বিবিসির প্রতিবেদন

ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশের গোপন মৈত্রী!

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের এক গোপন মৈত্রী গড়ে উঠছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার আলোকে বিশ্লেষকরা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করতে বেশ কিছু মধ্যপন্থি সুন্নি আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠছে। এ নিয়ে স্পষ্টভাবে সম্প্রতি রিপোর্ট করেছে মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস।

‘গোপন আঁতাত’ : কায়রোর সম্মতি নিয়ে মিসরের ভেতরে বিমান হামলা চালাল ইসরায়েল’ এই শিরোনামে রিপোর্টটি লিখেছেন ডেভিড ডি ফিটজপ্যাট্রিক। এতে তিনি ‘বিস্ময়কর এবং অতিশয় গোপন এক সামরিক সম্পর্কের’ খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন। তিনি লিখছেন, গত দু বছরে ইসরায়েলের অচিহ্নিত ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং জেট বিমানগুলো শতাধিক হামলা চালিয়েছে মিসরের সিনাই এলাকাতে। কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে, এক সপ্তাহেই একাধিক বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং এগুলো চালানো হচ্ছে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসির সম্মতি নিয়েই। এসব হামলা চালানো হচ্ছে সিনাইতে সক্রিয় ইসলামপন্থি বিদ্রোহীদের ওপর।

মিসরীয় বাহিনীও এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, সবশেষ অভিযানে ১৬ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।

মিসরের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তি চুক্তি রয়েছে ১৯৭৯ থেকেই, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনোরকম সহযোগিতার কথা খুব কমই স্বীকার করা হয়, বিমান হামলার তো বহু দূরের কথা। ডেভিড ফিটজপ্যাট্রিকের রিপোর্টের মূল কথা হলো, সিনাইয়ের ইসলামপন্থি বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে মিসরীয় বাহিনী এবং এ জন্য তারা ইসরায়েলের সাহায্য চেয়েছে। সিনাইকে জঙ্গি-নিয়ন্ত্রণমুক্ত করাটা দু’তরফের জন্যই লাভজনকÑ কারণ এতে ওই এলাকায় মিসরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসবেÑ আর ইসরায়েলেরও সীমান্ত নিরাপদ হবে।

বিবিসির বিশ্লেষক জোনাথন মার্কাস লিখছেন, নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টটি বের হওয়ার পর মিসরের ভাষ্যকাররা অবশ্য একে ‘ফেইক নিউজ’ এবং ‘অপেশাদার সাংবাদিকতা, বলে আখ্যায়িত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মিসরের সামরিক মুখপাত্রও ইসরায়েলি সহযোগিতার কথা অস্বীকার করেছেন। এটা বোধগম্য যে, ব্যাপারটা সত্যি হলে তা মিসরের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর ব্যাপার হবে। তবে এখন যদি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে একে দেখা হয় তাহলে দেখা যায় এগুলোর সঙ্গে আরব-ইসরায়েলি গোপন সহযোগিতার এই খবরটা বেশ মিলে যাচ্ছে।

ইরানের উত্থান, উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পুরো অঞ্চল জুড়ে দেশটির প্রভাব বৃদ্ধি এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিশেষ করে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে সৌদি আরব, মিসর এবং জর্ডন। জোনাথন মার্কাস লিখছেন, এ পরিস্থিতির চাপে মধ্যপন্থি সুন্নি আরব কিছু দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। কূটনৈতিক ইঙ্গিত এবং কিছু ব্রিফিং থেকে এর আভাস পাওয়া যায়। এর কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছেÑ যার কোনো কোনোটি বেশ স্পষ্ট। কিছু দিন আগে সৌদি-ভিত্তিক মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের মহাসচিব ড. মোহাম্মদ আল-ইসা ওয়াশিংটনের হলোকস্ট মিউজিয়ামে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ইহুদি নিধনযজ্ঞের স্মারক জাদুঘর) এক খোলা চিঠি দিয়েছেন। তিনি ইহুদি নিধনযজ্ঞের শিকারদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং যারা ‘হলোকস্ট আদৌ ঘটেনি’ বলে একে অস্বীকার করেÑ তাদের নিন্দা করেছেন। কোনো আরব নেতার মুখ থেকে এরকম একটি বিবৃতি আসা খুবই বিস্ময়কর।

আরব বিশ্বে এমন অনেক ঘটনা ঘটছেÑ যা জোড়া দিলে পরিবর্তনটা আরো স্পষ্ট হয়। সিরিয়ায় এখন যে শুধু মার্কিন, রুশ, তুর্কি ও ইরানি সৈন্যরাই তৎপরতা চালাচ্ছে তা নয়, তৎপর রয়েছে ইসরায়েলও। ইসরায়েল স্বীকার করেছে যে, ২০১১ সাল থেকে তারা সিরিয়ার ভেতরে অন্তত ১০০টি গোপন বিমান হামলা চালিয়েছে। সবশেষ বিবৃতিতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বলছে, তারা ‘ইরান-সংশ্লিষ্ট’ লক্ষ্যবস্তুর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এখন প্রকাশ্যে ব্রিফিংগুলোতেও মধ্যপন্থি সুন্নি দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নত হওয়ার কথা তুলে ধরছেন।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কয়েক মাস আগেই লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ইরানের আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য’ তারা মধ্যপন্থি সুন্নি দেশগুলোর সঙ্গে একটা ‘কার্যকর জোট’ গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন। তার মতে, আরব দেশগুলোর ইসরায়েলের প্রতি মনোভাবও ‘নরম’ হচ্ছে। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টটি বলেছে, নেতানিয়াহু যাই বলুন, বৃহত্তর আরব সমাজের জনগণ ও বুদ্ধিজীবী কারো মধ্যেই এখনো ইসরায়েলের প্রতি মনোভাব নরম হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই।

"