অচেনা মুখ

প্রকাশ | ৩০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

হাসান মোস্তাফিজুর রহমান

লোকটাকে খুন করে ফেলব। গতকাল গভীর রাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। ফাইনাল সিদ্ধান্ত। খুন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই আসলে। সে বেঁচে থাকলে আমি বেঁচে থাকতে পারব না। ধুঁকে ধুঁকে মরে যাব বা বদ্ধ উন্মাদ হয়ে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাব। আর সে মরে গেলে আমি বেঁচে থাকব। যে করেই হোক বেঁচে থাকতে হবে আমাকে। নিষ্ঠুর এই ঢাকা শহরের সমস্ত নিষ্ঠুর আচরণ সহ্য করে হলেও। আমি মরে গেলে আমার পরিবার আঁধারের কোন অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে, কে জানে! অতএব আমার পরিবারের জন্য বেঁচে থাকতে হবে আমাকে। আর বেঁচে থাকতে হলে খুনটা করে ফেলতে হবে।

বিগত কয়েক রাতের মতো কিছুতেই ঘুম আসছিল না গতকাল রাতেও। লোকটার চেহারা বারবার ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। আর তার চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই বুকভাঙা কী এক কষ্টে চোখ ভিজে উঠছিল। ছটফট করতে করতে এপাশ-ওপাশ করছিলাম বিছানায়। চোখের সামনে থেকে তার চেহারা দূর করে দিয়ে ঘুমুতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কীসের কী? কিছুতেই তাড়াতে পারছিলাম না তার চেহারা। বরং আরো যেন জেঁকে বসছিল প্রেতাত্মার মতো। শেষে একপর্যায়ে শোয়া থেকে উঠে বসে পড়েছিলাম। গলা কেমন শুকিয়ে গিয়েছিল। অন্ধকারে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়েছিলাম টেবিলটার দিকে, যাতে রুমমেটদের কারো ঘুম না ভাঙে। জগ থেকে গেলাসে পানি ঢেলে একশ^াসে খেয়ে ফেলেছিলাম পানিটুকু। তারপর বিছানায় এসে বসে পড়েছিলাম। চুপচাপ বসে থেকে একটু পরপর মাথা ঝাঁকিয়ে মানসপট থেকে মুছে ফেলতে চাচ্ছিলাম লোকটার চেহারা। কাজ হচ্ছিল না দেখে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে চোখমুখ গুঁজে দিয়েছিলাম বালিশে; ঝড়ের সময় উটপাখি যেভাবে তার মাথা গুঁজে দেয় বালিতে। তবু কাজ হচ্ছে না দেখে নিঃশব্দে বারান্দায় চলে এসেছিলাম।

রাত তখন প্রায় তিনটে। পুরো এলাকা ঘুমুচ্ছে। রাস্তার মøান হলদেটে আলো ছাড়া কোথাও কোনো আলো নেই। আশপাশের প্রতিটা বাড়ি আঁধারে ডুবে গিয়ে আবছায়া হয়ে অতিকায় দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দূরের আলিশান বাড়িটার একটা বাথরুমের ছোট্ট জানালায় আলো ভেসে উঠেছিল হঠাৎ করে। একটু পরই জানালাটা ফের মিশে গিয়েছিল আঁধারে। রাতের প্রহরী, বেশ্যা আর তাদের খদ্দেররা, অনিদ্রারোগের রোগী আর রাস্তার কুকুররা ছাড়া পাড়ার সবাই ঘুমুচ্ছিল। ঘুম আসছিল না শুধু আমার চোখে। কী এক যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পায়চারী করছিলাম বারান্দার এ মাথা থেকে ও মাথা। চোখের সামনে সিনেমার ফ্লাশব্যাকের মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল ঘুমন্ত লোকটার চেহারা।

অথচ সুস্থ থাকার জন্য, সময়মতো অফিসে পৌঁছার জন্য, ঠিকমতো অফিসের দায়িত্ব পালন করার জন্য রাতে ভালো ঘুম হওয়া আমার জন্য খুব জরুরি। কাঁটায় কাঁটায় ঠিক ন’টায় পৌঁছুতে হয় অফিসে। তিনদিন মাত্র পনের মিনিট লেট করে অফিসে ঢুকলে একদিন অ্যাবসেন্ট। একদিন অ্যাবসেন্ট মানে বেতন থেকে একদিনের বেতন কাটা। গার্মেন্টসের মতো! তাই সকাল সাতটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে পড়তে হয়। গোসল-টোসল সেরে নাশতা খেয়ে তৈরি হয়ে বাসের জন্য প্রধান সড়কের দিকে দৌড়। এসি বাসসহ অনেক স্পেশাল সিটিং সার্ভিস বাসও যায় উত্তরা। কিন্তু ওগুলোর ভাড়া অনেক। প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় মাস শেষে অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে যাবে পকেট থেকে। সে সাধ্য আমার নেই। বেতনের প্রতিটা টাকা হিসেব করে খরচ করতে হয়। তাই টাকা বাঁচাতে উঠতে হয় লোকাল বাসে। ইচ্ছে করলেই এসব বাসে যখন তখন চট করে উঠে পড়া যায় না। ভিড় থাকে খুব। কিছুতেই ওঠা যায় না বেশির ভাগ সময়। পরবর্তী বাসের আশায় সকালের ত্বকজ¦লা রোদে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অফিস লেটের আশঙ্কা দেখা দিলে অনেক সময় জানের ঝুঁকি নিয়েই হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে পড়ি। এসবের পাশাপাশি উত্তরার ঢাকাখ্যাত যানজট তো আছেই।

গতকাল রাতে ঘুম এসেছিল শেষ রাতের দিকে। ঘুম ভাঙতে দেখি আটটা বাজে। আতঙ্কে নীল হতে হতে কোনো রকমে শুধু মুখটা ধুয়ে কাপড় পাল্টে বেরিয়ে পড়েছি নাশতা না করেই। অফিসে যখন ঢুকি তখন প্রায় সাড়ে ন’টা। হাজিরা খাতায় সই করতে হয় অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসারের রুমে ঢুকে। আমরা বলি অ্যাডমিন স্যার। দুরু দুরু বুকে অ্যাডমিন স্যারের রুমে গিয়ে ঢুকলাম।

আমাকে দেখামাত্র তেলেবেগুনে জ¦লে উঠে চিৎকার করে অ্যাডমিন স্যার বললেন, ‘কী চাই?’

‘খা...খাতায় সই করব, স্যার।’

‘কটা বাজে এখন?’

‘সাড়ে নয়টা, স্যার।’

‘অফিস ক’টা থেকে?’

‘নয়টা থেকে, স্যার।’

চিবিয়ে চিবিয়ে অ্যাডমিন স্যার বলল, ‘ন’টা থেকে অফিস? তাহলে সাড়ে ন’টায় এসেছেন কি তামশা করতে?’

‘অনেক জ্যাম ছিল, স্যার।’

‘প্রতিদিন লেইম এক্সকিউজ দেবেন না। গতকালও কুড়ি মিনিট লেটে অফিসে এসেছেন। জ্যাম তো প্রতিদিনই থাকে। তাহলে কি প্রতিদিন লেটে অফিসে আসবেন? এটা কি আপনার শ^শুরবাড়ি যে যখন খুশি তখন আসবেন? প্রতিদিন টাইমলি এসে আমি অফিস করি না?’

আপনি তো স্যার অফিসের এসি গাড়িতে করে আসেন। আপনার মতো আরো অনেকে আসেন। কেউ কেউ এসি বাসে। আপনাদের কাউকে আমার মতো লোকাল বাসের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোদে পুড়তে হয় না। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করেছিল এসব। বলা হয়নি না বলার উপায় নেই।

যা বলতে পেরেছিলাম তা হলো, ‘আর লেট হবে না, স্যার।’

‘মনে থাকে যেন!’ বলে হাজিরা খাতাটা আমার দিকে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছিলেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার। সই করার পর মাথা নিচু করে বেরিয়ে এসেছিলাম তার রুম থেকে।

অফিস সহকারী হিসেবে চাকরি করছি এ অফিসে। ডেসপ্যাচ সেকশন বলতে কিছু না থাকায় এ কাজটাও আমাকেই করতে হয়। কুরিয়ার বা ডাকে অফিসিয়াল চিঠিপত্রসহ ডকুমেন্ট ইত্যাদি যা যা আসে অফিসে সই করে রিসিভ করতে হয়। তারপর স্যারদের নাম দেখে দেখে যার যার রুমে পৌঁছে দিতে হয়। আমাদের এখান থেকে যেসব চিঠি বা ডকুমেন্ট অন্যান্য অফিসে পাঠানো হয় সেগুলোও আমাকে কুরিয়ার অফিসে দিয়ে আসতে হয় বা পোস্ট অফিসে গিয়ে পোস্ট করতে হয়। এসবের পাশাপাশি অফিস সহকারীর যেসব কাজ আছে সেগুলো তো করতেই হয়। অফিস সহকারী গালভরা নাম বা পদ আসলে; করি আসলে পিওনের কাজ। যেমনটা গালভরা পদের নাম সেলস অফিসার। সেলস এক্সিকিউটিভ আসলে। আরো সোজা করে বললে সেলস ম্যান। বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোতে এ পদে লোক নেওয়া হয়। যোগ্যতা ফার্মেসিতে অনার্স মাস্টার্স! ভাবা যায়? দেশে চাকরির বাজার এত কঠিন যে তবু এ চাকরির জন্য লাইন পড়ে।

ওদের তুলনায় আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা কিছুই না। ওদেরকে শিক্ষিত বললে আমাকে খুব সহজেই অশিক্ষিত বলা যায়। গাঁয়ের কলেজ থেকে বিএ পাশ। তবু তো রিজিকের মালিক এ চাকরিটা আমাকে দিয়েছে। না দিলে কী করতে পারতাম? হাজারো উচ্চশিক্ষিত রাস্তায় রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ বিএ পাস করে আমি একটা চাকরি করছি। প্রতি মাসে অনেক কম হলেও নিয়মিত বেতন পাচ্ছি। তার দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া। চাকরিটা আমার খুব দরকার। কাজ মন দিয়ে করা দরকার। আগামিতে পদোন্নতির সুযোগও আছে। মন দিয়েই কাজ করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ওই লোকটা... ওই লোকটার কারণে কয়েক দিন ধরে সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। মেসে ফিরেও শান্তি পাচ্ছি না, রাতে ঘুমুতে পারছি না, লেট করে অফিসে আসছি, কাজে মন বসাতে পারছি না। সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে চাকরি থাকবে না। জিএম স্যার গতকাল তো সে হুমকিই দিলেন। অতএব চাকরি বাঁচাতে, নিজেকে বাঁচাতে, নিজের পরিবারকে বাঁচাতে লোকটাকে খুন করতেই হবে। এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই আমার সামনে।

কুরিয়ারে জিএম স্যারের একটা ডকুমেন্ট এসেছিল গতকাল। বিভিন্ন নামে আরো অনেকগুলো এসেছিল। সবার আগে গেলাম জিএম স্যারের রুমে। টেবিলে স্যারের সামনে আলতো করে রাখলাম ডকুমেন্টটা। খামের ওপরে লেখা নাম-ঠিকানায় চোখ বুলিয়েই গর্জে উঠলেন জিএম স্যার।

‘এটা কার ডকুমেন্ট?’

‘কে...কেন স্যার, আপনার!’

ডকুমেন্টটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে জিএম স্যার বললেন, ‘পড়ে বলুন ওখানে কার নাম লেখা আছে?’

হতভম্ব হয়ে দেখলাম পারচেজ অফিসার আফজাল স্যারের নাম লেখা।

‘চুপ করে আছেন কেন? বলুন কার নাম লেখা? নাকি সামান্য ওই ইংরেজিটুকুও পড়তে পারেন না?’

‘আফজাল স্যারের নাম লেখা, স্যার।’

‘তাহলে এটা আমার কাছে নিয়ে এসেছেন কেন? এ অফিসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঘোড়ার ঘাস কাটার চাকরি নেওয়া উচিত আপনার মতো অপদার্থের।’

‘সরি, স্যার। আর এরকম ভুল হবে না, স্যার। এক্ষুণি আপনারটা এনে দিচ্ছি।’ বলে একদৌড়ে নিজের টেবিলে এসে জিএম স্যারের নামে আসা ডকুমেন্টটা নিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম তার রুমে।

অতি সামান্য একটা ভুল। সরি বলেছি। সঙ্গে সঙ্গে ডকুমেন্টটাও নিয়ে এসেছি। তবু আক্রোশ কমে না স্যারের।

‘শুধু আজকের ব্যাপারটা না। কয়েক দিন ধরেই কাজে মন নেই আপনার। কেমন উ™£ান্ত ভাব নিয়ে ডিউটি করেন। অফিসেও আসেন লেট করে। কাহিনি কী আপনার?’

‘পারিবারিক একটা টেনশনে আছি, স্যার। আর এ রকম হবে না।’

‘এ অফিসে চাকরি করতে হলে পারিবারিক টেনশন বাসায় রেখে আসতে হবে, অফিসে আনা যাবে না। অফিসে আনলে চাকরি থাকবে না।’

‘আর আনব না, স্যার।’

‘আপনি তো সিম্পলি গ্র্যাজুয়েট। তাও গ্রামের এক অখ্যাত কলেজ থেকে। অনার্সসহ এমবিএ করা অন্তত পঞ্চাশ জন ছেলেমেয়ের সিভি জমা পড়েছে আমার কাছে। এদের কেউ আপনার চাকরিটা পেলে হাসিমুখে করবে।’

চাকরি হারানোর ভয়ে বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গিয়েছিল আমার। পানি এসে গিয়েছিল চোখে।

‘চাকরিটা আমার খুব প্রয়োজন, স্যার। এখন থেকে আরো মন দিয়ে কাজ করব, স্যার।’

সম্ভবত আমার চোখে পানি দেখেই কিছুটা নরম হয়েছিল নিষ্ঠুর লোকটা। ‘সিন ক্রিয়েট করবেন না এখানে। যান, মন দিয়ে কাজ করুন। অ্যান্ড বি কেয়ারফুল অ্যাবাউট ইয়োর ডিউটি।’

একটা মুখ। সেই মুখে কী মায়া! কী আশ্চর্য অসহায়ত্ব! কোনো ঘুমন্ত মানুষের মুখে এ রকম মায়া, এরকম অসহায়ত্ব জীবনেও দেখিনি। মনে হয় যেন বা বাস্তবে নয়, প্রতিদিন স্বপ্নে দেখি সেই মুখ। ওই মুখটাই কয়েকটা দিন ধরে ডিউটিতে কেয়ারফুল হতে দিচ্ছে না আমাকে। চোখের সামনে সারাক্ষণ ভেসে বেড়ায় ওই মুখ। দিনরাত কেমন এক ঘোরের মধ্যে থাকি। সারাবেলা সারাক্ষণ ওই মুখ নিয়ে ভাবি। জিএম স্যার তো ঠিকই বলেছেন, কেমন উ™£ান্ত ভাব নিয়ে অফিস করছি। সাবধানে কাজ করতে বলেছেন। নইলে চাকরি খাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু আমি তো এখন প্রচ- জ¦রে ভোগা প্রবল প্রলাপ বকা এক মানুষের মতো। কী করে আগের মতো পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে মন দিয়ে অফিসের কাজ করব? ওই মুখ তো আমাকে প্রবল ঘোর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। অতএব প্রবল এই ঘোর থেকে নিজেকে বের করতে লোকটাকে খুন করে ফেলতে হবে আমাকে। এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই আমার সামনে।

লোকটাকে প্রথম দেখি চারদিন আগে। মসজিদে জোহরের নামাজ পড়তে গিয়ে। মসজিদে গেলেও জামাতে জোহর নামাজ পড়া হয় না। পড়ার সুযোগ নেই। জামাত দাঁড়ায় সোয়া একটায়। আমি যাই দুটোর একটু পর। জামাত পাব না জেনেও মসজিদে গিয়েই জোহরের নামাজ আদায় করতে হয় আমাকে। কারণ অফিসে নামাজ পড়ার কোনো জায়গা রাখা হয়নি। জায়গা রাখার আসলে দরকারও নেই। একজন মানুষও নামাজ পড়ে না। আর দুটোর পর যে নামাজে যাই তারও কারণ আছে। অফিসে লাঞ্চ আওয়ার দেড়টা থেকে দুটো পর্যন্ত। কিন্তু আমার আর পিওনদের জন্য দুটো থেকে আড়াইটা। লাঞ্চ আওয়ারেও স্যারদের এমারজেন্সি কখন কী লাগে সেজন্যই এ ব্যবস্থা। অদ্ভুত নিয়ম। কিন্তু মেনে নেওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। চাকরি করতে হলে মানতে হবে এ নিয়ম।

মসজিদটা অফিসের কাছেই। দু মিনিটের হাঁটাপথ। ছোট্ট একটা মসজিদ। ছোট্ট একটা বারান্দাও আছে। জামাত শেষ হওয়ার পর মূল মসজিদে ঢোকার গেইটে তালা মেরে দেওয়া হয়। জামাত ফেল করা নামাজিদের জন্য বারান্দাটা খোলা রাখা হয়। তো চারদিন আগে নামাজ শেষ করে ডানদিকে তাকাতেই দেখতে পেয়েছিলাম লোকটাকে। দেয়াল ঘেঁষে কাত হয়ে ঘুমিয়ে আছে আমার দিকে মুখ করে। অতি স্বাভাবিক একটা দৃশ্য। ঢাকা শহরের প্রায় সব মসজিদেই জোহরের নামাজের জামাতের পর এ দৃশ্য চোখে পড়ে। নামাজের পর শুয়ে থেকে বা ঘুমিয়ে বিশ্রাম নেয় অনেক নামাজি। কিন্তু এ লোকটার মুখের দিকে তাকাতেই দৃষ্টি আটকে গেল আমার। নিজের অজান্তেই বন্ধ হয়ে গেল নিঃশ^াস। কী করুণ একটা মুখ! কী অসহায়! কী মায়া সেই মুখে! কী এত দুঃখ তার? কী এত কষ্ট? সে নিশ্চয়ই আমার চেয়েও অসহায়। আমার চেয়েও দুখি। তার এই কষ্টেমাখা আশ্চর্য মুখই এই সাক্ষ্য দিচ্ছে। আহা রে! কে এই লোকটা? কোত্থেকে এসেছে? কেন এসেছে? কী কাজে? আগে তো কখনো দেখিনি? আশপাশের কোনো অফিসে কাজে এসেছে? নামাজ শেষে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে? নাকি এখান দিয়ে যাওয়ার পথে নামাজ পড়ার জন্য ঢুকেছিল? এসব ভাবতে ভাবতে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। তাকিয়েই ছিলাম প্রবল এক ঘোরের মধ্যে। দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলাম না কিছুতেই। হঠাৎ মসজিদের ঘড়িতে আড়াইটা বাজার ঘণ্টা পড়তেই সম্বিত ফিরে পেয়েছিলাম। সর্বনাশ। আমার লাঞ্চ টাইমই তো আড়াইটা পর্যন্ত। আজ না খেয়েই অফিসে ফিরতে হবে দ্রুত।

এর পরদিন থেকে প্রতিদিনই জোহরের নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়ে দেখি লোকটাকে। সেই একই ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে। বারান্দার দেয়াল ঘেঁষে। ডান কাত হয়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষটি হয়ে। সে কি প্রতিদিন জামাতে নামাজ আদায় করার পর এভাবে ঘুমিয়ে পড়ে বিশ্রাম নেয়? কখন ঘুম থেকে উঠে মসজিদ থেকে বেরিয়ে যায়? আশপাশের কোনো অফিসে কোনো কাজে এসেছে। কাজ শেষ হয়নি বলে এখনো রয়ে গেছে? তাহলে থাকে কোথায়? নাকি কোনো অফিসে নতুন চাকরি নিয়েছে? কোন অফিসে? কোনো উত্তরই জানা নেই আমার।

 

দুই

অফিসের দেয়ালঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছি। আর পাঁচ মিনিট পরই লাঞ্চ আওয়ার শুরু হবে আমার। দুটো বাজামাত্র বেরিয়ে পড়ব। ঠিক ঠিক জানি আজও ওই অবস্থায় লোকটাকে পাব। ছুরি চাকু কিছুই লাগবে না। আমার হাতদুটোই যথেষ্ট। গাঁয়ের ক্ষেতে খামারে কাজ করা হাত। এখনো লোহার মতো শক্ত। দু হাত দিয়ে গলা টিপে ধরলে টুঁ শব্দও করতে পারবে না। কতক্ষণ লাগবে? শুনেছি অক্সিজেন ছাড়া মানুষ আড়াই মিনিটের বেশি বাঁচতে পারে না। ঝটপট কাজ সেরে বেরিয়ে পড়তে হবে। কোনো সমস্যা হবে না। কেউ দেখবে না। এ সময়টায় আমি আর সে ছাড়া কেউ থাকে না মসজিদে।

দুটো বাজতেই বেরিয়ে পড়লাম অফিস থেকে। কী এক উত্তেজনায় নিজের অজান্তেই দ্রুত পা চালিয়ে পৌঁছে গেলাম মসজিদে। আছে। ঠিক প্রতিদিনকার মতো সেই চেনা ভঙ্গিতে ঘুমুচ্ছে। ঢুকে পড়লাম ভেতরে। বেড়ালের মতো নিঃশব্দে এগিয়ে বসে পড়লাম লোকটার পাশে। আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই পুরো মসজিদে। কেউ দেখবে না। মসজিদে ঢোকার পথের দিকে একবার তাকিয়ে হাতদুটো বাড়িয়ে দিলাম লোকটার গলার দিকে। কিন্তু এ কী! কাঁপছে কেন এভাবে! ঝট করে টেনে নিলাম দু হাত।

আর হঠাৎই মনে পড়ে গেল আমার বৌ রোকাইয়া ফোন করেছিল সেদিন রাতে। মায়ের শরীরটা নাকি আরো খারাপ হয়েছে। কাশি তো আছেই। বাতের ব্যথাটাও বেড়েছে। ব্যথায় গভীর রাত পর্যন্ত ঘুমুতে পারে না মা আমার। গঞ্জের এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখানো দরকার। ভিজিট আর ওষুধ মিলিয়ে হাজারখানেক টাকা তো লাগবেই। ছেলে আবদুল্লাহ্র স্কুল ব্যাগটা অনেক পুরনো। সেদিন ছিঁড়ে গেছে। নতুন একটা ব্যাগের জন্য কান্নাকাটি করে। পাঁচশো টাকার নিচে কোনো স্কুল ব্যাগ পাওয়া যায় না। এ মাসের টাকা পাঠানোর সময় যেন বাড়তি দেড় হাজার টাকা পাঠাই। যেভাবেই হোক। আমার এত ভালো বৌটা নিজের জন্য কিছুই চায়নি। আমার চাকরিটাই যদি না থাকে রোকাইয়া চাইলে কীভাবে পাঠাব বাড়তি টাকা? প্রতি মাসে যে টাকা পাঠাই সেটাই বা পাঠাব কীভাবে? আমার এত ভালো চাকরিটা এ লোকটার জন্য চলে যেতে পারে। এ লোকটার জন্যই একটা মুহূর্ত শান্তি পাচ্ছি না। বাসায় বা অফিসে কোথাও কাজে মন বসাতে পারছি না। আমার সবকিছু শেষ হয়ে যেতে বসেছে। অতএব পারতেই হবে আমাকে।

ঝট করে ফের হাতদুটো বাড়িয়ে দিলাম লোকটার গলার দিকে। কী আশ্চর্য অসহায় একটা মুখ! কী দুখি একটা মুখ! পুলিশ আসবে। তদন্ত হবে। সাংবাদিকরা আসবে। খবরের কাগজগুলোতে লেখালেখি হবে কয়েক দিন। তারপর তরতাজা খুনের ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে যাবে অতি সাধারণ এই মানুষটার খুনের ঘটনা। নিষ্ঠুর এই ঢাকা শহরের লাখো অচেনা মুখের ভিড়ে চিরতরে বিস্মৃত হয়ে যাবে অচেনা এই মুখ।

লেখক : গল্পকার

"