পরিবেশ দূষণরোধ এবং সবুজ অর্থনীতিতে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি ও কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল আর্থ সায়েন্স ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের যৌথ গবেষণায় এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) বা পরিবেশ সূচক-২০১৮-এ ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯তম। ২০১৬ সালে প্রকাশিত তালিকায়ও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৩তম এবং ২০১৪ সালের ১৬৯তম। পরিবেশ সূচকের এমন অবনতি বাংলাদেশের সচেতন মানুষের জন্য খুবই দুশ্চিন্তার কারণ। ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব কোন অঞ্চলে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠবে-এ বিষয়ে এক সমীক্ষায় বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁঁকিতে রয়েছে ১৩ কোটি বাংলাদেশি। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাঝারি ধরনের হটস্পটে রয়েছে বাংলাদেশের প্রায় ১০ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। ভয়াবহ এলাকায় রয়েছে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মানুষের জিডিপি ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমবে। এসব বিষয়ে হরহামেশাই সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে দেশের সব সংবাদমাধ্যমে। পরিবেশ দূষণরোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতির আশঙ্কা এবং সবুজায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিকাশে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোয় সংবাদ, প্রতিবেদন, ফিচার, সাক্ষাৎকার, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়তে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। সাংবাদিক, পরিবেশবিদ, লেখক, কলামিস্ট, গবেষক, পরিবেশকর্মীদের এসব সচেতনতামূলক ভূমিকায় পরিবেশ বিষয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যেও সচেতনতার প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে।

প্রায় এক দশক ধরে আমরা লক্ষ করছি ষড়ঋতুর বাংলাদেশের ঋতু পরিক্রমার ধারাবাহিকতা আর নেই। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত ঋতুচক্রের এমন কথা এখন শুধু পাঠ্যবইয়েই খাটে। আমাদের পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপে এখন আর ঋতুভিত্তিক বাংলাদেশকে ছয় ঋতুর কোনো ঋতুকেই আলাদা করে চেনা যায় না। এখন আর এক ঋতুতে আরেক ঋতুর বৈশিষ্ট্য দেখা দিচ্ছে। দেশে গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। কমে গেছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। শীতে নেই শীতের প্রকোপ। বর্ষায় নেই বৃষ্টি। অথবা কখনো অনাবৃষ্টির কারণে খরা কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হচ্ছে। আবার অসময়ে বন্যা বা আগাম বন্যা, বৃষ্টি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফল। আমরা দেখতে পাচ্ছি-দেশের মানুষ প্রকৃতিবিমুখ হওয়ার কারণে বাড়ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে। পাহাড়ধসে পড়ছে। খরা হচ্ছে, বন্যা হচ্ছে-প্রকৃতির এসব বিরূপ আচরণের জন্য একমাত্র মানুষই দায়ী। আমাদের নদীগুলো মরে গেছে। পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। নদী ও খাল খনন হচ্ছে না। বনের গাছ কেটে আমরা সাবার করে ফেলছি। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও সার প্রয়োগ করে আমরা জমির প্রাকৃতিক উর্বরা শক্তি নষ্ট করছি। কলকারখানা, যানবাহন ও ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, শব্দদূষণ, ট্যানারির বর্জ্য, নগরীর সাধারণ ও শিল্প বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে বিষিয়ে তুলেছে পরিবেশকে।

আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো এখন যথেষ্ট পরিবেশবান্ধব ভূমিকা রাখছে বলেই কৃষক আবহাওয়া-সংক্রান্ত তথ্য অতি দ্রুত জানতে পারছেন। কৃষি তথ্য জানতে পারছেন, যা তাদের চাষাবাদের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, প্রতিরোধ ও সচেতনতা সৃষ্টিতেও সংবাদমাধ্যমগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। দেশে যত দুর্যোগ দেখা দিয়েছে, সংবাদকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য দিয়ে আপডেট রাখছে। দুর্যোগ নিরসনের বা দুর্যোগ প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষ যেসব পদক্ষেপ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের দ্বারা সাধারণ মানুষ সব তথ্য পেয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, প্রতিকার পাচ্ছেন। তারপরও দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশ প্রাকৃতিক এবং মনুষ্য তৈরি দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে আমরা সচেতন না হলে এর পরিণতিও আমাদেরই ভোগ করতে হবে। তারই প্রতিফলন বায়ুদূষণের দিক দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়া ছোট-বড় ৫০টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে। পরিবেশ প্রতিবেশ বিষয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রচারণা প্রশংসনীয়। যদিও এসব কাজের স্বীকৃতি, সম্মাননা, পারিশ্রমিক ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকার তথা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন কোনো ভূমিকা নেই। পরিবেশ প্রতিবেশ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচিত বিষয়গুলোর ওপর একটি আলোকপাত নিচে উল্লেখ করা হলো-

পরিবেশের সুরক্ষা ও সবুজ অর্থনীতি

একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে শতকরা ২৫ ভাগ জমিতে বনভূমি থাকা প্রয়োজন থাকলেও বাংলাদেশে ১০ থেকে ১২ ভাগ বা মোট ২৩ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বনভূমি রয়েছে। বাংলাদেশে গড়ে ২৪ ঘণ্টায় ১ লাখ ৩০ হাজার প্রজাতির গাছ কাটা হচ্ছে। যার বিপরীতে লাগানো হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার গাছের চারা। পরিবেশের সুরক্ষা ও সবুজ অর্থনীতির বিকাশে এটি একটি বড় বাধা। আমরা জানি প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপেক্ষা করে উন্নত সমৃদ্ধ সমাজ, অর্থনীতি, সুন্দর জীবনযাপন সম্ভব না। এই ফর্মুলা/নিয়ম অনুযায়ী পরিবেশের ক্ষতি না করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কার্যক্রমকেই সবুজ অর্থনীতি বলা হচ্ছে। যার মাধ্যমে একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে অর্থনীতি ও পরিবেশের বন্ধন ঘটানো সম্ভব হবে। গ্রিন ইকোনমি বা সবুজ অর্থনীতির জন্য পরিবেশবান্ধব শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের উদ্দেশ্যেই নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

পরিবেশ ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে বৃক্ষ

ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় জানা যায়, একটি গাছ তার ৫০ বছরের জীবনে পৃথিবীর প্রাণিকুলকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকে। কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বায়ুদূষণ রোধ করে ১০ লাখ টাকার। বাতাসে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে বায়ুম-লকে ঠা-া রাখে পাঁচ লাখ টাকার, বাতাসে অক্সিজেন ছাড়ে পাঁচ লাখ টাকার, মাটির ক্ষয় রোধ করে উর্বরতা বাড়ায় পাঁচ লাখ টাকার, পাখি-প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় দেয় পাঁচ লাখ টাকার এবং ফল ও কাঠ দেয় পাঁচ লাখ টাকার। চারা লাগানো থেকে পরিচর্যা, জ্বালানি আহরণ ও আসবাব তৈরির প্রতিটি ক্ষেত্রেই গাছ আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জিডিপিতে গাছের অবদান-সংক্রান্ত সমীক্ষা অনুযায়ী দেশের ২০ লাখ ৫৯ হাজার ৬০৮ পরিবার শুধু গাছ লাগিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। পরিবার পর্যায়ে গাছ থেকে গড়ে ১২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার মূল্য অর্থনীতিতে সংযোজন হচ্ছে। বিবিএসের সমীক্ষা অনুযায়ী পরিবার পর্যায়ে রোপণকৃত ৫৪ শতাংশ গাছপালা থেকে প্রতি বছর গড় উৎপাদনকৃত ১৬ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট কাঠের অর্থ মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। আবার প্রতি বছর ১০ লাখ ৫৮ হাজার বিভিন্ন জাতের উৎপন্ন বাঁশের আর্থিক মূল্য ২ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। বছরে লাকড়ি উৎপন্ন হয় ৫১ লাখ ১১ হাজার ৮৩৫ টন, যার আনুমানিক মূল্য ৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। রাবার উৎপন্ন হয় ১ হাজার ৫৫২ টন, যার মূল্য সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিমাত্রার নাইট্রোজেন, সালফার, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন গ্যাস এবং ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন নিঃসরণ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে একমাত্র বৃক্ষ? ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের উদ্যোগে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সরকারি অফিস, খাসজমি, রাস্তার দুই পাশে, নদীর দুই পারে, রেল সড়কের দুই পাশে এবং উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর গাছ লাগানোর সুযোগ আছে। হাওরে পানিসহিষ্ণু হিজল ও করচগাছ লাগিয়ে বাগ বা জঙ্গল তৈরি করা যেতে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশন, পৌর শহর, উপজেলা বা থানাপর্যায়ে শহরের ভেতরে রাস্তার মাঝখানে ডালপালা কম হয়, উঁচু ও দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগালে পাঁচ বছরে আমাদের শহরগুলোও সবুজ হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে গাছের চারা বিতরণ করা যেতে পারে। বছরে তিনটি করে গাছ লাগালে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনেই এর সুফল ভোগ করবে। এ ক্ষেত্রে চীনের উদ্যোগটি অনুসরণীয় হতে পারে। গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য অনুধাবনের জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চংকিং শহর কর্তৃপক্ষ শহরের শিক্ষার্থীদের গ্রামে পাঠায়। গ্রামে অবস্থানের সময় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককেই ১০০টি করে চারা গাছ রোপণ করতে হয়। তাদের ধারণা-এসব শিক্ষার্থীদের জীবনবোধ হবে মানবীয়, প্রজন্মগত ও ভৌগোলিক দূরত্ব কমানো সম্ভব হবে।

ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে প্লাস্টিক ও পলিথিন

আমাদের পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতার অন্যতম উদাহরণটি হলো-আমরা সচেতনভাবে খালি হাতে বাজারে গিয়ে ৫ থেকে ১০টি পলিথিন ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফিরি। অন্যদিকে আমরা ধারণাও করতে পারি না, সাবান, মুখের ক্রিম, টুথপেস্ট, ডিটারজেন্ট এবং অন্যান্য প্রসাধনী দ্রব্যাদির মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লাস্টিক পরিবেশের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ঢাকা শহরেরই প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হচ্ছে। ডাস্টবিনে ফেলা পলিথিন বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে ঢোকার ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার জন্য ৮০ শতাংশ দায়ী এই পলিথিন ব্যাগ। পলিথিন পোড়ালে বায়ুদূষণ হয়। সমুদ্র দূষণের ভয়াবহতা দিনে দিনে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের চেয়ে বেশি থাকবে প্লাস্টিক। এই ভয়াবহ খবরটি জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম জার্নাল। সংস্থাটি বলছে, প্রত্যেক বছর প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ছে ৪.৮ শতাংশ। জানা গেছে, বর্তমানে ছোট, মাঝারি, বড় ৫ হাজার শিল্প-কারখানায় ১২ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। ভয়ানক খবরটি হচ্ছে-গত ২৮ বছরে বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির ব্যবহার ৮০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)। পরিবেশসচেতনরা বাজেয়াপ্ত প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য জিনিস ফেলে না দিয়ে কী করে এসব ব্যবহার করে সৃজনশীল উপকরণ তৈরি করা যায়, তারই চেষ্টা চালায় ইকোব্রিকস নামক একটি পরিবেশসচেতনতাবাদী প্রতিষ্ঠান। তারা মানুষকে প্লাস্টিক বোতলের মধ্যে নরম প্লাস্টিক বর্জ্য ভরে ব্লক তৈরির জন্য উৎসাহিত করছে। এসব ব্লক দিয়ে ভবন, দেয়াল ও আসবাবপত্র তৈরি করা যায়। ইকোব্রিকস ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ গাইডটি বর্তমানে ফিলিপাইনের আট হাজার স্কুলের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেবল ফিলিপাইন নয়, পরিবেশের প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকাও এরই মধ্যে ইকোব্রিক ব্যবহার শুরু করেছে। এসব বিষয়ের ব্যাপক প্রচার দরকার। মিডিয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিবেশের বিপর্যয় রোধ করবে পাটের পলিথিন

বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুবারক আহমেদ খান ছয় বছরের গবেষণার পর পাট থেকে এমন এক ধরনের পলিমার তৈরি করেছেন, যেটি দেখতে পলিথিনের মতো হলেও সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এই পলিমারের তৈরি ব্যাগ ফেলে দিলে পচে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং তা মাটিতে সারের কাজ করে। সহজলভ্য উপাদান এবং সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এ পলিথিন ব্যাগ বিদেশে রফতানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ সোনালি ব্যাগ আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতি ব্যাগের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা। অধিক পরিমাণ উৎপাদিত হলে দাম প্রতিটি ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে উদ্ভাবক জানিয়েছেন। ড. মুবারক আহমেদকে অভিবাদন।

লাগাতে হবে বজ্র নিরোধক তালগাছ

বজ্রপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ও ঝুঁকি বেড়েছে। এ কারণেই গুরুত্বহীন তালগাছের গুরুত্বও বেড়ে গেছে। কারণ, তালগাছ বজ্র নিরোধক হিসেবে কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, গ্রামগঞ্জে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ ও নারিকেলগাছ থাকলে বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। জনমনে প্রচলিত আছে, আগে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য কোনো বড় গাছের ওপর পড়ত। আর বজ্রপাতের বিদ্যুৎরশ্মি গাছ হয়ে তা মাটিতে চলে যেত। এতে জনমানুষের তেমন ক্ষতি হতো না। ভালো খবরটি হলো বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যেই সরকারি উদ্যোগে ১০ লাখ তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, থাইল্যান্ডে তালগাছ লাগিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনে আবহাওয়ার বিপর্যয়ে প্রকৃতির নির্দয় প্রতিশোধ বজ্রপাত থেকে জানমালের রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আসুন নিজ দায়িত্বে সবাই তালগাছ রোপণ করি।

বাড়াতে হবে পরিবেশবান্ধব পাট চাষ

পাট একটি পরিবেশবান্ধব ফসল। প্রতি হেক্টর পাট ফসল ১০০ দিন সময়ে ১০.৬৬ টন অক্সিজেন নিঃসরণ করে বায়ুম-লকে বিশুদ্ধ ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ রাখে। জ্বালানির বিকল্প হিসেবে পাটকাঠির ব্যবহৃত হওয়ায় বন উজাড়ের হাত পরিবেশ রক্ষা পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কৃষক এক হেক্টর জমিতে পাট চাষ করলে তা মোট ১০০ দিনে ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রকৃতি থেকে শোষণ করে আর ১১ টন অক্সিজেন প্রকৃতির মধ্যে বিলিয়ে দেয়। পাট ফসলের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ক্ষমতা প্রতি বর্গমিটার জায়গায় ০.২৩ থেকে ০.৪৪ মিলিগ্রাম। পাট ফসল ১০০ দিনে হেক্টর প্রতি বাতাস থেকে প্রায় ১৪.৬৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাট ফসল উৎপাদনকালে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন পাটপাতা মাটিতে যোগ হয়। পাটের পাতায় প্রচুর নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম থাকে। এ ছাড়া পাট ফসল কর্তনের পর পাটগাছের গোড়াসহ শিকড় জমিতে থেকে যায়, যা পরে পচে মাটির সঙ্গে মিশে জৈব সারে পরিণত হয়। এতে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের সময় সারের খরচ কম লাগে। পাট জাগ দেওয়ার পর ছালের আঁশ ভিন্ন অন্যান্য নরম পচে যাওয়া অংশ, জাগের ও ধোঁয়ার তলানি এবং পাট পচা পানি উৎকৃষ্ট জৈব সার হিসেবে ব্যবহার যোগ্য। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, পাটের পরিচয় অর্থকরী ফসল হিসেবে হলেও এখন পরিবেশ-সহায়ক হিসেবে পাটের পরিচয় আড়ালে থেকে যাচ্ছে। একজন পাটচাষির পরিবেশ রক্ষায় অবদানের কথা বিবেচনায় আসা দরকার। যিনি পাটের আবাদ করছেন, তিনি নিজেও জানেন না, তিনি কেবলই অর্থকরী ফসল হিসেবে নয়, পরিবেশের সহায়ক অসামান্য অবদান রাখছেন। আমার কাছে মনে হয়, পাটজাত পণ্যের ব্যবহারকে পরিবেশ-সহায়ক হিসেবে সরকার যেভাবে উৎসাহিত করে, সেভাবে যদি পরিবেশবান্ধব ফসল হিসেবে পাটচাষিদের এর ভালো দিকগুলো সম্পর্কে অবহিত করা যেত, তাহলে এই খাতে আমাদের পরিবেশে অবদান যেমন বাড়ত, তেমনি আর্থিক অবদানও অনেক বেড়ে যেত।

আসুন প্রকৃতির বন্ধু হই

মোট কথা, প্রকৃতিবিমুখ হওয়ার কারণে বাড়ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা, মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পারলে এত বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ দূষিত গ্যাস পৃথিবীর বাতাসে ছড়াবে না। সমুদ্রতত্ত্ববিদ জেমস ম্যাককারথি বলেছেন, এ রকম ভয়ংকর খারাপ পরিস্থিতি নিশ্চয়ই তৈরি হবে না। কারণ, আমরা কখনোই এত বোকা হতে পারি না। আমরা নিশ্চই এ রকম বোকামি করব না। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা থেকে প্রকাশিত ‘এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে মানব জীবনে জলবায়ুর প্রভাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-বাংলাদেশের প্রায় ১৩ শতাংশ ভূখ- সমুদ্রে বিলীন হয়ে যেতে পারে। আগামীতে বাংলাদেশে বন্যার প্রভাব ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। গড় তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়লে ২০৮০ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ৬২ সেন্টিমিটার। ফলে সমুদ্র উপকূলের থাকা প্রায় ১৩ শতাংশ ভূখ- বিলীন হয়ে যেতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ শতাংশ ভূমি সমুদ্রে বিলীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তথ্য মতে, বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। গত ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। গবেষকদের ধারণা-২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পানির উচ্চতা আরো বেড়ে যাবে এবং বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়-২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা আরো বৃদ্ধি পাবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে

দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠবে সুপেয় পানি। তাই নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে মানুষ অবশ্যই সচেতন হবে-এমনটাই কাম্য।

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

lekhokmukul@gmail.com

"