবণ থেকে অতিশয় দুর্গন্ধ বের হয়, অনেকটা পচা মাংসের মতো। এই দুর্গন্ধই হলো ফাঁদের টোপ। বাঘ যেহেতু অতিশয় উৎসুক প্রাণী, সেহেতু এই দুর্গন্ধই তাকে ক্যামেরার সামনে টেনে আনবে। একজন বন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন।

ক্যামেরাগুলো সারাক্ষণই চালু থাকে এবং লেন্সের সামনে কোনো নড়াচড়া ধরা পড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি তোলে। প্রতি দশ মিনিটে একটি স্থিরচিত্র ও দশ সেকেন্ডের ভিডিও ধারণ করে ক্যামেরাটি। রাতের বেলায় ক্যামেরাটি ব্যবহার করে ব্ল্যাক ফ্ল্যাশ, খালি চোখে এই ফ্ল্যাশের আলো দেখা যাবে না। ছবিগুলো একটি মেমোরি কার্ডে রক্ষিত হয়। বনকর্মীরা পাঁচ দিন পরপর এসব মেমোরি কার্ড থেকে ছবিগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসবেন। এ সময় তারা ব্যাটারি পাল্টে দেওয়া বা ক্যামেরা মেরামতের দরকার হলে সেসব কাজ করবেন। কর্মকর্তারা আশা করছেন, বড় কোনো অঘটন না হলে এপ্রিল বা মে মাসের মধ্যে সব তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এরপর পুরো বছর ধরে এগুলোর বিশ্লেষণ চলবে। সামনের বছর জানুয়ারি মাস নাগাদ এই গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী বলছেন, ‘সাধারণত একেকটি বাঘ এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় কমই যায়। একেকটি বাঘের এলাকা কমবেশি ২০ কিলোমিটার। অনেক সময় বয়সের কারণে হয়তো তারা এলাকা থেকে অন্য কোথাও যায় বা অল্পবয়সী বাঘ বয়স্কদের উচ্ছেদ করে। তা নাহলে সাধারণত একটি বাঘ আরেকটি এলাকায় প্রবেশ করে না। তার পরেও কোনো বাঘ এলাকা পাল্টালে সফটওয়্যারেই ধরা পড়ে যাবে।’

কিন্তু দুই দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ ও সুন্দরবনের বাঘ কি এই শুমারিতে আলাদা করা যাবে? চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের মধ্যে রায়মঙ্গল নামের একটি বড় নদী আছে, যা দুই দেশের সীমান্ত হিসেবে কাজ করে। বাঘ সাধারণত এক কিলোমিটার বা তার কম প্রস্থের নদী পারাপার করে। এত বড় নদী পারাপার করার উদাহরণ কম। এই নদী পারাপারের একটি ঘটনার কথাই আমরা জানি যে, একবার ভারতের একটি বাঘ পার হয়ে বাংলাদেশে এসেছিল।’ তিনি জানান, খুব তাড়াতাড়ি ভারতের অংশেও বাঘশুমারি শুরু হবে বলে তারা জানতে পেরেছেন। হরিণ নিয়েও একটি শুমারি করেছে বাংলাদেশের বন কর্মকর্তারা, সেসব তথ্য এখনো বিশ্লেষণ চলছে।

সুন্দরবন বিভাগের বরাদ্দ দিয়ে আমাদের বাগেরহাট প্রতিনিধি জানায়, বাঘ গণনা বিষয়ে প্রশিক্ষিত হতে বন বিভাগের ৪জন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ১৫ জানুয়ারী থেকে ভারতে ৫দিন হাতে কলমে প্রশিক্ষন গ্রহন করেছেন। এর আগে ২০১০ সালে বন বিভাগ ও ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ যৌথ ভাবে সুন্দরবনের খালে বাঘের বিচরণ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ওই জরিপ চালায়। সর্বশেষ সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিপ-২০১৫-এর ফলাফল অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। এর আগে জরিপে সুন্দরবনে ১৯৮২ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৫৩টি, ২০০৪ সালে ছিল ৪৪০টি।এবার সুন্দরবনকে শরণখোলা, চাঁদপাই ও খুলনা রেঞ্জেকে ৩ ব্লকে ভাগ করে বাঘ গণনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাঘ গণনা করা হয়েছে। এখন খুলনা ও বাগেরহাটের ৩টি রেঞ্জে একযোগে বাঘ গণনা করা হচ্ছে। বন কর্মকর্তারা বলেন, এই সময়ের মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বাঘ খুলনা ও বাগেরহাটের ৩টি রেঞ্জের ঢুকে পড়লেও সহজে তা’ চিহ্নিত করা যাবে। ক্যামেরায় ছবি তুলে ও তার গতিবিধির অন্য তথ্য-প্রমাণ ব্যাখ্যা করে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভূটানে গতকাল থেকে এক যোগে শুরু হয়েছে বাঘ গণনা। ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হওয়ার কারনে এই ম্যানগ্রোভ বনের বাংলাদেশ ও ভারত অংশেও এক যোগে চলবে বাঘ গণনার কাজ।

"