নিষিদ্ধ হরমোন ব্যবহারে আম বাগানের সর্বনাশ

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

অধিক লোভে প্রকৃতিকে দোহন করে প্রচুর মুনাফা লুটে নেওয়া যায়, কিন্তু এর জন্য যে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে, সেদিকে খেয়াল নেই ব্যবসায়ীদের। চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত ফলনের লোভে আমগাছে ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করছে কালটার নামের এক ধরনের হরমোন। আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমগাছে নিষিদ্ধ কালটারের অপরিকল্পিত ব্যবহার ঠেকানো যাচ্ছে না কোনো মতেই। মাত্রাতিরিক্ত কালটার ব্যবহারের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম। এটাকে আমের জন্য অশনিসঙ্কেত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে কালটারের ব্যবহারের বৈধতা থাকলে এর পরিমিত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

এই হরমোন ব্যবহারে অফ সিজনেও গাছে মুকুল ধরছে বেশি, ফলনও হবে বেশি। কিন্তু কয়েক বছর পরই সেই গাছটি মারা যাবে। এভাবে বেশি লোভের কারণে আমগাছ শূন্য হয়ে যেতে পারে আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ঘটনাটি যেন ঈশপের গল্পের সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মৃত্যুর মতো। তাৎক্ষণিক লাভ ছাড়া কিছুই দেখছেন না তারা। এমন ভয়াবহ পরিণতির কথা বলছেন উদ্যানবিদরা। সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে কালটার বিক্রি বা ব্যবহারের অনুমোদন নেই। তাই অনেকটা গোপনেই ব্যবহার চলছে। ভারতের সিনজেনটা কোম্পানির কালটার ব্যবহার হচ্ছে জেলার প্রায় প্রতিটি আমবাগানে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হামিম রেজা জানান, বাগান মালিকদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা আমবাগান কিনে নেন। এরপর বেশি ফলনের আশায় মাত্রাতিরিক্ত হারে প্রয়োগ করে কালটার। কালটার প্রয়োগ করার পর যেভাবে গাছের যতœ নেয়া উচিত তেমন যতœ নেয়া হয় না। এতে গাছ দ্রুতই মরে যাচ্ছে। তিনি আরো জানান, বিভিন্ন দেশে কালটার ব্যবহারের বৈধতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে যেহেতু কালটার ব্যবহারের বৈধতা নেই, তাই গোপনে কালটার ব্যবহার করা হয়। কালটার ব্যবহার বৈধ করে দিলে এর অপব্যবহার কমবে বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, এরই মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঘুরে গেছেন। তাদের কাছে কালটার ব্যবহার বৈধ করার সুপারিশ করেছেন অনেকেই। চাষিরা জানান, কালটার এক ধরনের তরল পদার্থ। যা আমগাছের গোড়ায় দিতে হয়। আমের মৌসুম শুরুর আগেই গাছের গোড়া খুঁড়ে সেখানে গুচ্ছভাবেই দেওয়া হয় কালটার। কালটার ব্যবহার করা গাছে নতুন পাতা গজায় না। বরং অতিরিক্ত মুকুল দেখা দেয়। ফলনও হয় অতিরিক্ত। শিবগঞ্জ উপজেলার বাগানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, গত বছরও যেসব গাছে মুকুল এসেছিল এবারও সেসব গাছে কচিপাতা দেখা যাওয়া কথা থাকলেও সেখানে ফের দেখা যাচ্ছে মুকুল। নিয়ম অনুযায়ী এক বছর গাছে মুকুল এলে পরের বছর কচিপাতা দেখা যায়। অর্থাৎ এক বছর অন সিজন, পরের বছর অফ সিজন। অন সিজনেও কালটার ব্যবহারে গাছে ক্ষতি হয়। ব্যবসায়ীরা এসব নিয়মনীতি কিছুই মানছেন না। চাষিরা জানান, প্রায় এক মাস আগে থেকেই ব্যবহার শুরু হয়েছে কালটারের।

চাষিরা বলছেন, ভারত থেকেই চোরাইপথে আসছে কালটার। এসব চোরাচালানিদের খুঁজে খুঁজে যোগাযোগ করেন আম ব্যবসায়ীরা। কালটার পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। চাওয়া মাত্রই পাওয়া যাচ্ছে। নিষিদ্ধ কালটার ব্যবহার করতে গিয়েও এখন পর্যন্ত কেউ তাদের বাধা দেয়নি।

জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার কারণে হাত বাড়ালেই মিলছে এই নিষিদ্ধ বস্তুটি। ভারতীয় চোরাচালানিরা কাঁটাতারের বেড়ার কাছে এসে দিয়ে যায় কালটার। কাঁটাতারের ওপার থেকে চালান হয় কালটারের ব্যাগ। এপার থেকে কুড়িয়ে নেন দেশীয় চোরাচালানিরা।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তৌহিদ হোসেন জানান, দেশে অনুমোদন না থাকায় অত্যন্ত গোপনে গাছে দেওয়া হচ্ছে কালটার। তারা বিভিন্ন এলাকার বাগানে বাগানে ঘুরে কালটার ব্যবহারের নমুনা পেয়েছেন। কৃষি বিভাগ চেষ্টা করেও কালটার ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে পারছে না চাষিদের। তবে গবেষকরা বলছেন, আম গাছে কালটার ব্যবহার করা ক্ষতিকর কিছু নয়। তবে মাত্রা অবশ্যই পরিমিত হতে হবে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাত্রাতিরিক্ত হারে প্রয়োগ করা হচ্ছে কালটার। এতে দুই-তিন বছর ভালো ফলন দেয়ার পর গাছ মরে যাচ্ছে।

"