সংবাদপত্রে ১৯৭০ সালের ভয়াল স্মৃতি

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

অরূপ তালুকদার

আমার এই সুদীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে বিভিন্ন সময়ের কত যে স্মৃতি জমা হয়ে আছে, তার যেন শেষ নেই। কত যে ভালো-মন্দ বড় বড় ঘটনার সাক্ষী আমি, সেসব আজ ইতিহাস। কত সময়ে কত বড় গুণিজনের সান্নিধ্যে সময় কেটেছে, তাদের কথা মনে পড়ে কখনো কখনো। তাদের অনেকেই তো এখন আর নেই, যারা আছেন তাদের অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছেন বিস্মৃতির অতলে।

তবে যুগে যুগে আগে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের অনেক ঘটনার কথা এখনো অনেকে জানতে চান কখনো কৌতূহলবশত অথবা সে বিষয়ে নিজে আরো বিস্তারিত কিছু জানার জন্য, অন্যদের জানানোর জন্যও। আর হয়তো এসব কারণেই নানা বিষয়ে জানার আগ্রহে উৎসুক স্নেহভাজন মনসুরও। সেই ৭০-এর ১২ নভেম্বর দেশের বৃহত্তম ব-দ্বীপ জেলা ভোলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্মরণকালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কথা জানতে চাইলেন। লেখা চাইলেন তার পত্রিকার জন্য। ৭০-এর ১২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ছিল নানা কারণে উল্লেখযোগ্য তথা স্মরণযোগ্য। কারণ, এ ঘটনাটি ছিল যেমন তৎকালীন সময়ে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা, তেমনি ছিল রাজনৈতিক দিক দিয়ে নানাভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ সে সময় সারা দেশের মানুষ ছিল এক উত্তাল রাজনৈতিক পালাবদলের সন্ধিক্ষণে। আমি তখন বরিশালে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রতিনিধি। পাকিস্তান অবজারভার, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ ইত্যাদি পত্রিকার প্রতিনিধি ছিলেন তখন বরিশালে। এ রকম হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিক ছিলেন তখন। এখনকার মতো এত সুযোগ-সুবিধাও ছিল না। সংবাদ পাঠাতে হতো পোস্ট অফিস বা টেলিগ্রাফের মাধ্যমে। ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে বরিশালে থেকে আমরা খুব একটা বুঝতে পারিনি তেমনভাবে। তবে বৃষ্টি হচ্ছিল, বাতাসের জোরও ছিল। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। ১২ নভেম্বর বা তার আগের দিনে এমন কোনো পূর্বাভাস ছিল না, যাতে পরে সুনামির মতো জলোচ্ছ্বাসে সব ভেসে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

ভোলায় তখন তিন-চার দিন ধরে গুমোট অবস্থা চলছিল। মাঝে মাঝে জড়োহাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হচ্ছিল। সাধারণ মানুষ এর মধ্যেই তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিল। সে সময়ের অবস্থা অনুসারে যদিও স্থানীয়ভাবে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তা যে কত তুচ্ছ ছিল, সেটা বোঝা গিয়েছিল সাধারণ মানুষ কতটা অসহায় আর অসচেতন ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়। বাঁচা-মরা বিষয়টা ছিল যেন অনেকটা নিয়তি। ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। না হলে একরাতের প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়! দক্ষিণাঞ্চলের রাক্ষুসী মেঘনার তীরঘেঁষে যেসব গ্রাম ছিল, তার ভেতরে মনুষ্যবসতি পুরোপুরি ল-ভ- হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কিছু বোঝার আগেই প্রায় বিশ ফুট উঁচু হয়ে মেঘনা থেকে উঠে আসা বিপুল জলরাশি একেবারে সব ভেঙেচুড়ে তছনছ করে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে চোখের পলকে।

দিন-দুয়েকের মধ্যেই সারা বিশ্বে ভোলার এই ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের খবর ছড়িয়ে পড়ল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত হলো বিশাল মানবিক বিপর্যয় ও ধ্বংসলীলার খবর।

দুদিন পর আমরা কজন সাংবাদিক গেলাম ভোলায়। আমাকে তার আগের দিন ভোলায় যেতে বলা হয়েছিল অফিস থেকে। ঢাকা থেকে কাউকে পাঠানো হচ্ছে না। আমাদের সঙ্গে যে দুজন যাওয়ার কথা ছিল, সে দুজনও পরের দিন যাওয়ার জন্য রয়ে গেলেন। গেলাম দুজন। আমি আর কাইয়ুম ভাই। অ্যাডভোকেট আবদুল কাইয়ুম তখন পাকিস্তান অবজারভারে কাজ করতেন। খুব ভালো মানুষ। ইংরেজিতে চমৎকার রিপোর্ট লিখতেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তার লেখার টেকনিক অনুসরণ করেই আমি ইংরেজিতে রিপোর্ট লেখা শিখেছিলাম।

১২ তারিখের পর থেকে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সবার মুখে মুখে ফিরছে মেঘনার উপকূল আর সাগরের প্রান্তছুঁয়ে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কথা। হাজার হাজার মানুষ এদিক-ওদিক ছুটছে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজে। তখনো জানা যায়নি কত মানুষ মারা গেছে বা জলের তোড়ে ভেসে গেছে কোথায়, জানা যায়নি কত গরু-মহিষ আর গৃহপালিত প্রাণী মারা গেছে বা হারিয়ে গেছে তীব্র জলের স্রোতে। মানুষের মুখে মুখে তখন সত্য-মিথ্যা নানা কথা ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।

তখন ভোলায় যাওয়ার শুধু লঞ্চই ছিল ভরসা। এখনকার মতো অত বড় যাত্রীবাহী লঞ্চ ছিল না সে সময়। মাঝারি সাইজের দেড়তলা লঞ্চে পাড়ি দিতে হতো বিশাল বিশাল নদী। সে সময়ের মেঘনা ছিল ভয়ংকর আর বিশাল জলরাশির আধার। এখনকার মতো তখন নদীর মধ্যে এখানে-সেখানে চর জেগে ওঠেনি।

কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে দুপুরের বেশ আগেই ভোলায় পৌঁছলাম। সঙ্গে ক্যামেরা আর ফিল্ম। লঞ্চঘাটে পৌঁছে দেখি শহরের ভেতরে যাওয়ার রাস্তায় প্রচ- ভিড়। অন্যান্য স্থান থেকেও দু-তিনখানা যাত্রীবাহী লঞ্চ এসে থেমেছে কিছুক্ষণ আগে। তাতেও প্রচুর মানুষজন এসেছে বলেই মনে হলো। আমরা ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে কিছুদূর যেতেই মনে হলো সামনে অনেক মানুষের জটলা। কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে, অনেকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে অন্যদিকে। এগিয়ে যেতেই একটু পরে কাইয়ুম ভাই আস্তে করে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, আরে, এ দেখি হুজুর! হুজুর মানে!

আমি অবাক হই।

হুজুর মানে ভাসানী হুজুর।

কথা বলতে বলতে মানুষের ভিড় ঠেলে সামনে এগোতে থাকি। আরো কিছুটা গিয়ে দেখি সেই অতিপরিচিত তালের টুপি মাথায় পাঞ্জাবি পরনে মওলানা ভাসানী, যাকে কাইয়ুম ভাই হুজুর বলেন। তিনি কিছুটা দ্রুতপায়ে আসছেন লঞ্চঘাটেরর দিকে। চারপাশের মানুষরাও তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে আর এটা-সেটা কথা বলছে। কিন্তু তিনি কী বলছেন বিড় বিড় করে ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। কাইয়ুম ভাইকে ছাড়িয়ে আমি ভিড় ঠেলে আরো কিছু সামনে গেলাম কী বলছেন তা শোনার জন্য। কাছে যেতেই একটু থামলেন হুজুর, মনে হলো বিদেশি এক সাংবাদিক। তার হাতে বিশাল এক ক্যামেরা। কী যেন জানতে চাইলেন, তাকে দেখেই হুজুর থেমেছেন। বললেন, ‘আমার তাড়াতাড়ি ঢাকা যেতে হবে। হাজার হাজার মানুষ মইরা গেছে। সব ডুইবা গেছে। ভাইসা গেছে। প্রেস কনফারেন্স করন লাগবে, সবাইকে জানাইতে হবে। যারা এখনো জীবিত আছে, ওদের বাঁচানো লাগবে।’ এর মধ্যেই আমি ক্যামেরা ঠিক করে কিছু ছবি তুলে নিলাম। আরো যেন কী সব বলছিলেন তিনি। কন্তিু মানুষের ধাক্কাধাক্কিতে দূরে সরে গেলাম। দাঁড়ালাম একপাশে। কাইয়ুম ভাইকে বললাম, হুজুরের কথা যতটুকু শুনেছি।

বললেন, ঠিক আছে। এটুকু মনে রেখ পরে লাগবে। আমি পকেট থেকে কাগজ বের করে হুজুরের কথা লিখে রাখলাম। পরে রিপোর্টে সবকিছুই যোগ করে দেওয়া হয়েছিল ছবিসহ।

এরপর কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরে এলাম বেশ কিছু জায়গা কখনো হেঁটে, কখনো রিকশায় করে। এ সময় কাইয়ুম ভাইয়ের পরিচিত মাহে আলম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি একটা জিপ গাড়ির ব্যবস্থা করলেন। তাতে আমরা ঘুরে বেড়ালাম অনেক জায়গা। গেলাম দৌলতখান, তজুমদ্দিন, চরফ্যাশনের কিছু কিছু এলাকায়। যেখানে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে সরাসরি। মুন্সীগঞ্জে গিয়ে মেঘনার তীরে দাঁড়ালাম যখন, তখন মনটা যেন গভীর বিষণœতায় ভরে গেল। কারণ এখানে আসার আগে যে ঘণ্টা-তিনেক এখানে-সেখানে ঘুরেছি, সেসব জায়গায় যা দেখেছি তার চেয়েও হৃদয়বিদারক এক দৃশ্যের দেখা পেলাম এখানে এসে, মেঘনার তীরে দাঁড়িয়ে। এখানে আসতে হয়েছে হেঁটে মাটির পথ ধরে। যে পথের দুপাশে সারি দিয়ে গত দুদিনে জানা-অজানা অনেক মৃত মানুষের দাফন হয়েছে। সেই সারি সারি কবরের মাটি এখনো শুকায়নি, কাঁচা রয়েছে। কোথাও দেখলাম ছোট-বড় জলাশয়ে স্তূপাকারে পড়ে আছে মৃতদেহ। তার আশপাশে যতটুকু জল দেখা যাচ্ছে, তার রং হয়ে উঠেছে কালচে সবুজ। সেখান থেকে উৎকট একটা গন্ধ উঠে আশপাশের বাতাস ভারী করে রেখেছে। সেখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যায় না। মাথা ঝিম ঝিম করে ওঠে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

মাথার ওপরে সূর্য যেন আগুন ঢালছে। এমনই তাপ রোদের। চারদিক যেন ঝলসে যাচ্ছে। কিন্তু কোথাও তেমন কোনো শব্দ নেই। শুধু নদীর জল ছোট ছোট ঢেউ তুলে ভেঙে পড়ছে তীরে এসে। তীর বরাবর যতদূর দৃষ্টি যায়, তরঙ্গ ভঙ্গের কলকল ছলছল শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হাওয়ার তেমন দাপটও নেই।

যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে তার উল্টো দিকে মেঘনার ওপারে ডান দিকে অনেক দূরে ধূসর হয়ে যাওয়া জনপদের আবছা ছবি দেখা যাচ্ছে সরল রেখার মতো। লক্ষ্মীপুুর। নদীপাড় থেকে নদীর জল এখন বেশ কিছুটা নিচু দিয়ে বইছে। আমি নদীতীরের একটা উঁচুমতো ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে চারদিক দেখছিলাম। একটু দূরে তীরের মাটি ভেঙে একটু বাঁকের মতো হয়ে আছে। যখন সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন সেই দৃশ্যটা সেখানে ছিল না। এখন একটু লক্ষ করতেই দেখলাম চার-পাঁচটা মৃতদেহ জলের ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছে। বাঁকের ওপাশে থাকার জন্য আগে চোখে পড়েনি। ঢেউয়ের ধাক্কায় আস্তে আস্তে এখন আমাদের চোখের দৃষ্টিসীমায় এসেছে। মানুষের এমন করুণ মৃত্যু আগে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি। একটু লক্ষ করতেই দেখলাম মৃতদেহগুলোর মধ্যে একটি মহিলার দেহও আছে। সে উপুড় হয়ে আছে। তার কোমরে বাঁধা একটি দড়ি। সে দড়ির অপরপ্রান্তে বাঁধা আরেকটি ছোটখাটো কমবয়সী মৃতদেহ। হতে পারে সে মহিলাটির সন্তান। মৃত্যু তাদের দুজনকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। মানুষের জীবনে এই মৃত্যুর কি কোনো সান্ত¦না আছে!

বেশিক্ষণ দেখতে পারলাম না এই দৃশ্য। কাইয়ুম ভাইও দেখছিলেন। একটু পরে আমার দিকে তাকিয়ে আমার হাতটা ধরলেন একবার শক্ত করে। তারপর ছেড়ে দিলেন। আমি পেছনে ফিরলাম। কিছুদূরে একটু ঝোপের মতো। তার পরে বেশ বড় একটা গর্ত। পাশে বিরাট একটা আমগাছ কাত হয়ে রয়েছে। ডালপালাগুলো মাটি ছুঁয়ে আছে। কাইয়ুম ভাই বললেন, এখানে মনে হয় একটা ঘর ছিল। প্রবল স্রোতের টানে নিচের ভিতসহ চলে গেছে জলের সঙ্গে। বেশ কিছুটা দূরে সেই ঘরের বেড়া বা চালার একটা অংশ শিরীষ গাছের সঙ্গে লটকে রয়েছে। গাছটার বাঁ পাশে একটা বাঁশঝাড়, তাতে ঝুলে আছে একটা নীলরঙের ছেঁড়া শার্ট, বেশ উঁচুতে। মানুষটি নেই। সে এখন কোথায় আছে, কে জানে! এদিকে নদীর কাছাকাছি থাকা প্রায় বাড়িঘরেরই এখন আর অস্তিত্ব নেই। আশপাশের খেতখামারে ঝড়ের পরদিন প্রচুর মৃতদেহ পড়েছিল। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল সব ঘুমিয়ে রয়েছে। লক্ষ করলাম, নারকেল বা সুপারি গাছগুলো তখনো দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোর পনেরো-বিশ হাত ওপরে কাদামাখা জলের দাগ। আর অধিকাংশ গাছই যেন একদিকে কাত হয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আরো একটা ব্যাপার লক্ষ করছিলাম বেশ আগে থেকেই। সেটা হলো, আমরা এই পর্যন্ত যে এলাম এর মধ্যে কিছু কাক ছাড়া অন্য কোনো পাখি দেখিনি। গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগিও তেমন দেখলাম না কোথাও। ঘূর্ণিঝড় আর প্রবল জলোচ্ছ্বাসের দাপটে সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। ভোলা ছাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ল-ভ- হয়ে গেছে পটুয়াখালী আর বরগুনার নিম্নাঞ্চল সাগরঘেঁষা পাথরঘাটাসহ আরো কিছু এলাকা।

বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে যেতে হলো লাঞ্চের জন্য। যদিও কিছুটা তাড়া ছিল, তবু গেলাম। আমাদেরও কিছুটা সময় বিশ্রামের দরকার ছিল। আরো কিছু ছবি তোলার জন্যও সময়ের প্রয়োজন ছিল। যদিও ইতোমধ্যে প্রচুর ছবি তুলেছিলাম যেখানে যেখানে গিয়েছিলাম, সব জায়গা থেকে।

লাঞ্চের পর পনেরো-বিশ মিনিট বসলাম। কাইয়ুম ভাই কিসব নোট নিলেন পকেট থেকে ছোট্ট একটা নোটবই বের করে। আমার কাজের ধরনটা একটু আলাদা। আমি প্রয়োজনীয় নোট নেই স্পট থেকেই। পরিবেশ স্থানের বিবরণটা থাকে মাথার মধ্যে ছবির মতো। ওই ছবিটা কখনো মুছে যায় না। এত দিন পরও যেমন ঠিক মনে করতে পারছি, সেই মেঘনা উপকূলের অঞ্চলের বিধ্বস্ত ছবিটা। মেঘনার জলে ভেসে থাকা মৃতদেহগুলোর ফুলে ওঠা চেহারা। ছবিটাও পরিষ্কার মনে পড়ে আমার আর এত দিন পরও চোখ জলে ভরে যায় নিজের অজান্তে। সমস্ত মনপ্রাণ বিষণœতায় ডুবে যায়। ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের অনেক সাংবাদিক পৌঁছে গিয়েছিলেন ভোলায়। আরো আসছিলেন। আজ এখানে এসেই দৌলতখানের রাস্তায় এক বিদেশি মহিলা সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি ছিলেন ফ্রান্সের ‘লা ফিগারো’র প্রতিনিধি। তিনি ভোলার এসডিওকে কোথায় পাওয়া যাবে জানতে চাইছিলেন। সে সময় ভোলায় আসা আরেক ফটো সাংবাদিক গোলাম মাওলা বেশ কিছু সময় ছিলেন আমাদের সঙ্গে। তিনি কাজ করতেন তখনকার দৈনিক পাকিস্তানে।

লাঞ্চের পরে বেশি দেরি না করে চৌধুরী সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় চলে এলাম। রাত হলেও আজকেই বরিশালে ফেরার তাড়া আছে। এর মধ্যেই যা মোটামুটি দেখার দেখা হয়েছে। বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি বিভিন্ন স্থানে। কাইয়ুম ভাই অভিন্ন মানুষ। সব কাজই অতি সহজে করে ফেলছিলেন। প্রফেশনালদের মতোই সব কাজে তিনি দায়িত্ব নিয়ে যেমন করতেন, কথাবার্তাও বলতেন তেমনিভাবে। চিরদিনই কাইয়ুম ভাই আমার কাছে একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ হিসেবে রয়ে গেলেন। পথে কিছুদূর আসতেই দেখলাম অনেক মানুষ নানাভাবে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এদিক-সেদিক যাচ্ছে। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার প্রচেষ্টা দেখে খুব ভালো লাগল।

আগেই বলেছি, ওই সময়টাতে রাজনীতিতেও একটা নতুন মেরূকরণ চলছিল। চলছিল জাতীয় নির্বাচনের তোড়জোড়। তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ তখন তার জন্মস্থান ভোলাতেই ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। সেদিনের সেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্মৃতিচারণা তিনি এভাবে করেছেন। ১৯৭০-এর ১২ নভেম্বর আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে ১০ লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করেছিল। অনেক পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। অনেক পরিবার তাদের আত্মীয়-স্বজন. মা-বাবা, ভাই-বোন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল। প্রতি বছর আমাদের জাতীয় জীবনে যখন ১২ নভেম্বর ফিরে আসে, তখন বেদনাবিদুর সেই দিনটির কথা স্মৃতির পাতায় গভীরভাবে ভেসে ওঠে।

ভোলা থেকে বরিশালে ফিরে এসে দেখি ত্রাণ নিয়ে উপদ্রুত এলাকাগুলোয় যাওয়ার জন্য নানা আয়োজন চলছে সরকারি ও বেসরকারিভাবে। লঞ্চভর্তি ত্রাণসামগ্রী যাচ্ছে ভোলাসহ অন্যান্য স্থানে। বড় বড় কিছু নৌকাও এ কাজে লাগানো হয়েছে।

এদিকে আমাকে যেতে হলো ঢাকায়। অফিস থেকে বলা হলো, ঢাকার অফিসে বসেই প্রতিদিনকার সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। ঢাকায় যাওয়ার আগে তাই আরো কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় বিপর্যস্ত এলাকা ঘুড়ে ছবি নিয়ে নিলাম। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথাবার্তাও বলে নিলাম।

বলা হয়, ৭০-এর ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় দক্ষিণাঞ্চলে বিগত ১০০ বছরেও হয়নি।

১২ নভেম্বরের প্রাকৃতিক বিপর্যয় স্বচক্ষে দেখার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৪ নভেম্বর এসেছিলেন ভোলায়। তারপর তোফায়েল আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, স্বজন হারাদের সান্ত¡না দেন। সর্বত্র ত্রাণকার্য পরিচালনার নির্দেশ দেন।

সবচেয়ে অবাক আর ক্ষোভের বিষয় ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সিপ্লেনে আগমন ভোলায়। তিনি দক্ষিণাঞ্চলে এত বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার ১৪ দিন পর ভোলায় আসেন ২৩ নভেম্বর। তার এই অমানবিক আচরণ দেশ ও বিদেশে নানাভাবে সমালোচিত হয়। তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সর্বক্ষেত্রে। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নির্বাচনও প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ভোলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭টি আসনে পূর্বঘোষিত ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন এক মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।

এমনি আরেকটি ভয়ংকর ঘূর্ণিজড়ে দক্ষিণাঞ্চলের ১৯টি জেলা বিধ্বস্ত হয়েছিল ২০০৭-এর ১৫ নভেম্বর। সে রাতে ঘণ্টায় ২৩০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার গতিতে সিডর আঘাত হেনেছিল দক্ষিণাঞ্চলে। মানুষ মারা গিয়েছেল প্রায় ১০ হাজার। ৭০-এর পর ২০০৭ সালেই ৩৭ বছর পর প্রাণহানির সংখ্যা কমেছে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ও নানা বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্ধার তৎপরতার কারণে।

লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

"