ঘুড়ি হয়ে উড়ি

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

শিকদার নূরুল মোমেন

ঘন কুয়াশার মাঝ দিয়ে বাসটি ছুটে চলছে। বাসে বসা কুয়াশা ডোবা মনে নীরব তনুর কথা ভাবছে। এই হাত ছুঁয়েছে তনুর মুখ, আমি কি এ হাতে আর কোনো দিন সিগ্রেট ধরতে পারি? সুনীল বাবুর কবিতাটি নিজের মতো বানিয়ে মেয়েটির কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে নীরব। সেই সতেরো বছর আগের গল্প...। তনু পাঁচ বছর সহস্র স্বপ্ন দেখিয়েছে। নীরবও তার উড়ন্ত ঘুড়ির নাটাই হয়েছে। সুতোটা কেটে গেল; কেমনে গেল?

তখনকার যুক্তিগুলো এখন নীরবকে হাসিয়ে যায়। কেন হাসায়? সেদিনকার বেকার ছেলেটি তার দয়িতাকে বলেছে, এই হতদরিদ্র জীবনের সঙ্গে জীবন গাঁথলে তোমার অনেক কষ্ট হবে। বৃথা হয়ে যাবে এত-অত সাজানো স্বপ্নছবি। ছেলেটির আফসোস হয়নি; তনু হাত চেপে ধরে বলেনি, তোমার এ জীবনই তো আমার এ জনমের প্রার্থিত জীবন। তার অশ্রুভরা চোখ ছেলেটাকে ভেতরে ভেতরে কাঁদিয়েছে; তবুও তাকে বুকে টেনে নীরব বলেনি, দূর পাগলি এতক্ষণ মজা করছিলাম। তুমি ছাড়া আমি যে শূন্য। নিজের ভেতরের শূন্যতা লুকিয়ে রেখেছে, তনুকে বুঝতে দেয়নি।

নীরবের হাতে-ঠোঁটে আর কখনো সিগ্রেট ওঠেনি। কেন ওঠেনি, এ জীবনে তো কম অসময়-দুঃসময় যায়নি? এক যুগের উদাসী ক্ষণগুলো তনুকে বারবার খুঁজেছে, পায়নি। তনু পেয়ে গেল। সে গতকাল দুপুরে নীরবের এক পোস্টে লাইক দিয়েছে। আটপৌরে জীবনের যোগ-বিয়োগ মেলাতে ব্যস্ত নীরব ভাবে, সে হয়তো অন্তর দিয়ে খুঁজেছে...।

তনুর ফেসবুক মেসেজে অনেক কথা লেখার ইচ্ছে থাকলেও কিছুই লিখে না নীরব। কেবল জানতে চায়, কেমন আছো? ফেসবুকে অনিয়মিত তনু উত্তরে একটা সেলফোন নম্বর পাঠিয়েছে। ওই নম্বরে ফোন দিতেই ওপাশের কণ্ঠটি নাড়িয়ে যায়, এতটা কম্পনের জন্য প্রস্তুত ছিল না নীরব। মেসেজে কিছু না লেখতে অনুরোধ করে বলে, ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড শিহাবের জানা। আমার বর এসব পছন্দ করে না। কথার পিঠে কথা চলে, অনেক কথা হয়। দুজনার মুখোমুখি হওয়ার কথা ওঠে-। নীরবের বলা সময়ে সে সম্মতি দেয়, শিহাব তো দেশে নাই-এখন আসতে পারব। আগামী সকালের দিকে তাকিয়ে আছে নীরবের সময়...।

তনু কিছুই ভাবতে পারছে না, কত বছর পর নীরবের সঙ্গে কথা হলো! নীরবের কণ্ঠ কান থেকে সরছে না। বিতৃষ্ণার জীবনে এমন ফুরফুরে বাতাস! বেঁচে থাকার সার্থকতা অনুভূত হচ্ছে। শিহাবের সঙ্গে একই ছাদের নিচে এতগুলো বছর কেটে গেল কিন্তু দুই মনের দূরত্ব এতটুকু ঘোচেনি। যৌথজীবনের এ পথ চলায় কোনো স্বপ্ন নেই। তনুর চে’ তেরো বছরের বড় শিহাব সংসারে সব সময় কর্তৃত্ব ফলাতে চেয়েছে, চায়। তনুর বলাকা মন সব সময় মেনে নিতে পারেনি, পারে না। নিভৃতে কেঁদেছে, বারবার মনে পড়েছে সহজ সরল গোছের নীরবকে। সে বলত, মন খারাপ হলে তোমার কষ্টগুলো আমাকে একা একা বলবে। আমি তোমার কথা শুনতে পাব। হৃদয়ে হৃদয়ে কথা, এটাই হৃদি কথোপকথন। তনু জীবনের দুর্বিষহ ক্ষণসমূহে মেতে উঠেছে হৃদি কথোপকথনে, যার কষ্ট নিয়ে এত ভেবেছো! কষ্ট হবে বলে যাকে জীবনে জড়াওনি, সেই মেয়েটি কত সুখে আছে-তুমি এসে দেখে যাও। তুমি কী আমার কান্না শুনতে পাচ্ছো? কতবার, কত-শতবার নীরবের সঙ্গে এভাবে কথা বলেছে তার হিসাব নেই। তনু মন খারাপের সব গল্প ভুলে যেতে চায়, এই সুখসময়ের প্রতিটি ক্ষণ তোমার, আমার, আমাদের-। আগামীকাল নীরবের সঙ্গে দেখা হবে, মুক্ত ঘুড়ি হয়ে নীলাকাশে উড়তে থাকে তনুর তনু-মন।

পুরনো দিনের মতো নীরব-তনু মুখোমুখি বসেনি, পাশাপাশি বসে। দুজনের কারো মুখে কথা নেই। অভিমান-অভিযোগহীন নীরব একমনে ভেবে চলছে, এমন কোনো কথা বলা যাবে না, যা তনুর মনে অস্থিরতার জন্ম দেবে, তার সংসারে অশান্তি টেনে আনবে। তনুর চারপাশে এক দুশ্চিন্তাই ঘোরপাক খাচ্ছে, আমি কী কষ্টের গল্পগুলো লুকাতে পারব? নীরবতা ভাঙে নীরব, বলো-তোমার গল্প শুনি...। তনুর প্রত্যুত্তর, আমার আর কী গল্প? তোমারটা বলো-। নীরব সংক্ষেপে উত্তর দেয়, তিনজনের সংসার। বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছে আমাদের সময়। বাবা-ছেলে সারাক্ষণ এলোমেলো করি, তিনা সবকিছু একহাতে সামলায়। তার চোখের কোণ সিক্ত হয়ে ওঠে, নিজেকে দ্রুত সামলে নেয়। নীরব মিথ্যে বলে, সত্যটা সে ইচ্ছে করেই বলে না। গত হওয়া ধ্রুবর মা তিনা ছাড়া যে বাবা-ছেলে বড় একা, শূন্য। ছাউনি ছাড়া এক ঘরের সংসারে তার জীবন কাটছে। সংসারের সুখ স্মৃতিসমূহ বর্তমান করে বলতে থাকে নীরব।

শ্রোতা তনু মুখ খোলে, আমি ভালো নেই। শত চেষ্টা করেও ভালো থাকতে পারিনি। আমার এখন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। তার কথায় বিস্মিত নীরব, কেন এমন কথা বলছো? তুমি এই পৃথিবীতে এত মূল্যহীন নও। তনু তিরস্কারে হাসে, আমার সংসারে আমি বড় ফেলনা, তাই তো চলে গিয়ে বাঁচতে চাইছি। নীরব তনুকে সাহস জোগায়, তুমি কোথাও জয়েন করো। তাতে মনের হতাশা অনেক কমবে। মেয়েটির নিষ্প্রাণ মুখচ্ছবি, চাকরির কথা বললে বাসায় অশান্তি আরো বেড়ে যায়। নীরব নিজের কথায় জোর বাড়ায়, তুমি খুব ভুল করছো। তোমার পায়ের নিচের মাটি শক্ত করতে হবে। তনু নীরবকে থামায়, আমার কথা ছাড়ো। তোমার কথা শুনতে খুব ভালো লাগছে।

নীরব-তনু বারো বছর আগের জীবনে ফিরে যায়। নীরবের মাথায় একটা পরিকল্পনা ঘোরপাক খাচ্ছে। নিজেকে গুছিয়ে ব্যাপারটা তনুকে বলে, তোমাকে এখন থেকেই কিছু কিছু সঞ্চয় করতে হবে। তনুর সোজাসাপ্টা জবাব, বাবার কাছ থেকে পাওয়া ফ্ল্যাটের ভাড়াও এ সংসারে খরচ করতে হয়। আমি কীভাবে সেভ করব? নীরব বোঝায়, আপাতত তোমাকে কিছু করতে হবে না। কালই তোমাকে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেব। প্রস্তাবে রাজি হয় না তনু। নানা যুক্তি দেখায় নীরব, এই সামান্য সঞ্চয় এক দিন তোমার উপকারে আসবে। পীড়াপীড়ির একসময়ে তনুর কণ্ঠে অনুযোগ শোনা যায়, সেদিন তো আমাকে নিয়ে এতটা ভাবোনি। নীরব উত্তর দেয়, সেদিনও ভেবেছি। আমি কী জানতাম, তোমার জীবনটা এমন হবে! দুজনে চুপ, কারো মুখে কথা নেই।

দেখতে দেখতে বেলা ফুরোয়, আড্ডায় সমাপ্তি টানতে হয়। নীরব তার ভাবনা ছাড়েনি, কাল ব্যাংকে দেখা হবে, আমি ঠিক দশটায় চলে আসব। তনুর দুচোখ অশ্রুতে ভরে ওঠে, এসব পাগলামি করো না। নীরব জ্ঞান দিতে থাকে, শোনো জীবনটাকে উপভোগ করতে শোখো। তোমার জন্য অবশ্যই সামনে ভালো সময় অপেক্ষা করছে। শিহাব ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব ঘোচাতে আরো সচেষ্ট হও। ভালো ভালো জায়গায় সিভি ড্রপ করো, একটা কাজ জুটে গেলে নিঃসঙ্গতা ঘুচবে, আর্থিক সচ্ছলতাও আসবে। তনুকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নীরব হাঁটতে শুরু করে, তার চলে যাওয়া পথের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকে তনু। তার ভরাট চোখ হালকা হয়, গত বারো বছরে এই প্রথম মনে হলো, আমি একজন মানুষ-।

দেখতে দেখতে দুই বছর পূর্তি...

দুই বছরে কখনো তনুকে ফোন দেয়নি নীরব, মেয়েটির ফোনও রিসিভ করে না। ইচ্ছে করেই নিজেকে দমিয়ে রেখেছে সে, সময়ে-অসময়ে ভেবে যায় তন্বী তনুকে। সে মনে-প্রাণে চায়, মেয়েটি যেন তার সংসারে সুখেই থাকে, ভালো থাকে-।

চিঠিটি খামে ঢোকানোর আগে শেষবারের মতো পড়তে চায় তনু। চিঠিটি চোখের সামনে মেলে ধরে, তোমার কথা রাখতে পারিনি। আমি সংসার টিকিয়ে রাখতে পারিনি, অনেক চেষ্টা করেও পারিনি। একজন মানুষ আরেকজনকে এতটুকু না চিনলে, সম্মান না দিলে কোনো সংসার টেকে? আমি বাধ্য হয়েই এ বিচ্ছেদের পথ বেছে নিয়েছি। এত দিন আম্মার বাসায় ছিলাম। এই সপ্তাহে লালমনিরহাট চলে যাব। ওখানকার এক স্কুল পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আমাকে ডেকেছে। খবরটা তোমাকে জানাতে না পারায় ভীষণ অস্থিরতায় সময় কাটছে। তুমি তো ফোন কল রিসিভও করছো না! তুমি এত দিন আমার সংসার টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের সাপোর্ট দিয়েছো, তবুও আমি ব্যর্থ হয়েছি। তবে এখন আগের চেয়ে ভালো আছি। তুমি আমাকে নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণা জুগিয়েছো। আমাকে আর কত ঋণী করবে? তোমার ওপর আমার নির্ভরশীলতা কমাতে হবে, আমি তোমার জীবনে কোনো ধরনের চাপের কারণ হতে চাই না। তোমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করব না, তবে ঢাকা ছাড়ার আগে একবারের জন্য তোমার মুখোমুখি হতে চাই। ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে ডিআর এক্সপ্রেসের পাটগ্রামগামী বাস ছাড়বে। তুমি এলে আমাদের দেখা হবে-হতেও পারে এ দেখাই আমাদের শেষ দেখা।

ভাবী ও ধ্রুব-কেমন আছে? তাদের ভালো রেখো। আমি জানি, তারা তোমার কাছে সবচেয়ে ভালো থাকবে। নিজের প্রতি খেয়াল রেখো। ভালো থেকো।

চিঠিটি থেকে চোখ তোলে দ্রুত ক্যালেন্ডারে তাকায় নীরব, আজ তো তেরো ফেব্রুয়ারি! অনেকক্ষণ ধরে অফিস সহকারী মোবারক দাঁড়িয়ে আছে, স্যার ডেকেছেন? নীরব ডেস্কের ড্রয়ারে তাকায়। ব্যাংকে টাকা জমার রসিদ বইয়ে চোখ পড়ে, নুজহাত তাসনোভা তনু। ড্রয়ার থেকে বইটা তুলে আনে, মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করতে গিয়ে ব্যাগে রাখা ধ্রুব-তিনার ফটোতে চোখ পড়ে। থমকে দাঁড়ায় নীরবের সময়, মোবারক ভাই, এখন যান। প্রয়োজন হলে আপনাকে ডাকবো।

নতুন জায়গায় এসেও তনুর মনে স্বস্তি মিলছে না। সে কী চিঠিটা পায়নি, বিষণœœ মনটা নীরবের সঙ্গে কথা বলার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। হৃদি কথোপকথনে আর হচ্ছে না, তবুও নীরবকে ফোন দেয় না তনু। একা একা বাতাসের কানে কানে বলে, আমি এখন মুক্তবিহঙ্গ। আমার ডানা মেলে উড়তে আর কোনো বাধা নেই...। আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ, তোমার কাছেই এই বেঁচে থাকার সাহস পেয়েছি, আগ্রহ পেয়েছি...বলতো আমাকে আর কত ঋণী করবে তুমি? সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি নীরব। ধ্রুবর স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। তাকে রেডি করতে ডাকে, বাবা ওঠো স্কুলের সময় হয়ে গেছে। স্ত্রী বিয়োগের পর থেকে ধ্রুবর এ কাজগুলো সে-ই করে। ছেলে বাবার গালে চুমু খেয়ে আহ্লাদ করে, অনেক শীত-বাবা, আজ স্কুলে না গেলে হয় না। চলো না আজ দুজনে একসঙ্গে কোথাও ঘুরে বেড়াই। নীরব কোনো রকম যোগ-বিয়োগ না করে ছেলের কথায় রাজি হয়ে যায়, শহর থেকে বহু দূরে...। যাবে? ধ্রুব নেচে ওঠে, যাবো। নীরব ধ্রুবকে নিয়ে পাটগ্রামে যাওয়ার কথা ভাবে, সঙ্গে সঙ্গে তার বুক থেকে কিসের ভার যেন হ্র্রাস পায়।

লেখক : গল্পকার

"