সড়কে অবৈধ ট্রলি-ট্রাক্টরের অবাধ বিচরণ : আতঙ্কে জনসাধারণ

প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা নীরব প্রশাসন

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

আব্দুর রহমান রাসেল, রংপুর ব্যুরো

রংপুর অঞ্চলে অবৈধ ইট, বালু, মাটি বহনকারী ট্রলি ও ট্রাক্টরের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। বেপরোয়া গতিতে চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে অকালে ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। কাউকে আবার সারা জীবনের মতো বরণ করতে হচ্ছে পঙ্গুত্ব। ফলে জনসাধারণ সার্বক্ষণিক আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। কিন্তু চোখের সামনে অবৈধ এই যানের অবাধ চলাচল দেখেও অদৃশ্য কারণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না পুলিশ প্রশাসন। ফলে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে। 
জানা যায়, দেশের কৃষি উন্নয়ন তথা চাষবাসের কাজে ব্যবহার করার জন্যই সরকার বিদেশ থেকে ট্রাক্টর আমদানি করার অনুমতি দেয়। কিন্তু চাষবাসের জন্য আমদানিকৃত এই ট্রাক্টর অবৈধ ট্রলি-ট্রাক বা নানা পরিবহনে রূপান্তরিত হয়ে মানুষের সর্বনাশ ঘটাতে শুরু করেছে। আবাদি জমি ছেড়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে গ্রামাঞ্চল, শহর ও বাজার কেন্দ্রিক সড়কগুলোতে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন না হওয়ায় শিশু-কিশোররাও অদক্ষভাবে এসব ট্রাক্টর অবাধে চালাবার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। 
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিটরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় গত বছর মহাসড়কে ছোট-বড় প্রায় সাড়ে তিন হাজার দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে করে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৬২ জন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন হাজারো মানুষ। বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই আছে অবৈধ যান। যার মধ্যে অন্যতম বেপরোয়া গতির এই ট্রাক্টর। 
এ দিকে, বেপরোয়া গতি ও কানফাটা আওয়াজে চলাচলকারী এসব ট্রাক্টরের কারণে শহরের পাশাপাশি গ্রামগুলোতে ব্যাপকভাবে পরিবেশ দূষণ দেখা দিয়েছে। শব্দ ও বায়ু দূষণ এখন গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে দিয়েছে এসব ট্রাক্টর ও ট্রলি। এ ছাড়া এই যানের বিশাল আকৃতির চাকার কারণে রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পাকা রাস্তার পেভমেন্ট ভেঙে যাচ্ছে। চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছে ইটের রাস্তা। গ্রামের মেঠো পথগুলোর মাটি আলগা হয়ে জমিতে মিশে যাচ্ছে। বিলীন হতে শুরু করেছে মেঠো পথগুলো। সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তাঘাট বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক দিক। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির আমদানিকারক অবাধে আমদানি করে ট্রাক্টর। আমদানিকারকরা এসব ট্রাক্টর বিক্রি করে ইটভাটার মালিক, মাটি ও বালু ব্যবসায়ী, কাঠ ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকসহ সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছে। ট্রাক্টর ও এর ড্রাইভারের জন্য কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন না হওয়ায় সহজেই এসব পরিবহন কিনে আনে ব্যবসায়ীরা। তারা এসব ট্রাক্টর কিনে কৃষি কাজের পরিবর্তে ব্যবহার করছে পরিবহন কাজে। ফলে গ্রামগঞ্জ ও শহরে ট্রাক্টরের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়ও তার ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। অবৈধ এই ট্রলি-ট্রাক্টরের প্রকৃত সংখ্যা কত সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কারও কাছে কোনো তথ্য নেই। ট্রলি-ট্রাক্টরের ভয়ে রাস্তা-ঘাটে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে চলাচল করছে মানুষ। সড়কে এই অবৈধ যান চলাচল বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। 
এ দিকে অভিযোগ রয়েছে, হাইওয়ে পুলিশসহ থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে এসব ট্রলি-ট্রাক্টর সড়কে চলাচল করার কারণে জনসাধারণের প্রতিরোধের মুখেও তা বন্ধ হচ্ছে না। 
বেশ কিছু ট্রাক্টর মালিকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের মাসোহারা দিয়েই এসব ট্রলি-ট্রাক্টর সড়ক-মহাসড়কে চালাচ্ছেন তারা। 
জানতে চাইলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করা সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর রংপুরের সভাপতি ডা. জিল্লুর রাব্বি বলেন, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দুটিই মাঠে কৃষিকাজের জন্য অনুমোদিত, সড়ক-মহাসড়কে চলাচল কিংবা পণ্যসামগ্রী বহনের অনুমতি নেই। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এ যানটি সড়কে চলাচল করছে। এটা খুবই বিপজ্জনক। এদের বেশিরভাগেরই লাইসেন্স নেই। অথচ প্রতিটি ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের লাইসেন্স প্রয়োজন। এ ছাড়া ট্রাক্টর চালকদেরও নেই কোনো প্রশিক্ষণ। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ অবৈধ যানবাহন। 
সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) রংপুর জেলা কার্যালয়ের নিবার্হী প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, সড়কে বেআইনিভাবে ট্রাক্টর চলাচল করছে। সড়ক নিরাপত্তার জন্য এসব অবৈধ যানের চলাচল প্রতিরোধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। 
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর রংপুরের সহকারী পরিচালক আবদুল কুদ্দুস জানান, সড়কে ট্রাক্টর চলাচল প্রতিরোধ করতে মাঝে মধ্যেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চাইবেন তারা। 
বড়দরগা হাইওয়ে পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, অবৈধ এ যানের চলাচল প্রতিরোধে প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যারা ধরা পড়ছেন তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। 
রংপুর কোতয়ালী থানার ওসি বাবুল মিঞা বলেন, সড়কে বেআইনিভাবে চলাচলকারী ট্রাক্টরের মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রকৃতপক্ষে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা ট্রাফিক বিভাগের কাজ। এ সংক্রান্ত বিষয়ে তারাই ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। থানা পুলিশকে সীমিত ম্যান পাওয়ার দিয়ে ক্রাইম, রিটেকশন, প্রটেকশন, প্রোটকল, মামলা তদন্তসহ অনেক রকম কাজ করতে হয়। এরপরেও এডিশনাল কাজ হিসেবে আমরা তাদের দায়িত্ব পালন করছি।
রংপুর জেলা ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ খান মিজানুর ফাহিমী বলেন, সড়ক নিরাপত্তার জন্য এসব অবৈধ যানের চলাচল প্রতিরোধে আমরা বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। যারা ধরা পড়ছেন তাদের যান আটকে রাখা ও জরিমানা করাসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 
রংপুর জেলা প্রশাসক এনামুল হাবিব বলেন, ট্রাক্টরের সড়ক-মহাসড়কে চলাচল কিংবা পণ্যসামগ্রী বহনের অনুমতি নেই। তারপরেও অবৈধভাবে এসব যান সড়কে চলাচল করছে। এদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে জেলা প্রশাসন।