সমৃদ্ধির স্বার্থে আঞ্চলিক ঐক্য

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

ফনিন্দ্র সরকার

সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি শব্দ দুটি পাস্পরিক নির্ভরশীল। সম্প্রীতি ছাড়া সমৃদ্ধি হয় না, আবার সমৃদ্ধির পথ ধরেই সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। সম্প্রীতির একটা ভিত্তি দরকার, সে ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, তবে সে সম্প্রীতি টেকে না, টেকসই না হলে শান্তি বিঘিœত হবে, সমৃদ্ধির পথও রুদ্ধ হবে। আধুনিক মানবসভ্যতা তো একটি চর্চার মধ্য দিয়েই এগিয়েছে। চর্চার ঘনত্ব বিবেচনায় এর প্রকৃতি বদলে যায়, সে জন্যই মানবসমাজকে পরিবর্তনশীল সমাজ বলা হয়। এই পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থার আলোকে সভ্যতা যেভাবে বিকশিত হয়েছে, সে বিকাশমান ধারাকে যদি অসম্মান করা হয়, তবে সেটা সামাজিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ অপরাধ ভবিষ্যৎ ক্ষমা করবে না, এ কথা সবারই জানা। পৃথিবীর মানবসমাজ সূচনালগ্ন থেকেই ধারাবাহিক ঐক্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। আজকের পৃথিবীকে গ্লোবাল ভিলেজ বলা হয়। মানুষ পরস্পর খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে, এটা বিজ্ঞানের কল্যাণে। বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ, এ নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে আর তা থাকতেই পারে। প্রকৃত অর্থে এর ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে অভিশাপ, আশীর্বাদ। আধুনিক পারমাণবিক অস্ত্র যেমন সভ্যতাকে ধ্বংস করতে পারে আবার মানুষের কল্যাণও করতে পারে। গণতান্ত্রিক ও শক্তিমান একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণে পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজন অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। এরূপ ক্রমশক্তিমান রাষ্ট্রের উত্থানকে বর্তমান বিশ্বে একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র খুব উৎসাহের সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র একক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে মনে করে। তারপরও বিশ্বশক্তির এই দেশটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে শুধু নিজ রাষ্ট্র শক্তি দিয়ে টিকে থাকা যাবে না, আর তাই বুঝেশুনে বিভিন্ন উদীয়মান শক্তির রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিবন্ধনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহকে পুরো পৃথিবীই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশক্তিমান ভারতের উত্থানকে গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা এমন এক ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী, যা হবে বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র এবং বাজার অর্থনীতির। হাজার হাজার মাইল থেকে দূরে অবস্থান করেও তারা কৌশলগত কারণে সম্পর্ক গড়তে দৃঢ় প্রত্যয়ী। সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে ঐক্যের মানসিকতা নিয়েই অগ্রসর হতে চাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে পা রেখে পৃথিবীর সব রাষ্ট্র উপলব্ধি করছে, এককভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বলেই অঞ্চলে অঞ্চলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংগঠন গড়ে তোলা হচ্ছে। আবার ধর্মীয় মতবাদের ভিত্তিতেও সংগঠন গড়ে উঠেছে।

বিশ্বের বাস্তবতায় সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির স্বার্থে আঞ্চলিক ঐক্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই উপমহাদেশের নেতৃত্বকে পারস্পরিক সংশ্লিষ্টতার একটি অসাধারণ কৌশলগত সুবিধার কথা মাথায় রেখে অগ্রসর হতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্ককে নিয়ে যেতে হবে ভিন্ন এক উচ্চতায়। মনে রাখা উচিত, আজকের উন্মুক্ত সমাজ ব্যবস্থাপনায় সারা বিশ্বই সন্ত্রাসবাদ ও অপরাধের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলা এককভাবে সম্ভব নয়। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ যদি তাদের ক্রিয়াকর্ম বিনা বাধায় করতে সক্ষম হয়, তবে সম্প্রীতি এবং সমৃদ্ধির স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না। এই অঞ্চলকে বাজারভিত্তিক অর্থনীতি শিল্প ও বাণিজ্যকে উন্নয়নের মূলমন্ত্র হিসেবে মনে করতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষা এবং দৃঢ় কার্যনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্তৃত্ববাদ ও আধিপত্যবাদের ওপর এই অঞ্চলের মানুষের সহজাত অনাস্থা রয়েছে। এ ইতিহাস খুব দূরের নয়। তাই বৈরিতা নয় পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, নিন্দুকেরা সব সময় সবকিছুকেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে অবলোকন করে। আজ আমাদের অতি দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ভারতবর্ষ ইংরেজদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করে। সেদিন একটি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়, ইংরেজ শাসন-শোষণমুক্ত হলেও ভারত বিভক্তিতে সেদিন অনেকের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটেছিল।

দেশভাগ হলো আজকের বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পরের ইতিহাস সবারই জানা। সংখ্যাগুরু বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানে তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠী আমাদের বাঙালিদের ওপর সুশাসনের পরিবর্তে শোষণের স্ট্রিম রোলার চালু করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। ভারতের সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে সার্বভৌম বাংলাদেশে রূপান্তর হয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্প্রীতির দর্শনে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে; কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে কুচক্রী পাকিস্তানের অনুসারীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় অনেক জল গড়ায়। ঘুরিয়ে দেওয়া হয় ইতিহাসের চাকা। স্বাধীনতাবিরোধী ভয়ংকর শক্তি ক্ষমতায় এসে বিষ ঢালতে থাকে সম্প্রীতির মাঠে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেই ঘাপটি মেরে থাকা পাকিস্তানের অনুচর গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে কলঙ্কময় ইতিহাস সৃষ্টি করে। কালের বিচারে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বঙ্গবন্ধুই ইতিহাসের মহত্তম শহীদ। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘদিন এমন একটি গোষ্ঠী এ দেশটাকে শাসন করেছে, সে শাসন ছিল বিতর্কিত। ১৯৭২-এর সংবিধানকে করা হয়েছে ক্ষতবিক্ষত। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের আদলে কাঠামো তৈরি করা হয়, তার মানে সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, যা কিনা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। অথচ সেই শাসকগোষ্ঠী গণতন্ত্রের মিথ্যা বুলি আওরিয়ে জনগণকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। বিনষ্ট হয় সম্প্রীতি অথচ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সম্প্রীতিতে ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। স্বাধীনতার মূল স্পিরিট নস্যাৎ করার কারণেই এ অঞ্চলের বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তথা বিশ্বের সঙ্গেই কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যার জট খুলতে থাকে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ শেখ হাসিনার শাসনকালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও গঙ্গার পানি চুক্তির মতো দুটি বড় সমস্যার সমাধান হয়। এরপর ২০০১-এর ১ অক্টোবরের নির্বাচনে একটি গুড গভর্মেন্টের পরাজয় ঘটে। আবার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটে। যে কারণে সম্প্রীতিও প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং সমৃদ্ধিও থেমে যায়।

আজ আমরা সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির স্বার্থে আঞ্চলিক ঐক্যের কথা বলছি। বিখ্যাত লেখক ইমানুয়েল কান্ট তার চবৎ চবঃঁধষ চবধপব গ্রন্থে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য একটি বিশ্ব সরকার (ডড়ৎষফ এড়াবৎসবহঃ) প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তিনি শান্তি পরিকল্পনা সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কিত স্বীয় বিশেষণ দিয়ে তার মতে, ‘মানুষের বিবেক ও বিচার শক্তিই প্রকৃতিগত স্বার্থপর দিকটি থেকে প্রায়শ্চিত করে অনুতাপের মাধ্যমে ভারসাম্য জোগায়। একদিকে স্বার্থপর অহংকারী ও অর্জনেচ্ছু, অন্যদিকে বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন ও দায়বদ্ধতায় ত্যাগ করার মানসিকতা।’ পরেরটি গ্রহণ করছে না কেউ কেউ। দেখা যাচ্ছে একবিংশ এই শতাব্দীর বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে ক্রমাবনতিশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান মতবিরোধ সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় একটি মাত্র ভুলের ফলেই বিশ্বে পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হতে পারে, তাই সব রাষ্ট্র সব জাতির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিজ্ঞানীরা বলেন, পারমাণবিক যুদ্ধের কবল থেকে বিশ্বকে রক্ষার জন্য পরস্পর মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বে¡র হাত প্রসারিত করা প্রয়োজন। বর্তমান শতাব্দীর উষালগ্নে ২০০১ মালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসে প্রায় ৫ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে। এর ফলে আফগানিস্তানে আক্রমণ, ইরাকে ধ্বংসযজ্ঞ প্রভৃতি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবনতি ঘটে। শান্তিকামী মানুষের মনে তীব্র বেদনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ যুদ্ধাবস্থা এবং অশান্তিকর পরিবেশ চায় না। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানা অজুহাতে যুদ্ধই যেন প্রধান কর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ যুদ্ধ কখনোই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তবে স্বাধীনতার জন্য দখলদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্তি পেতে যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সেটা ন্যায়যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর ইংল্যান্ডের একজন বিশিষ্ট লেখক ঘড়ৎসধহ অহমবষষ তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য গ্রেট ইলিউশনে জোরালোভাবে মতপ্রকাশ করেন। আধুনিককালে বিজয়ী এবং বিজেতা উভয়ের জন্য যুদ্ধ অলাভজনক। অধিকন্তু সামরিক প্রস্তুতি অর্থনৈতিক দিক থেকে অপচয়। তিনি মনে করেন, কার্যকর শান্তি প্রতিষ্ঠা করার আগে মানুষের চিন্তার মানসকে পরিবর্তন করতে হবে। এই পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। ভৌগোলিক বাস্তবতার আলোকে আমাদের মানসিক পরিবর্তন আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। কেননা ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রের অবস্থা ও কার্যকলাপের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক জাতীয় নীতিনির্ধারণে লাভজনকভাবে প্রয়োগ করা যায়, যা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ ক্ষেত্রে ভূ-রাজনীতি হচ্ছে অন্যতম অনুষঙ্গ। রাষ্ট্রীয় সমস্যাধীন বিষয় সমাধানের চেষ্টা করতে হয় রাজনৈতিক ভূগোলের দৃষ্টিভঙ্গির সফল প্রয়োগের ভিত্তিতে। এই প্রায়োগিক কৌশল হচ্ছে কূটনীতি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কিংবা প্রতিবেশী অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে এই কৌশল অবলম্বন করতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি বাংলাদেশে ভারতের বাণিজ্য বৈষম্যের কথা। আসলে বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান তথা দেশ দুটোর স্ব-আয়তনের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজতে চেষ্টা করা আজ সবার দায়িত্ব।

এ কথা আজ কারো অজানা নয় যে, বিশ্বমন্দা পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী। ধনী বিশ্ব হিসেবে পরিচিত দেশগুলোয় মন্দা পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে। আগামী কিছুদিনের ভেতরে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশ্বকে অর্থনৈতিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অর্থনৈতিক ও মানসিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে ঐক্য গড়ে তোলতে হবে। সম্প্রীতির ভিত্তিতে এই ঐক্যের ভিতকে মজবুত করতে হবে। এ জন্য চাই রাষ্ট্রের জাতীয় নীতির স্বচ্ছতা। জাতীয় নীতির সম্প্রসারিত অংশই পররাষ্ট্রনীতি। পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের জাতীয় নীতির সেই অংশ যে অংশ বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব চার্লস ইভান বলেছেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি বিমূর্ত কোনো কিছুর ওপর গড়ে তোলা হয় না, এটা জরুরি ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রগাঢ়ভাবে বৈশিষ্ট্যময় কোনো কিছু থেকে উৎসারিত জাতীয় স্বার্থের বাস্তব ফল।’

(Foreign policies are not built upon abstractions. They are the result of conceptional of national is trust aresing from some Exegency or standing out vividly is historical pospective.) কাজেই চিন্তা করতে হবে জাতীয় স্বার্থের ফল জনগণের মাঝে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাসকে অবলম্বন করার প্রবণতা থাকে। মানুষের এই প্রবণতাকে দুর্বলতা ভাবলে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সময় বদলেছে ভারতের নীতিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে আসছে। বেসরকারি খাতে বাণিজ্য বিনিয়োগে ভারত এখন সহায়ক রাষ্ট্র। ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতের কর্মযজ্ঞ প্রশংসিত এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবেও ভারতের আবির্ভাব ঘটেছে। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে যুক্তরাষ্ট্রের এখন প্রয়োজন একজন বৈশ্বিক মিত্র। তাই ভারতকেই মনে হয় বেছে নিয়েছে। এ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। ভারতকে কেন্দ্র করেই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে হবে। পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি যেহেতু ভারতের প্রতি ইতিবাচক, তাই এর গুরুত্ব অনুধাবন করে সুযোগ সৃষ্টি করে তা কাজে লাগানো উচিত। কতগুলো ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের ভিতকে মজবুত করতে হবে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। আধুনিক বিশ্বায়নে যে প্রতিযোগিতা চলছে, সে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি।

জাতীয় উন্নয়নের মূল ভিত্তি হচ্ছে মানুষের সততা, মনুষ্যত্ব ও কাজ। এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলে সত্যিকারের অধিকার বাস্তবায়নে বিভিন্ন সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশ্বের বর্তমান অস্থিতিশীল এবং সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এই অঞ্চলকে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে বিকশিত করা দরকার। অর্থনৈতিক ঐক্যও জরুরি। প্রতিবেশী ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এই দেশে কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে নয়, তারা স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য সাধারণ মানুষের তথা দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিতকে শক্তিশালী করা। পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করে প্রেম-ভালোবাসা দিয়েই সমস্যার উত্তরণ ঘটাতে হবে। অতিমাত্রায় ভোগবিলাসিতা কমিয়ে সীমাহীন অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে পারলেই মানুষের মধ্যে তৈরি হবে ভ্রাতৃত্ববোধ। এই বোধই সম্প্রীতি। সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হলেই সমৃদ্ধির পথ প্রশস্থ হবে-এটাই বিজ্ঞান।

লেখক : কলামিস্ট

"