মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে বেশি করে জানুক তরুণ প্রজন্ম

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২০, ০০:১৭

সাহাদাৎ রানা

‘স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।’
এটি কবি শামসুর রাহমানের বিখ্যাত ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার শেষের চার লাইন। যে কবিতায় রয়েছে স্বাধীনতাকে লালন করার কথা। এই কবিতার প্রেক্ষাপটে বলা যায়, স্বাধীনতা মানে ইচ্ছার স্বাধীনতা। যেখানে থাকবে রাজনৈতিক ও মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতা। এর ফলে উন্নত-সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক পরিবেশে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে। পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতার অপার আনন্দ। আজ সেই মহান স্বাধীনতা দিবস। বাঙালি জাতির জন্য যা মহত্তম অর্জন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যা অর্জিত হয়েছে। যার সূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাত্রি তথা ২৬ মার্চ। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনার চূড়ান্ত লড়াইয়ের সূচনা। সঙ্গে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূখন্ডের সমন্বয়ে নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ের ইতিহাস। তাই ঠিক এই দিনে আমাদের মনে করিয়ে দেয় একাত্তরের বজ্রকঠিন সংগ্রাম ও বিজয়ের কথা। যার শুরুটা অবশ্য হয়েছিল একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণে। যেখানে তিনি স্পষ্টই ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধুর এমন ঘোষণার পর বাঙালি জাতি জীবন বাজি রেখে করে যুদ্ধ। যার চূড়ান্ত ফল আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা।
পৃথিবীর ইতিহাসে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, প্রতিটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে একজন বড়মাপের নেতার সন্ধান পাওয়া যায়। যাদের নেতৃত্বে সেই দেশ স্বাধীন বা প্রতিষ্ঠিত হয়। উদাহরণ হিসেবে আমেরিকায় যেমন ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। লেনিন ছিলেন রাশিয়ার। চীনের ছিলেন মাও সেতুং। আর আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। যারা নিজ নিজ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। তেমনি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ কারণে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জাতির পিতা আর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। যার অদম্য প্রচেষ্টায় আমরা পেয়েছি আমাদের সোনার বাংলা, প্রিয় মাতৃভূমি। যিনি জন্ম দিয়েছেন একটি রাষ্ট্রের।
বাঙালি জাতির রয়েছে হাজার বছরের গৌরবের ইতিহাস। যে ইতিহাস পৃথিবীর হাতে গোনা দু-একটি দেশের ভাগ্যে জোটে। সব দেশের নেই আমাদের মতো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাস। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করে শত্রুকে পরাজিত করে দেশ স্বাধীন করার ইতিহাস। আমাদের সেই গৌরবের ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাসের হাত ধরে আজ বিশ^ মানচিত্রের বুকে আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের রয়েছে লাল-সবুজের পতাকা। যে স্বাধীন রাষ্ট্র ও মানচিত্রের জন্য আমাদের দিতে হয়েছে ৩০ লাখ শহিদের বুকের তাজা রক্ত। সঙ্গে লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি। আর সঙ্গে কয়েক কোটি মানুষের সীমাহীন আত্মত্যাগ। এর বিনিময়ে দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে পরাজিত করে তবেই ১৬ ডিসেম্বর ছিনিয়ে এনেছি বিজয়। যে বিজয়ের মহানায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার নাম। কারণ এই পৃথিবীর মানচিত্রে যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, থাকবে বাঙালি জাতি। এটাই আমাদের কাছে শ্রেষ্ঠ গৌরবের অধ্যায়। যে অধ্যায়ে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ গঠনে কাজ করতে হবে, নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে। আর সেই কাজটা আগামীতে করতে হবে তরুণ প্রজন্মকে। কারণ তারাই হবেন দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাদের নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে দেশ। তাই তরুণ প্রজন্মকে জানাতে হবে আমাদের দেশের জন্ম ইতিহাসের কথা। মুক্তিযুদ্ধের কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা। তরুণ প্রজন্ম যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আগামীতে দেশের দায়িত্ব নিতে পারেন তাদের সেভাবে তৈরি করার সেই দায়িত্ব এখন আমাদের। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তাদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। বেশি করে তাদের শোনাতে হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এ কথা বলার কারণ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এখন ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে আগ্রহ কম। তাদের মধ্যে সেই আগ্রহ বাড়াতে হবে। অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জানার ক্ষেত্র অনেক প্রশস্থ হলেও তারা শুধু এখন যেন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মুক্তিযুদ্ধকে জানার বিষয়ে কিছুটা আগ্রহ কম। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমাদের বড়দেরও দায় রয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার দায়িত্ব অভিভাবক থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের। সঙ্গে সচেতন সব নাগরিকের।
তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখিত বই, মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র, নাটক, প্রবন্ধ আরো বেশি করে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে স্বাধীনতার জন্য আমাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। প্রাণ দিয়েছেন ৩০ লাখ মানুষ। যেখানে ছিল শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কৃষক, শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের অবদানের ফসল স্বাধীনতা, আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এখন তরুণ প্রজন্মের সামনে এসব ইতিহাস তুলে ধরার দায়িত্ব ও কর্তব্য সবারই। বিশেষ করে অভিভাবকদের। কিন্তু আমরা সেই দায়িত্ব কতটুকু পালন করছি, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। কারণ তরুণ প্রজন্ম সেভাবে জানছে না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। হয়তো কেউ কেউ দায়িত্ব পালন করছেন, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিছুটা ঘাটতি রয়েছে এ ক্ষেত্রে। এটা অপ্রিয় হলেও সত্য। এই ব্যর্থতার দায় যদি তরুণ প্রজন্ম আগামীতে আমাদের ওপর দেয়, তবে কি খুব এটা ভুল হবে। তাই এখন আমাদের দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো আমাদের বাঙালি জাতির আজন্ম লালিত স্বপ্ন। যে স্বপ্ন দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে অনেক কিছুর বিনিময়ে অর্জিত। তাই এ চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সবার নিজ নিজ জায়গা থেকে আরো কাজ করতে হবে। সঠিক ইতিহাস জানিয়ে, তরুণ প্রজন্মের চেতনাকে আরো শানিত করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালোবাসা বাড়ানোর তাগিদ দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের সেই প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। কারণ মুক্তিযোদ্ধারা তাদের নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন দেশের জন্য।
তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আরো বেশি করে জানাতে হলে এর জন্য কিছু উদ্যোগ নিতে হবে আমাদের। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প, উপন্যাস ও কবিতার বই উপহার দিতে হবে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে; সে বিষয়টি নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে বারবার তুলে ধরতে হবে। এখানে লেখকদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন তাদের আরো বেশি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও নাটক লিখতে হবে। গবেষকদের উচিত গবেষণা করে মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক না জানা ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরা। এখানে প্রকাশকদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। তাদের দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধের ওপর আরো বেশি করে বই প্রকাশ করা। বিশেষ করে শিশুদের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ওপর বেশি করে বই প্রকাশ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বইয়ের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। প্রতি মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতা, চিত্রাঙ্কন, রচনা, উপস্থিত বক্তৃতা, সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। এখনো এমন প্রতিযোগিতা অনেক প্রতিষ্ঠানে হয়। তবে তা শুধু স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এখন স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের পাশাপাশি সারা বছরই শিক্ষার্থীদের জন্য এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরো অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। সারা বছর বিশেষ করে প্রতি মাসে যদি এমন শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা সম্ভব হয়, তবে মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি হবে। সবাই বেশি করে জানতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। জানতে পারব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে। এসব ইতিহাস জেনে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলতে পারবে নতুন প্রজন্ম।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুই আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরো ব্যাপক। দেশের প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্মেষ ঘটে, তবে দেশ তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। উপকৃত হবে নতুন প্রজন্ম ও তরুণ সমাজ। তাই আর সময় নষ্ট না করে তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে আমাদের এখনই কাজ শুরু করা উচিত। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শানিত হবে তরুণ প্রজন্ম। একটি গতিশীল জাতি তৈরি হবে। যে জাতির স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর কিছুদিন পর আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্যাপন করব। এখন সেই লক্ষ্যে আমাদের সবার কাজ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে তৈরি করতে তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। সবাইকে জানাতে হবে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে, বঙ্গবন্ধুর šত্মত্যাগ সম্পর্কে। তবেই সম্ভব বিশে^র বুকে আগামীতে প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। তরুণদের মধ্যে সেই চেতনাই জাগ্রত করতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়, ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে সব নাগরিকের। স্বাধীনতা দিবসে এটাই হোক সবার অঙ্গীকার।
    লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট