গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার : খবরের গভীরে খবর

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

মোবারক হোসেন

গণমাধ্যমজগতে সাক্ষাৎকারের সঙ্গে কম-বেশি সবাই পরিচিত। সাক্ষাৎকার মানেই হচ্ছে প্রত্যাশিত ব্যক্তির সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলে তথ্য ধারণ করা। গণমাধ্যমকর্মী প্রশ্ন করবেন আর প্রত্যাশিত ব্যক্তি উত্তর দেবেন-এই প্রশ্ন আর উত্তরের মৌলিকত্ব অক্ষুণœ রেখে আলাপে-সংলাপে যে সংবাদ সম্পর্কিত নিবন্ধ তৈরি হয়, এটাকেই বলা যায় সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার হচ্ছে নিজস্ব প্রেরণায় সৃষ্ট প্রশ্ন করে উত্তরের মাধ্যমে খবরের গভীরে খবর তৈরি করা।

আবার এভাবেও বলা যায়, সাক্ষাৎকার হচ্ছে, প্রশ্নের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ব্যক্তির কাছ থেকে পাঠকের জানার আগ্রহের বিষয়টি উত্তরের মাধ্যমে তুলে আনা। যদি সংবাদকর্মীর প্রশ্ন ও প্রত্যাশিত ব্যক্তির উত্তর গঠনমূলক, তথ্যমূলক ও সময় উপযোগী হয়, তাহলে পাঠকের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি সেখানে নিবদ্ধ হবে। আর তখনই একটি সাক্ষাৎকার গণমাধ্যমজগতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সংবাদপত্রে কত রকমের সাক্ষাৎকারই তো আছে। সব সাক্ষাৎকারই সময়, বিষয় ও অবস্থান ভেদে পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই নিবন্ধে আলোচিত জাতীয় পর্যায়ের কীর্তিমান ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে; যে সাক্ষাৎকারে গভীর কোনো বিষয় উঠে আসে। আর সাক্ষাৎকারদাতা তার কর্মের জন্য জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত।

যে কথা বলার জন্য এ নিবন্ধের অবতারণা-গণমাধ্যমে একটি সাক্ষাৎকার তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়? যখন জনসাধারণ্যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, নানাভাবে বহুল আলোচনায় আছে; কিংবা কোনো সাফল্যজনক বিষয় দেশজুড়ে বা দেশের গ-ি পেরিয়ে সাক্ষাৎকারদাতাকে অনন্য করেছে, তখন ওই বিষয়টি জানার অনুপ্রেরণা জনমনে উচ্চমাত্রার ঔৎসুক্য সৃষ্টি করে। তখন ওই বিষয়ের পেছনের কীর্তিমান মানুষটির সাক্ষাৎকার গণমাধ্যমের জন্য অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় সামনে আনা যেতেই পারে। দেশে তৈরি ওষুধ বিদেশি বাজার সগর্বে দখল করেছে; যে দেশ সচরাচর সাধারণ অনেক পণ্য আমদানি করে, সে দেশ উল্টো করেছে রফতানি, তাও আবার উচ্চ প্রযুক্তির জীবন রক্ষাকারী ওষুধ-এটা নিঃসন্দেহে পাঠকের কাছে আগাগোড়া সবিস্তারে জানার মতো একটা বিষয়। প্রকাশিত এ বিষয়ে পাঠক গভীর নিরক্ষণী দৃষ্টি ফেলবে। কী করে এটা ধাপে ধাপে সম্ভব করে তোলা হলো।

কিংবা কোনো সংকট এতটা ঘনীভূত যে, জাতির অনুভবে অস্বস্তি সৃষ্টি করে চলেছে, সেসব বিষয়ের আরো গভীরের কথা মানুষের জানার আগ্রহের শীর্ষে থাকে। এসব বিষয়ের কোনো কীর্তিমান মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ ভেতরের কথা প্রশ্নের মাধ্যমে একজন সংবাদকর্মী টেনে আনেন বাইরের আলোতে। আর সেসব কথার গাঁথুনি লম্বা সাক্ষাৎকারে রূপ যদি নিয়ে আসা যায় গণমাধ্যমের আঙিনায়, তাহলে ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে পাঠক প্রশ্ন এবং উত্তরগুলো গভীর মনোযোগে পড়ায় মত্ত হবে। এভাবে একটি সাক্ষাৎকার গণমাধ্যম জগতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সাক্ষাৎকারের জন্য থাকা চাই চিন্তাশক্তির যৌক্তিক প্রশ্ন; যে যুক্তিযুক্ত চিন্তার প্রশ্নে উত্তর দিতে আগ্রহী হবেন কাক্সিক্ষত ব্যক্তি। এভাবে দশ-বারোটি প্রশ্নের আগাম প্রস্তুতি থাকা দরকার সাক্ষাৎকার গ্রহীতা সংবাদকর্মীর।

জাতীয় পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন খাতে অনেক ব্যক্তিত্ব আছেন-যেমন রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ইত্যাদি। এসব বিষয়ে এসব খাতের বিশেষ ব্যক্তিদের বলা কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বাক্য কখনো কখনো জাতীয় জীবনে গুরুত্ব বহন করে; সেই সব গুণিজন দেশের নানা সংকটেও মূল্যবান কথা বলেন। বিষয়ের গুরুত্বে ও কথার ধরনে মনে হতে পারে তারা একই প্রসঙ্গে আরো গভীর কিছু ব্যক্ত করে দিতে চান। সুযোগে, সময়ে বা বছরান্তে তাদের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হবে না-তা কী করে হয়?

একজন সংবাদকর্মী সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব চেতনা-সৃষ্ট প্রশ্ন নিয়ে কোনো জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তির মুখোমুখি হলে একটা ভালো মানের বিশেষ সাক্ষাৎকার হয়ে যায়। ওই সাক্ষাৎকারে দুটো দিক উঠে আসতে পারে-এক. গঠনমূলক প্রশ্নগুলোর উত্তর সংবাদকর্মীর মাধ্যমে প্রচারে আসুক-এটা ওই ব্যক্তিত্ব মনেপ্রাণে চাইবেন, দুই. গঠনমূলক উত্তরগুলো পাঠকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে। ফলে পাঠক এ কারণে ওই সাক্ষাৎকার পড়তে হুমড়ি খেয়ে পড়বেন।

অন্যদিকে ওই ধরনের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতে পেরে যেমন একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পাঠকের চোখে বিশেষত্ব লাভ করবে, তেমনই ওই ব্যক্তিত্ব না-বলা কথাগুলো বলতে পেরে ওই গণমাধ্যমকে আলাদা সমীহর চোখে দেখবেন। এভাবে একটি গণমাধ্যম নানা খাতের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের না-বলা কথা বলার সারিতে এনে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কৃতিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিয়ে দিয়ে পাঠকমহলে অধিক গ্রহণযোগ্য অর্জনে সক্ষম হয়।

এভাবে গণমাধ্যমে, ব্যক্তিত্ব ও পাঠক একই সরলরেখায় একই সারিতে বাঁধা পড়বেন সম্পর্কের অদৃশ্য বাঁধনে। অবশেষে এর প্রভাব গিয়ে পড়ে ওই পত্রিকার প্রচারসংখ্যার ওপর। আর প্রচারসংখ্যা বাড়লে তো ব্যবসায়িক প্রশ্ন উত্তরোত্তর ঊর্ধ্বমুখী হবেই। তাই এসব কারণে সাক্ষাৎকাররূপী নিবন্ধটি গণমাধ্যমে এভাবে সংবাদ আইটেম থেকে ভিন্ন গুরুত্বে স্বতন্ত্রধারায় প্রবাহিত হচ্ছে।

সাক্ষাৎকার নিবন্ধের সুবিধা হচ্ছে, পরস্পরের প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে সৃষ্ট ভাবনার সরলরেখায় আলোচ্য বিষয়ের পরিধিতে ইচ্ছেমতো গঠনমূলকভাবে বিচরণ করা যায়। টেনে আনা যায়, বিষয়বস্তুর গভীরের নানা দিক। ফলে পাঠকের অজানা অনেক কিছু অভিজ্ঞতার আলো থেকে উত্তরদাতা ব্যক্তি সগর্বে মন খুলে জানিয়ে দিতে পারেন। এতে সাক্ষাৎকার নিবন্ধের পরিধিতে সঞ্চিত হয় সমৃদ্ধ তথ্য; যা পাঠক একাগ্রচিত্তে আগ্রহ সহকারে রসিয়ে রসিয়ে পাঠ করেন। এভাবে একটি সাক্ষাৎকার সংবাদপত্রের অনিবার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার দুই ধারায় হতে পারে। এক. ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাক্ষাৎকার-যে সাক্ষাৎকারে ওই ব্যক্তির জন্মকথা, বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া, গবেষণা, কর্মকালীন প্রতিষ্ঠানের নাম- এসব ধারাবাহিকতাই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠার প্রধান উপাদান হিসেবে তাকে পরিচিতি করে তুলবে। আর সর্বোপরি তার কীর্তিময় জীবনের নানা দিকের প্রসঙ্গ তো থাকবেই। এ সাক্ষাৎকারটির মাধ্যমে অপরিচিত পাঠকের মধ্যে নতুন করে ওই ব্যক্তির পরিচিতির প্রসারতা ঘটবে। এটাকে বলা যেতে পারে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাক্ষাৎকার।

কোনো ব্যক্তিত্বের দ্বিতীয় যে সাক্ষাৎকারটি হতে পারে তা হচ্ছে, কোনো সাফল্যমন্ডিত বিষয়ে বা কোনো সংকটে গ্রহণযোগ্য বিশেষ ব্যক্তির মতামত সংবলিত সাক্ষাৎকার। এ ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক কিছু প্রশ্ন দিয়ে সাক্ষাৎকার গোছানো যেতে পারে, যে বিষয়ের সঙ্গে ওই ব্যক্তি নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট, একে বিশেষ সাক্ষাৎকার হিসেবে অভিহিত করা যায়।

কিন্তু এমনও সাক্ষাৎকার আছে, যে সাক্ষাৎকারের সামনের ব্যক্তিটিকে দেখারই সুযোগ হয় না। অথচ সে সাক্ষাৎকারটি পাঠকের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ, পত্রিকার কাছে গ্রহণযোগ্য খুবই মানসম্মত সাক্ষাৎকার হয়ে যায়। প্রশ্ন উঠতেই পারে-সেটা তাহলে কেমন সাক্ষাৎকার আর কীভাবেই বা সম্ভব?

দেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি লেখাপড়া, গবেষণা ও কর্মের সূত্রে উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে অধিঠিত আছেন। তার কীর্তিময় কর্মকা- সারা বিশ্বে আলোর মতো কৃতিত্বের বিকিরণ ছড়াচ্ছে। বিদেশি গণমাধ্যমে ভেসে উঠছে তার সাফল্যগাথা। দেশি গণমাধ্যমের পাঠকের কাছে তার সাফল্য কাহিনি জানার আগ্রহের শীর্ষে থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দূর দেশে অবস্থান করায় তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রায় অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে স্বল্পমাত্রায় তার সাক্ষাৎকার টেলিফোনে হতে পারে। তবে যেহেতু সময় অনেক এগিয়েছে, আধুনিকতার পথে সেহেতু ই-মেলে ব্যাপকমাত্রার বর্ধিত সাক্ষাৎকার নেওয়া যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ই-মেলই নির্ভরযোগ্য প্রধান মাধ্যমে হয়ে উঠতে পারে। তার সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করে সম্মতি পাওয়া গেলে ই-মেলে সাক্ষাৎকারের অগ্রিম প্রশ্ন পাঠিয়ে দেওয়া যায়। তারপর ব্যস্ত ওই খ্যতিমান মানুষটি সময়-সুযোগে উত্তর তৈরি করে আবার ই-মেইলে পাঠিয়ে দিলেন। এতে হয়ে যায় একটি ভালো বিষয়ের পাঠকপ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার।

এখন শুধু বিদেশি ব্যক্তিত্ব নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনেক গণমাধম্যে সাক্ষাৎকারের অগ্রিম প্রশ্ন পাঠিয়ে দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়ে গেছে। এতে প্রত্যাশিত ব্যক্তি গোছানো উত্তর দেওয়ার কিংবা সাক্ষাৎকারের পূর্বপ্রস্তুতির একটা সময় পান। এতে সাক্ষাৎকারটি আরো সমৃদ্ধ হতে পারে। প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ভেবেচিন্তে সাক্ষাৎকারে উত্তর সংযুক্ত করা যেতে পারে। প্রশ্নের উত্তর গোছাতে যেসব তথ্য ঘাটতি থাকে, সময় হাতে থাকায় ওই সব বিষয় আরো জেনে উত্তরের সঙ্গে সংযোজন করা সহজ হয়। এতে তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকারের চেয়ে ভিন্ন মানের সাক্ষাৎকার পাঠক পড়ার সুযোগ পান। এভাবে বিদেশি কিংবা স্বদেশি ব্যক্তিত্বের ই-মেলে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পন্থা তৈরি হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে একদিকে যেমন সংবাদকর্মীর শ্রমের মাত্রা কমে যায়, অন্যদিকে তেমন পাঠকের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য একটি সাক্ষাৎকার দৃশ্যমানতা লাভ করে।

সাক্ষাৎকার গণমাধ্যমের জন্য একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাক্ষাৎকার না থাকায় যে ঘাটতিÑএটা সংবাদ বা ফিচার দিয়ে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। হয়তো সময়ের ব্যস্ততায় অনেক সংবাদকর্মীর পক্ষে সুচিন্তিত প্রশ্ন নিয়ে কাক্সিক্ষত ব্যক্তিদের মুখোমুখি হওয়া যায় না, কিংবা গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারণী কর্তাদের তেমন নির্দেশনাও থাকে না, ফলে কোনো কোনো গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেখাই যায় না। সাক্ষাৎকারের যে ঘাটতিÑএটা কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে চলাকে কিছুটা হলেও পিছিয়ে দিতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, সাক্ষাৎকার বিষয়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কারো না কারো সজাগ দৃষ্টিসম্পন্ন তদারকির বিশেষ দায়িত্ব থাকা বাঞ্ছনীয়; যিনি বিষয় পরিকল্পনা করবেন প্রতিটি সাক্ষাৎকারের।

লেখক : মিডিয়া বিশ্লেষক, প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সংবাদপত্রের গঠন-বৈচিত্র্য’

"