বাংলা সিনেমার স্বর্ণোজ্জ্বল দিনগুলো

প্রকাশ | ৩০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

এস এম মফিদুল হক

একটা সময় সিনেমা ছিল গ্রাম-বাংলার মানুষের বিনোদনের অন্যতম উৎস। সে সময়ের সিনেমাগুলো মানুষের জীবনে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করত। সামাজিকভাবে সিনেমা ছিল সুস্থ বিনোদনের কেন্দ্র। আলোচনা হতো সেসব সিনেমা নিয়ে। সেদিন এখন আর নেই। সে সময় অর্থাৎ ষাটের দশক থেকে আশির দশক ছিল বাংলা সিনেমার স্বর্ণালি যুগ।

বাংলা সিনেমার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯২৭ সালে এ দেশে (পূর্ববঙ্গ) প্রথম স্বল্প দৈর্ঘ্যরে নির্বাক ছবি ‘সুকুমারি’ নির্মিত হয়। তবে ১৯৩১ সালে মুক্তি পায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক ছবি ‘দ্য লাস্ট কিস’। হিমাদ্রী চৌধুরী ছদ্মনামে বিশিষ্ট সাংবাদিক ওবায়েদ-উল হক ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ সিনেমাটি (১৯৪৬) প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। ছবিটি কলকাতায় নির্মিত হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ বাংলাদেশি মুসলিম পরিচালকের হাতে নির্মিত এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র। ১৯৪৭ সালে উদয়ন চৌধুরী ছদ্মনামে ইসমাইল মোহাম্মদ নির্মাণ করেন ‘মানুষের ভগবান’। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরের বছর সরকারি প্রচারচিত্র নির্মাণের জন্য জনসংযোগ বিভাগের অধীনে চলচ্চিত্র ইউনিট (১৯৫৩) গঠিত হয়। ১৯৫৪ সালে এখান থেকে নাজীর আহমদের পরিচালনায় নির্মিত হয় প্রামাণ্য চিত্র ‘সালামত’। ১৯৫৪ সালে ইকবাল ফিল্মসের ব্যানারে এই ভূখ-ের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কাজ শুরু করেন আবদুল জব্বার খান। ১৯৫৫ সালে নাজীর আহমদের উদ্যোগে ঢাকায় প্রথম ফিল্ম ল্যাবরেটরি এবং স্টুডিও চালু হয়। ১৯৬০ সালে নাজীর আহমদের কাহিনি থেকে ফতেহ লোহানী নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘আসিয়া’। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট আবদুল জব্বার খান পরিচালিত বাংলাদেশের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায়। চট্টগ্রামের পূর্ণিমা সেন নায়িকা এবং পরিচালক নিজেই নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। তারপর থেকে বাংলা সিনেমার পটপরিবর্তন ঘটতে থাকে। একের পর এক যুগান্তকারী ছবি নির্মিত হয়, যা দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু, পরে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি) উত্থাপিত বিলের মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি) প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৫৯ সালে থেকে প্রতি বছর চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। এফডিসি ছাড়াও পপুলার স্টুডিও, বারী স্টুডিও এবং বেঙ্গল স্টুডিও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ভিত্তি স্থাপনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।

বাংলা সিনেমার কালপরিক্রমা

১৯৫৯ সালে মুক্তি পায় বাংলা ছায়াছবি আকাশ আর মাটি, এ দেশ তোমার আমার, মাটির পাহাড়। ১৯৬০ সালে মুক্তি পায় রাজধানীর বুকে, আসিয়া। ১৯৬১ সালে মুক্তি পায় হারানো দিন, যে নদী মরু পথে, কখনো আসেনি, তোমার আমার। ১৯৬২ সালে মুক্তি পায় জোয়ার এলো, নতুন সুর, সোনার কাজল, সূর্যস্নান। ১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় ধারাপাত, কাচের দেয়াল। ১৯৬৪ সালে মুক্তি পায় দুই দিগন্ত, এই তো জীবন, মেঘ ভাঙা রোদ, অনেক দিনের চেনা, রাজা এলো শহরে, সুতরাং, শীত বিকেল। ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায় একালের রূপকথা, গোধূলির প্রেম, জানাজানি, রূপবান। ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় আবার বনবাসে রূপবান, আপন দুলাল, বেহুলা, ডাক বাবু, গুনাই বিবি, কাগজের নৌকা, কার বউ, মহুয়া, রহিম বাদশা ও রূপবান, রাজা সন্ন্যাসী, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, জরিনা সুন্দরী,। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় আগুন নিয়ে খেলা, আলীবাবা, আনোয়ারা, আয়না ও অবশিষ্ট, বালা, চাওয়া পাওয়া, হীরামন, জংলী মেয়ে, জুলেখা, কাঞ্চন মালা, ময়ূরপঙ্খী, নয়নতারা, অভিশাপ, অপরাজেয়। ১৯৬৮ সালে মুক্তি পায় আবীর্ভাব, অরুণ-বরুণ কিরণমালা, এতটুকু আশা, বাল্যবন্ধু, বাঁশরী, ভাগ্যচক্র, চেনা-অচেনা, চম্পাকলি, চোরাবালি, দুই ভাই, কুঁচ বরণ কন্যা, মধুমালা, রাখাল বন্ধু, সখিনা, সংসার, সপ্তডিঙ্গা, সুয়োরানি দুয়োরানি, সাত ভাই চম্পা। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পায় আগন্তুক, আলিঙ্গন, আলোমতি, বেদের মেয়ে, ভানু মতি, জোয়ার ভাটা, মায়ার সংসার, ময়নামতী, মনের মতো বউ, মুক্তি, নাগিনীর প্রেম, নীল আকাশের নিচে, নতুন নামে ডাকো, পদ্মা নদীর মাঝি, পালাবদল, পারুলের সংসার, পাতাল পুরীর রাজকন্যা, প্রতিকার ও স্বর্ণকমল। ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় একই অঙ্গে এত রূপ, বিন্দু থেকে বৃত্ত, বিনিময়, বড় বউ, ছদ্মবেশি, ঢেউয়ের পর ঢেউ, দীপ নেভে নাই, দর্পচূর্ণ, যে আগুনে পুড়ি, জীবন থেকে নেয়া, যোগ বিয়োগ, ক খ গ ঘ ঙ, কাচ কাটা হীরে, কোথায় যেন দেখেছি, কত যে মিনতি, মানুষ অমানুষ, মধুমিলন, অধিকার, পিচ ঢালা পথ, রাজ মুকুট, সূর্য উঠার আগে, স্বরলিপি ও টাকা আনা পাই। ১৯৭১ সালে মুক্তি পায় গাঁয়ের বধূ, নাচের পুতুল, স্মৃতিটুকু থাক ও সুখ-দুঃখ। ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় মানুষের মন, জয় বাংলা, সমাধান, বাহরাম বাদশা, প্রতিশোধ, অশ্রু দিয়ে লেখা, শপথ নিলাম, এরাও মানুষ, নিজেরে হারায়ে খুঁজি, ওরা ১১ জন, লালন ফকির, চৌধুরী বাড়ি, ছন্দ হারিয়ে গেল, রাঙা বউ, অবুঝ মন, অরুণোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী ও রক্তাক্ত বাংলা। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় জীবনতৃষ্ণা, রংবাজ, খেলাঘর, ধীরে বহে মেঘনা, ইয়ে করে বিয়ে, এখানে আকাশ নীল, সতী নারী, পায়ে চলার পথ, তিতাস একটি নদীর নাম, অনির্বাণ, আমার জন্মভূমি, দস্যুরাণী, সেøাগান, অঙ্গীকার, আবার তোরা মানুষ হ, অতিথি, সংগ্রাম, আলোর মিছিল, দূরে থেকে কাছে, শনিবারের চিঠি, মাসুদ রানা, ভুল যখন ভাঙল, পরিচয়, মালকাবানু ও জিঘাংসা। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পায় আকাশ কুসুম, আজো ভুলিনি, আলো তুমি আলেয়া, দুশমন, হারজিৎ, এপার ওপার, লাঠিয়াল, জীবন নিয়ে জুয়া, সুজন সখি ও কেন এমন হয়। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় তাল বেতাল, এক মুঠো ভাত, সেয়ানা, সূর্যকন্যা, কি যে করি, আলোর পথে, রংবেরং, কাজলরেখা, নয়নমণি, গুন্ডা, মেঘের অনেক রং, জীবন মরণ ও জীবন সাথী।

স্বর্ণালি যুগের সিনেমা

এক হিসাব থেকে জানা যায, ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০টির মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। আর ২০০৪ সালের হিসাব মতে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে বছরে গড়ে প্রায় ১০০টির মতো চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। যেকোনো পর্যবেক্ষণেই স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে আশির দশক এবং নব্বই দশকের শেষ অব্দি স্বর্ণালি সময় ছিল বাংলা সিনেমার। মানুষের ঢল নামত সিনেমা হলে। রেকর্ড ভঙ্গ করে অনেক সিনেমা বাংলাদেশে সিনেমার দিক পরিবর্তন করেছে। সে সময়ের সিনেমার নির্মাণশৈলীতে ছিল নান্দনিকতা ও মাধুর্যতা। সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষের রুচি ও মূল্যবোধের চেতনাকে ধারণ করে নির্মিত হতো বাংলা সিনেমা। সিনেমার গান ছিল প্রাণ রসে ভরপুর। সংলাপে ছিল মাধুর্যতা। দৃশ্যায়নে ছিল সুরুচির নান্দনিকতা। প্রতিটি সিনেমা যেন সমাজ জীবন থেকে তুলে নেওয়া একেকটি কাহিনি। সিনেমায় থাকত মেসেজ। যেসব মেসেজ তরুণ প্রাণে শিহরণ জাগাত। উজ্জীবিত করত। প্রেম-ভালোবাসায় প্রকাশিত হতো গভীরতা ও শালীনতার প্রতিচ্ছবি। সামাজিক, রাজনৈতিক সংঘাতের প্রকাশ হতো শিক্ষণীয় কৌশলে। সব মিলিয়ে সেকালের ছবিতে পরিচালক মুন্সীয়ানা দেখাতেন সম্পূর্ণ সামাজিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এ কারণেই তখন মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে দল বেঁধে হলে গিয়ে ছবি দেখতেন।

নব্বই দশকে আমরা যখন সিনেমা পাগল তখন-রাজ্জাক-কবরী, আলমগীর-শাবানার জয়জয়কার। তখন নায়ক-নায়িকার অভাব ছিল না। রহমান, বুলবুল আহমেদ, জাফর ইকবাল, ফারুক, সোহেল রানা, ওয়াসিম, জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, রুবেল থেকে সালমান শাহ্ পর্যন্ত। কেবল নায়ক নয় দুর্দান্ত অভিনয়ে বাংলা সিনেমায় তারা প্রত্যেকেই উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। নায়িকাদের মধ্যে শবনম, সুচন্দা, ববিতা, রোজিনা, চম্পা, অঞ্জু ঘোষ, নুতন, মৌসুমী, শাবনূর প্রর্যন্ত প্রত্যেকেই স্বনামে খ্যাত হয়েছেন অভিনয় মাধুুর্যতায়। এ সময়টায় নায়ক-নায়িকা জুটির টান ছাড়াও সিনেমাপাগলরা হলে ছুটে যেতেন বাংলা সিনেমার দক্ষ কারিগর পরিচালকদের নামে। এমনসব পরিচালক সিনেমা তৈরি করেছেন, যাদের নামেও হলে মানুষের ভিড় বাড়ত। তাদের মধ্যে মনে করা যেতে পারে-ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, আলমগীর কবির, খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্ত, এহতেশাম, চাষী নজরুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন, কাজী হায়াৎ, শিবলী সাদিক, আবদুল্লাহ আল মামুন, শেখ নিয়ামত আলী, মনতাজুর রহমান আকবর, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম, হূমায়ুন আহমেদ, আজিজুর রহমান, শহীদুল ইসলাম খোকন, শিবলী সাদিক, এ জে মিন্টু, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, আলমগীর কুমকুম, নাসির উদ্দিন ইউসুফ প্রমুখ। তবে প্রথিতযশা এমনসব পরিচালকের মধ্যে রাজনৈতিক ছবি নির্মাণের মাধ্যমে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নতুন বাঁক এনেছেন কাজী হায়াৎ। দাঙ্গা থেকে শুরু করে আব্বাজান, আম্মাজান, ইতিহাস পর্যন্ত অনেক ব্যবসা সফল ছবিতে সিনেমাপ্রেমীদের হৃদয় কেড়েছেন। আবার একটু রহস্যময় ও কংফু-কারাতে সংযোজনে বাংলা সিনেমার আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন শহীদুল ইসলাম খোকন। তিনি লড়াকু থেকে শুরু করে যোদ্ধা পর্যন্ত অনেক ছবিতে দর্শক টেনেছেন। বিকল্পধারা নামক একটি ছবি নির্মাণ পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে দর্শকদের ভিন্ন স্বাদ দিয়ে স্বনামে খ্যাত হয়েছেন তারেক মাসুদ। মাটির ময়না ছবির মাধ্যমে তিনি বাংলা সিনেমায় আরেক নতুন বাঁক সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। নব্বই দশকের এসব সিনেমা নির্মাতার নাম শুনেও দর্শকরা হলে গেছেন।

আবার কাহিনি, নায়ক-নায়িকা, পরিচালক ছাড়াও সে সময় খলনায়কদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল দর্শকদের হৃদয়ে। এটিএম শামসুজ্জামান, রাজীব, খলিলসহ অনেক খল অভিনেতা দর্শক মাত করতেন তাদের নিপূর্ণ অভিনয় কারুকাজে। সঙ্গে ছিল হাস্যরসের অভিনেতাদের মনোরঞ্জন। খান জয়নুল, সাইফুদ্দিন, মতি, রবিউল, হাসমত, টেলি সামাদ, দিলদারসহ অনেকের হাস্যরসের অভিনয় দর্শক চিত্তকে পরিপূর্ণতা দিত। বলা প্রয়োজন, ৮০-৯০ দশকে বাংলা সিনেমায় অনেক ক্ষেত্রেই কৌতুকশিল্পীরা ছবির নায়ক-নায়িকার চেয়ে অধিক জনপ্রিয় ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ কৌতুক অভিনেতা দিলদার। এমনসব ঐতিহ্যময় আয়োজনে সমৃদ্ধ ছিল আমাদের বাংলা সিনেমার স্বর্ণালি সেই সময়।

লেখক : চলচ্চিত্রবিষয়ক গবেষক

"