অনুবাদ তর্ক ও অনুবাদককে স্মরণ করা না-করা

প্রকাশ | ৩০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

অলাত এহ্সান

পাঠের প্রথম বেলায় ‘রিপভ্যান উইংকল’ নামক একটি অনুবাদ গ্রন্থ আমিও পড়েছিলাম, নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের মার্কেটের ফুটপাত থেকে সংগ্রহ করে। আমার তখন পাঠের সময়, যাকে বলে গো-গ্রাস। তখন তা পড়েছি মাত্র, বলা যায়। ‘রিপভ্যান উইংকল’ পাঠের আনন্দটা শুধু নিয়েছি। কিন্তু পাঠের যে দায়, অনেকের মতো, আমিও তা বোধ করিনি। লেখককে (এখানে অনুবাদক) যে নার্সিংটুকু দেওয়া দরকার, অর্থাৎ লেখক সম্পর্কে, তার অপরাপর গ্রন্থ সম্পর্কে জানা, অন্যকে জানানো; ‘পারলে’ লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ, আলাপ ইত্যাদি-যার ফলে লেখক উৎসাহ বোধ করেন-তা কিছুই করিনি। অনুবাদ পাঠের ঝুলিটা একটু সমৃদ্ধ হলে, বাজারে প্রচলিত অনুবাদ নামের দস্তাবেজ পাঠের প্রতি ভক্তি উঠে যেতে লাগলে, মনে পড়ে-‘রিপভ্যান উইংকল’ নামে একটা সু-অনুবাদ পাঠ করে ছিলাম। নিজেও অনুবাদে হাত মকশো করতে গিয়ে রিপভ্যানের মতো বহু বছরের ঘুম ভাঙল। বুঝলাম, এ মোটেই বালখেল্য নয়, বেশ কঠিন কাজ। আর অনুবাদকে ‘অনুবাদ সাহিত্য’ হয়ে ওঠা তো আরো দুরূহ ব্যাপার। তত দিনে ‘রিপভ্যান উইংকল’ বইটির মতো লেখকের নামও আমার মাথা থেকে বেহাত হয়ে গেছে। ২০১৪ সালের ১৬ জুন বিডিনিউজ-এ দেশের আরেকজন অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও কবি রাজু আলাউদ্দিনের একটি লেখা থেকে মনে পড়ল, আমার বিস্মৃত হয়ে যাওয়া লেখকটি নাম ফখরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন একাধারে অনুবাদক, কথাসাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক ও শিশুসাহিত্যিক। ফখরুজ্জামান চৌধুরীর নামটি যখন খুঁজে পেলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে; জানলাম, তার ঠিক দুই দিন আগে, ১২ জুন (২০১৪) তার মহাপ্রয়াণ ঘটেছে। বেশ দুঃখজনক, বুকের ভেতর খচ খচ করতে লাগল। তবে একটি বিষয় ভালো লাগল, ফখরুজ্জামান চৌধুরীকে কেউ কেউ আমাদের সমাজ থেকে সম্পূর্ণ গুম হয়ে যেতে দেননি। প্রশ্ন থেকে যায়, অনুবাদককে ভুলে যাওয়ার যে চিন্তা, যে উদ্বেগ সব অনুবাদকের ভেতরই বিদ্যমান, আমরা ভবিষ্যতেও তা এড়াতে পারব কি?

ফখরুজ্জামান চৌধুরী যেসব পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন, তার মধ্য সবচেয়ে উচ্চকিত-অনুবাদক। অনুবাদক ব্যতীত অন্য কিছু হলে কেউ সাহিত্য পরিসরে স্থায়ী হবেন, তা বলতে পারি না যদিও; তবু আমার মনে হয়, এই অনুবাদক হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণেই তিনি দ্রুত বিস্মৃত হয়েছেন। তার কারণ, আমাদের দেশে অনুবাদ এখনো সাহিত্যের মর্যাদা পায়নি, কিংবা অনুবাদ নিজেই সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি। অস্বীকার করার সুযোগ নেই, আমাদের দেশে এখন অজস্র অনুবাদ হচ্ছে। অনুবাদকের সংখ্যাও কম নয়। হোর্হে লুইস বোর্হেস তার সাহিত্যের অনুবাদক নর্মান টমাস ডি. যোভান্নি সম্পর্কে বলতে গিয়ে খানিকটা উচ্ছ্বসিত হয়েই বলেছেন-‘বিশ্বস্ত বিশ্বাস ঘাতক’। আমাদের দেশের অনুবাদকদের অধিকাংশের মধ্যে বোধ হয় সেই ‘বিশ্বস্ততা’ নেই। বিশ্বস্ততা না থাকার ফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ফলে তারা পাঠকের কাছে ‘বিশ্বাস ঘাতক’ হিসেবেই চিহ্নিত ও উপেক্ষিত হন। সাহিত্যের স্বীকৃতি পান না।

প্রতি বছর একুশে বইমেলায় তো কত-শত অনুবাদ গ্রন্থ দেখি। বইমেলা এলেই অনুবাদক পাড়ায় তড়িঘড়ি, ফরমায়েসি অনুবাদের হিড়িক পড়ে যায়। বিশেষ করে প্রতিবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার, ম্যান অব বুকার পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশকরা পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক-লেখিকাদের গ্রন্থ অনুবাদের উৎসাহী হয়ে পড়েন। এতে অনুবাদের কী মান দাঁড়ায়, তা পাঠক মাত্রই বোঝেন। লেখক সম্মানী না দেওয়ার যে কুখ্যাতি আমাদের দেশের প্রকাশকরা সগৌরবে জুটিয়েছেন, অনুবাদককে আরেকটু বেশি অবহেলা ভরে বঞ্চিত করতেই তারা তৎপর। অনেক সময় দেখা যায় কলকাতার কোনো অনুবাদকের বই প্রায় হুবহু নকল করে নিজের নামে ছাপিয়ে দিয়েছেন। এ জন্য দু-একজনের (তাকে নিশ্চই অনুবাদক বলা যায় না), জরিমানা হওয়ার কথাও জানা যায়। এদের কারণে প্রকৃত অনুবাদক হারান তার প্রাপ্য সম্মান, বিস্মৃত হয়ে যান সহজেই। কেউ অনুবাদ সাধনায় নিয়োজিত হতে চান না। সব ‘কপি-পেস্ট’ বা ‘গুগল ট্রান্সসেøট’-এর ধান্দায় থাকেন। কিন্তু অনুবাদ তো শুধু ভাষান্তর নয়, একটা ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতির গভীর থেকে তুলে আনতে হয় সাহিত্য। গভীর পঠন-পাঠন থাকতে হয় সে বিষয়ে। তবেই তো অনুবাদ। একজন সাহিত্যিকের লেখালেখিকে প্রধান করে অনুবাদ-এগুলো আরো ভালো হয়। তা আর করছে কয়জন? দু-চারজন যারা আছেন, তারা ততটা প্রতিভাত হন না। তাই বলে, ফখরুজ্জামান চৌধুরীকে পাঠের দায় ও সাহিত্যে তার অবদান আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলেছেন, সবাই বরফ নিয়ে সাহিত্য করেন, আর আমি বরফ ছুঁয়ে যে অনুভূতি হয়-তা নিয়ে লিখি। অনুবাদ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই এই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে অনুভূতির কি কোনো অনুবাদ সম্ভব? মার্কেস লিখেছেন নিজস্ব ভাবাবহে। তার সেই ভাবের কি অনুবাদ হয়? সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হলো এই, আসলে কোনো ভাষাই কি মানুষের অনুভূতির সবটুকু বহন করতে পেরেছে? পারেনি। যে কারণে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশের জন্য আরো অনেক মাধ্যমের বিকাশ ঘটিয়েছেন। ভাষার এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েও বলা যায়, বিদেশি সাহিত্যকে আহরণ করার ক্ষেত্রে অনুবাদের কি কোনো গণবিকল্প আছে? শুধু সাহিত্য নয়, একটি জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে অনুবাদ অত্যন্ত জরুরি। যে কারণে দেখা যায়, রেনেসাঁ উত্তর সময় আরবের আকর গ্রন্থগুলো ইউরোপীয় প্রায় সব ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। এটাই তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশাল ভিত্তি করে দিয়েছে। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়েনে (বর্তমান রাশিয়া) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর, সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ও গবেষণাগুলো সোভিয়েত ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে। সেখানে নানা বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও, এটা অস্বীকার করা যায়, তারা অত্যাবশ্যকীয় একটি কাজই করছেন। সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে জনগণের জন্য অনুবাদগুলোকে সহজলভ্যও করা হয়েছে। আবার তারা নিজেদের সাহিত্য বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিয়েছে। অস্বীকার করার সুযোগ আছে কি, ষাট ও সত্তরের দশকে সোভিয়েত সাহিত্যের অনুবাদ পাঠ আমাদের দেশের সাহিত্য মানসে প্রভাব ফেলেনি?

ভাষার সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ এসেই গেল। এ নিয়ে কথা বলা যায়। শব্দ-ভাষায় যারা কথা বলতে পারেন না, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী, তাদের জন্য শারীরিক বা ইশারা ভাষা আবিষ্কার করা হয়েছে। অন্ধদের জন্য করা হয়েছে ব্রেইলি পদ্ধতি। এসবই সমাজের সঙ্গে সংযোগ তৈরি প্রচেষ্টা। অনুবাদও একটা ভাষিক প্রচেষ্টা, যা অন্য ভাষাভাষীকে আরেকটি ভাষার সাহিত্য পাঠের সুযোগ করে দেয় তার নিজের ভাষায়। অনুবাদ নিয়ে প্রায়স যে তর্ক হয়, তা স্তানিসøাভস্কি ও ব্রেটল্ট ব্রেখটের সঙ্গে আইরিশ নাট্যকার ইউজিন আইনেস্কোর সেই নাট্যতত্ত্বের তর্কের মতো : অভিনয়ের সময় দর্শককে বুঝতেই দেওয়া যাবে না অভিনয়, বোঝাতে হবে এটা বাস্তব; এর বিপরীতে তত্ত্ব যেমন অভিনয়ের সময় বোঝাতে হয়, এটা সাচ্চা অভিনয়, জীবন নয়। অনুবাদের ক্ষেত্রে এটা মোকাবিলা করতে হয় : অনুবাদ পড়ে যেন মনেই না হয় কোনো অনুবাদ পড়ছি, মনে হয় মূল সাহিত্যই পড়ছি; অন্যদিকে কথা হলো, এটা যেন ভালো অনুবাদ হয়। অনুবাদের এই মূল হয়ে ওঠা-এটাকেই দুরূহ করে দিয়েছে রোলাঁ বার্থের সেই বিখ্যাত কথা, ‘দ্য অথর ইজ ডেড’। অর্থাৎ লেখার মধ্যে লেখক লীন হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ লেখকের অবস্থান টেক্সটটি থেকে নির্ণয় করা অনুবাদকের পক্ষে পুরোপুরি সম্ভব হয় না। এটা কতজনই বা পেরেছেন। অনুবাদ তর্কের বাইরে অনুবাদককে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অস্বীকার করার সুযোগ নেই, অনুবাদ নিজেই একটা মূল, কিন্তু সেই মূল নয়, যা থেকে এটা অনুবাদ করা হয়েছে। দুনিয়ার কোনো কিছুই কি শতভাগ মিল হতে পারে, যখন জিনিসই দুটি? সেই দার্শনিক তর্ক : এক নদী দুবার গোসল করা যায় না, এ তো সত্য। কারণ নদীমাত্রই সব সময় বহমান, জল সব সময়ই স্থান পরিবর্তন করে। তাহলে সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটা অনুবাদ কি করে তার উৎস সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর মেলা ভার। এটা এক ধরনের চিন্তার দীনতা, বা বৈকল্যও বলা যায়।

একজন লেখকও যখন একটা লেখা দ্বিতীয়বার লেখতে যান, তা হুবহু থাকে না, লেখার চিন্তাও এক থাকে না। অনুবাদের ক্ষেত্রে এই দিকটা ছাড়াও ভাষাগত নান্দনিকতার দিকটি সব সময়ই বিশাল চ্যালেঞ্জ। যেমন ধরা যাক জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদারের কবিতা কিংবা সুকুমার রায়ের ছড়া, শিবরাম চক্রবর্তীর গদ্য কিংবা শহিদুল জহিরের গল্প অনুবাদ করতে যান, তিনি কী করে মূল হয়ে উঠবেন? এদের সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রে খুব তৃপ্ত হওয়া কখনো কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আসলে যে লেখা তার নয়, মানুষ কি করে সেই লেখার মূল হয়ে উঠবে? বরং অনুবাদে যেটা সাহিত্যের আরেকটা পাঠ হয়ে উঠছে, তাকে অবদমিত করার কী আছে! অনুবাদককে সব সময়ই এই চাপ নিতে হয়, অন্যরাও এই লেখাটা পড়–ন এবং তাকে যথাযথ সাহায্য করতেই তিনি উদ্যত হয়েছেন। এতে বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করা যায় মাত্র, হানি হওয়ার ঝুঁকি একেবারে যে থাকে না তা নয়।

অনুবাদকে ‘মৌলিক সাহিত্য’ নয় বলে অবজ্ঞা করার একটা প্রয়াস আমাদের দেশে বিদ্যমান। এটা এক ধরনের জাত্যাভিমান। সামন্তীয় মানসিকতা (সুশীলভাবে : সংরক্ষণবাদী মানসিকতা)। হাস্যকর মনে হয় যখন এই বিশ্বায়নের যুগেও মানুষ ধারণা পোশন করেন, বিশেষ করে যখন লেখকরা এই মানসিকতা বহন করেন। নিজেদের আত্মশ্লাঘা বা আত্মাভিমান সরিয়ে রাখলে এ কথা মনে হয় কারোরই অস্বীকার করার কঠিন নয়, সমসাময়িক সাহিত্য বলতে এমন কিছু হচ্ছে না, যা নিয়ে বিশ্বে তো নয়ই, নিজেদের কাছে তৃপ্ত হওয়া যায়। কেউ কেউ একে হয়তো ‘খাদের কিনারের সাহিত্য’ বলতে ছাড়বেন না। তাহলে ‘মৌলিক লেখা নয়’ বলে অনুবাদকে সরিয়ে রাখার মানে কী? মানে হলো, এই ‘মৌলিক নয়’, ‘মৌলিক নয়’ বলে অনুবাদকে সরিয়ে রেখে নিজেদের যা-তা নিয়ে উল্লসিত হওয়া আর পাঠককে তা গেলান। যেমন : বিশ্বের কোথাও বাণিজ্য নেই এমন দুর্বল চলচ্চিত্রের নাম এ দেশে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র। কিন্তু আখেরে তা যে কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না, তা অস্বীকার করা যায় না। বরং ‘খাদের কিনারের’ সাহিত্যকে টেনে তোলার জন্যই প্রচুর পরিমাণে অনুবাদ প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশে সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক-বৈষ্যয়িক মুক্তি ঘটেছে এভাবে। জাপানে আজকের সাহিত্যের যে উন্মেষ, তাতে অনুবাদের বিশাল ভূমিকা আছে। নিজেদের পুনরোৎপাদন করে নতুন কিছু হচ্ছে না, তা না বোঝার কারণ নেই। অস্বীকার করার সুযোগ নেই, পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞানই অন্যের চিন্তা অনুবাদেরই সৃজনশীল বিকাশ। সেখানে নিজেদের সরিয়ে রাখলে নিজেদের ক্ষতি। সুখের বিষয় হলো, ইতোমধ্যে বিশ্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুবাদ সম্পূর্ণ একটা বিভাগ হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশের জন্যও তা জরুরি।

বাংলা একাডেমি থেকে অনুবাদ সাহিত্যে পুরস্কার দেওয়া হয়। তালিকা ঘেঁটে দেখে যায়, অনুবাদক পুরস্কারকে রাখা হয়েছে শিশু সাহিত্যের বিপরীতে। মানে এক বছর শিশু সাহিত্যে পুরস্কার পাবে তো আরেক বছর অনুবাদে। কি এক শিশুতোষ মানসিকতা! অনুবাদ নিয়ে জাতীয় পর্যায় এর চেয়ে প্রহসন আর কি হতে পারে! এতে করে আমাদের অনুবাদ সাহিত্যে কি অবদান রাখছে, তা এখনো আমাদের কাছে দৃশ্যমান নয়। কিন্তু অনুবাদে এই পুরস্কার যে গুরুত্বপূর্ণ তা অনস্বীকার্য। ফখরুজ্জামান চৌধুরী তাঁর অনুবাদ ও সাহিত্যকর্মের জন্য ২০০৫ সালে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন, এটুকুই তৃপ্তি।

২০০৫ সালে ফখরুজ্জামান চৌধুরীর পুরস্কারপ্রাপ্তি আর মৃত্যু-পরবর্তী স্মরণ না হওয়ার মধ্যে একটা সংযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। আমাদের দুর্ভাগ্য, একজন লেখককে পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়েও দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা না-থাকার ভাবনা ভাবতে হয়। ফখরুজ্জামান চৌধুরী কর্মজীবনে একমাত্র রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভির বড় কর্মকর্তা ছিলেন। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে এই টিভির কর্মকর্তাদের পদও বদলে যায়। আসে সরকার অনুসারী ব্যক্তিরা। ফলে রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল হয়ে ওঠে দলীয় টিভি চ্যানেল। বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রায়ই এই দোষে দুষ্টু হতে দেখা গেছে। তাই ফখরুজ্জামান চৌধুরীর চাকরি জীবন ও সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তির সময় দ্বারা ‘চিহ্নিত’ হয়-তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। যে কারণে কেউ যখন ফখরুজ্জামান চৌধুরীর বিস্মৃত হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার শঙ্কা করেন, তখন তাতে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই আজকের দৈনিকের পাতাগুলো যখন ফখরুজ্জামান চৌধুরীর মৃত্যুকে বেমালুম চেপে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, তাদের অবস্থান কী। কিংবা সাহিত্য পাতার সংকটই বা কোথায়। তাতে দুঃখ করারও কিছু থাকে না। এই জন্য যে, কোনো পত্রিকার সাহিত্যপাতা যদি সাহিত্য ও সাহিত্যিক আবিষ্কার বাদ দিয়ে ‘ঘরানা’ প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে চায়, সেখানে ফখরুজ্জামান চৌধুরী বিস্মৃত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। সেখানে দায় স্বীকার আকাক্সক্ষা বাহুল্য বৈকি।

রাজনৈতিক সংশ্রবের কারণে লেখকের বাদ পড়ার সংকট ফখরুজ্জামান চৌধুরীর একার ক্ষেত্রে নয়। অনেকের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। বিশেষ করে উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশে এই সংকট অনেক বেশি থাকে। যেমন সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে টিভি টকশো ও অনুষ্ঠানমালা থেকে কতগুলো মানুষ একেবারে হারিয়ে যান। যদি তাদের দিন ফিরে, তখনই ফেরবেন। অথচ আমাদের দেশে সুযোগ ছিল, মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে সুসংসহত করার। তা হয়নি। এর ফলে এত বছর পরও স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে দেখি। উপরন্তু এ দেশে বিকৃতপুঁজির বিকাশ ঘটেছে, যা লেখক মানসের ক্ষেত্রে অনেক বড় বাস্তবতা। স্বাধীনতার পর এ দেশে গণমানুষের রাজনীতির বিকাশ ঘটেনি। ঘটলে হয়তো এমন হতো না। এসবের অনুপস্থিতিতে যা বিকাশ ঘটেছে তা হলো, বিদেশি প্রভুদের তোষণ, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও এক দলীয়করণের রাজনীতি। ফলে এ দেশে লেখকের গুণ বিচার হয় না। হয় দল বিচার। যারা দলীয় লেজুরবৃত্তি, রাষ্ট্রীয় প্রলোভন উপেক্ষা করেন, তারা থেকে যান রাষ্ট্রের কাছে অপাঙ্গেয়। যারা দলীয় রাজনীতির সংশ্রবে যান, তারা উপেক্ষিত হন দলীয় সরকারের আমল দ্বারা। যে কারণে অনেক লেখক তার লেখনীর স্বীকৃতি, সামান্য সম্মান, সেই সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচার আশায় রাজনৈতিক দর্শন দৃঢ় করার পরিবর্তে রাজনৈতিক ভোজবাজিতে মত্ত হয়ে পড়েন। বিকিয়ে দেন লেখকি সত্তা। এমন লেখক অনেক আছেন, যারা দলীয় লেজুরবৃত্তি করেই দিন গুজরার করে দিচ্ছেন। লেখকের রাজনৈতিক সংগ্রামের যে দুটি ধারা আছে-রাজনৈতিক সংস্কৃতি কিংবা সাংস্কৃতিক রাজনীতি-তা শক্তপোক্ত হয় না।

আসলে রাজনীতির থেকে লেখাকে তো নয়ই, লেখক বা অনুবাদককেও বিযুক্ত করা যায় না, প্রয়োজন উল্টো। তথাকথিত ‘রাজনীতি বিযুক্ত’ লেখকের লেখার কি হাল তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। রাজনীতিহীনতার রাজনীতিতে আক্রান্ত হয়ে তারা অপরাজনীতিকেই বরং পুষ্ট করছেন। আসলে লেখকের, অনুবাদকের একটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি-চাহিদা লেখাটির মধ্যে অন্তর্লীন না থাকলে, লেখা টানে না, জোলো হয়ে যায়। কয়েকজন অনুবাদক বা লেখক শক্তিশালী রাজনৈতিক স্বার্থের আশ্রয়ে চলে গেলেও ক্ষতি কিছু তেমন হয় না, যদি আরো বহু লেখক-অনুবাদক বিভিন্ন রাজনৈতিক মেরু থেকে নিরন্তর প্রশ্ন তুলতে থাকেন। তখন সরকারি আশ্রয়পুষ্ট লেখক-অনুবাদকটিও আবশ্যিক দ্বান্দ্বিকতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে কাজ করতে বাধ্য হন। এটা এডওয়ার্ড ডব্লিউ. সাঈদ বিবৃত সেই ‘বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা’ শীর্ষক কাজ। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় না। এখানে ‘লেখক’ ও ‘বুদ্ধিজীবী’ আলাদা জাত করে রাখা হয়েছে। তাহলে লেখক কি বুদ্ধিজীবী নয়? এই প্রশ্নটা লেখকদের মধ্যে জারি না থাকায়, লেখকরা নিজেদের সেই ভূমিকা উন্নীত করতে না পারায় আমাদের দেশে লেখক রাজনীতি তেমন ফলপ্রদ হচ্ছে না। তারও একটা কারণ আছে। সত্যি বলতে কী, আমাদের আসলে তেমন কোনো রাজনীতিই নেই! ফলে অনুবাদকরা সাহিত্য বা চিন্তার যে দিগন্তটিকে বিস্তৃত করবেন, সে দিগন্ত দিয়ে আমরা কী করব? বরং আমরা রাজনীতির অভাবে কেবল চুপসে যাচ্ছি, যা লেখার স্বাধীনতাকেও সংকুচিত ও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

বোধ করি, এর কোনোটাতেই ফখরুজ্জামান চৌধুরীর বিশ্বাস ছিল না। ভুলে যাই কেন, ফখরুজ্জামান চৌধুরী সেই বিরলপ্রজ সাহিত্যিক নন, যারা রাষ্ট্রের সেই প্রলভনকে উপেক্ষা করতে পেরেছেন। তবে দলের রাজনীতি করলেই তার কর্মদক্ষতা উবে যায়, তা কিন্তু নয়। তবে দেশে বিদ্যমান রাজনীতি যে উদাত্তভাবে কাউকে স্বীকৃতি দিতে পারে না, তা সত্য। যদি পারত বাংলাদেশে অনুবাদ সাহিত্যের বিকাশের ক্ষেত্রে ফখরুজ্জামান চৌধুরীর যে অবদান, তা সব সময়ই স্বীকৃতি দিত। এই দলবাজি ব্যবস্থা ও চর্চা যত দিন থাকবে, ফখরুজ্জামান চৌধুরীরা বিস্মৃত হয়েই যাবেন। আমাদের দীনতা হলো, তাঁর নিপাট সাহিত্য কৃত্তির জন্য যে সম্মানটুকু প্রাপ্য, আমরা তা দিতে পারিনি। এ লজ্জা প্রতিটি সৎ পাঠকেরই। নিঃসন্দেহে, একজন লেখক এভাবে হারিয়ে যেতে পারেন না। অনুবাদকদের উদ্বেগ এই হারিয়ে যাওয়া নিয়ে। উদ্বেগ আমাদেরও, এমন দীনতা নিয়ে আমরা কি কোনো সৎ সাহিত্য ও সাহিত্যিকের আশা করতে পারি? কৃতজ্ঞতা সেই অনুবাদকদের প্রতি, সাগর জলে ভাসমান তুষার শিলার মতো এমন গুরুতর বিষয়কে জলমগ্ন রেখে অনুবাদের মাধ্যমে তা উসকে দেওয়া জন্য।

অলাত এহ্সান : গল্পকার। প্রবন্ধ ও সমালোচনা লেখেন। একটি দৈনিকে কর্মরত। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : অনভ্যাসের দিনে।

ধষধঃবযধংধহ.স@মসধরষ.পড়স

+৮৮ ০১৭১৪ ৭৮৪ ৩৮৫

"