বিশ্লেষণ

অস্তিত্ব সংকটে মানবতা

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৮, ০১:১২

রায়হান আহমেদ তপাদার

পাশ্চাত্য দেশে মানবতাবাদের সপক্ষে কতই না যুক্তি উত্থাপিত হয়। মানবতাবাদ বিশেষ একটা আদর্শ, মানুষকে মানুষের কাছে টেনে এনে অধিকার সংরক্ষণে সহায়তা করে। ভালোবাসা, শত্রুতা নয় ভালোবাসাই সব বিভেদ অতিক্রম করে। আজ পাশ্চাত্যের এই মহান মানবতার আদর্শ নিভৃতে কেঁদে মরছে গাজার প্রতিটি ঘরে। ইসরাইলি সৈন্য তাদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছে, বোমা ফেলে বাড়িঘর ধ্বংস করে দিয়েছে। ছিন্নমূল মানুষ রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে খালি হাতে, শিশুর মৃত্যুতে মা-বাবা বুক চাপড়ে শোক করছে। অন্তঃসত্ত্বা মহিলা প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে, হাসপাতালে বোমা ফেলা হচ্ছে আহত মানুষের ওপর। এই কি মানবতার দৃষ্টান্ত? প্রতিদিন নিরীহ মানুষ হত্যা কোনো মানবতার ধম নয়। মানবতা এখন গাজার প্রতি ঘরে, প্রতি গলিতে কেঁদে মরছে। আজ সময় এসেছে অভিধান থেকে মানবতা শব্দটি একেবারে মুছে ফেলার অথবা অর্থ দেওয়া : মানবতা বাদের অর্থ হলো নিরপরাধ নারী-শিশু ও পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে পদদলিত করা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধের বিরুদ্ধে ইউরোপ ও এশিয়াবাসীর যে মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল, বর্তমানে ইউরোপে তার বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও এশিয়া ও আফ্রিকার দিকে দৃষ্টিক্ষেপণ প্রয়োজন। আর যুদ্ধ নয়, এখন প্রয়োজন জাতিগত ও জ্ঞাতিগত শান্তি। এ মনোভাব দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও আমেরিকাকে সামনে অগ্রসর হতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ও গাজায় জাতিগত শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আরব বিশ্বের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য দূর করার সময় এসেছে অন্যায়কে প্রতিহত করার প্রয়োজনে। আর কত দিন অসহায় নিরস্ত্র মানুষ অস্ত্রধারীদের হাতে জিম্মি হয়ে জীবনদান করবে? মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়, প্রয়োজন আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মানসিকতা। মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট অশান্তি নতুন নয়।

প্রতি বছর বিশেষ বিশেষ সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তপাত ঘটে। ব্যক্তি বা রাষ্ট্রিক স্বার্থ বিসর্জন নয়। তবে এ ক্ষেত্রে অন্যের স্বার্থও বিবেচনার বাইরে নয়। ইসরাইল প্রতিদিন গাজায় সর্বাত্মক আক্রমণ করে মানুষ হত্যা করবে আর বিশ্ববাসী নিশ্চুপ হয়ে থাকবে এ তো বিশ্ববিবেকের ধর্ম নয়। মানুষের মধ্যে মানুষই অশান্তি আর বিভেদ সৃষ্টি করেছে, সে জন্য এ অন্তরায় দূর করার দায়িত্ব মানবসমাজেরই একটি জাতি ধ্বংস করে নিজেদের উত্থান সম্ভব, কিন্তু মৃত জাতির অভিশাপও তাদের সর্বাঙ্গে ঘিরে থাকবে, যা কোনো জাতির জন্যই সুখকর হতে পারে না। ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ইসরাইল থাকবে, কিন্তু ফিলিস্তিন ও অন্যদেরও নিজেদের অঞ্চলে প্রতিষ্ঠার অধিকার দিতে হবে। বিশ্বশক্তি এ দিকটি অনুভব করতে সক্ষম না হলে একদিন তাদের ওপরও ঝড়ের আঘাত পড়বে না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।

সমৃদ্ধি ও খ্যাতি লাভ করে। সর্বশেষ অবলম্বন যখন শেষ হয়ে যায় তখন তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ন্যায়-অন্যায়ের ফারাক সে বুঝতে পারে না। না পারাটাই স্বাভাবিক। সত্য সমাগত এর পরিবর্তে সমাজে মিথ্যা সমাগত সেøাগান উচ্চারিত হয়ে তখন এমনটিই হয়। অন্তত সর্বশেষ একটা অবলম্বন যদি কারো থাকে তাহলে সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করে। একটি দেশের একজন নাগরিকের এ সর্বশেষ অবলম্বন হলো বিচারের অধিকার। সে যখন সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে চরমভাবে অবহেলিত হয়; তখন তার অধিকার নিশ্চিত করে কেবলমাত্র বিচার বিভাগ। পশ্চিমারা আমাদের শান্তি ও সৌহার্দ্যরে কথা বলে কিন্তু এতদঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির নীলনকশা তাদেরই। বন্ধু সেজে সেবার নামে আমাদের প্রভু হিসেবে শাসন করাই মূলত খায়েশ। এ খায়েশ পূরণ করতে গিয়েই সরকার তাদের প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে ব্যস্ত। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে চলছে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা। এসব কিসের লক্ষণ? প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ইউরোপের যে ক্ষতি হয়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তা শত গুণ বেড়ে যায়। আলোচ্য সময়ে শুধু ইউরোপ নয়, এশিয়ার কয়েকটি দেশও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে নিজেদের সরিয়ে আনে। মানুষের জীবনে রাজনৈতিক বিভাজনের চেয়ে শান্তি যে কত প্রয়োজনীয় তা বিংশ শতকের মানুষ উপলব্ধি করতে ভুল করেনি। এ কারণে বিভক্ত জার্মানির দুই অংশ আবার একত্র হয়। ইউরোপে শান্তিছায়া বিস্তার করলেও পাশ্চাত্য শক্তি এশিয়ার বুকে শান্তি বিস্তৃত করতে দেয়নি নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিলিপ্সার কারণে। এ কারণে ভিয়েতনাম দ্বিখ-িত হয়েছে, কোরিয়া দ্বিখ-িত হয়েছে। একীভূত জার্মানির মতো এ দুটো দেশ আদৌ একত্র হবে কি নাÑতা ইতিহাসনির্ভর।

একসময় আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই সমশক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণে দুটি দেশই ইউরোপ ও এশিয়ায় প্রভুত্ব বিস্তার করে। সম্ভবত, ইউরোপের সব রাষ্ট্র নিয়ে একটা অভিন্ন সংস্থা গড়ার পরিকল্পনার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে বিকেন্দ্রীকরণ করা হতে পারে। এর ফলে আমেরিকার একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ আরো উন্মুক্ত হয়। আমাদের সবার সেøাগান হবে, মানবতার হবে জয়, মানবতা লঙ্ঘন করে নয়। এই লক্ষ্যেই আমাদের সমাজের সর্বস্তরের সবাইকে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আজ বিশ্বব্যাপী সর্বত্রই মানবতার লঙ্ঘন হচ্ছে, প্রতিনিয়তই ঘটছে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মানবতাবিরোধী কর্মকা-। শুধু যুদ্ধই মানবতাকে আক্রান্ত করেনি, আমাদের সমাজের সমাজপতিরাসহ সর্বস্তরের মানুষের দ্বারাও কোনো না কোনোভাবে মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে। আর এই মানবতা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন, মানবতাবোধের ধারকরা থেকে শুরু করে ছোট থেকে বড় কিংবা ক্ষমতাশালী থেকে নিঃস্ব সবাই। যে যার অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব, মানবতার পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা এখনো আশাবাদী বিশ্বব্যাপী মানবতাবিরোধী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে যারা কাজ করেন, তাদের সঙ্গে একত্র হয়ে বা সবাই একসঙ্গে কাজ করলে, হয়তো এভাবেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানবতা লঙ্ঘন কমে আসবে। এ ক্ষেত্রে তাদের হস্তক্ষেপ কিংবা মানবতার পক্ষে শুভ কামনার দিকে আজ তাকিয়ে আছে বিশ্বমানবতা। উদাহরণস্বরূপ, একসময় আমাদের দেশে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ছিল। সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা কিংবা মানবতাবিরোধী কোনো কর্মকা- সংগঠিত হলে, পঞ্চায়েতরাই তার সমাধান দিতেন এবং আবার যেন এ ধরনের কোনো মানবতাবিরোধী কর্মকা- না ঘটে তার ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু যখন পঞ্চায়েতের ওপরই মানবতাবিরোধী কর্মকা- সংগঠিত হয়, তখন!

আমরা যদি সারা বিশ্বকে একটি সমাজ ধরি, আর এ সমাজের একজন পঞ্চায়েত হচ্ছে ফ্রান্স। আর এ পঞ্চায়েতের ঘরেই যদি উলঙ্গভাবে হামলা হয়, তাহলে কালকের পৃথিবীর কী হবে? আমরা যে আশা বুকে বেঁধে আছি, বিশ্বের এই অস্থিতিশীল অবস্থার সমাধান এই পঞ্চায়েতরাই করবে, তারই বা কী হবে? অতএব, আমরা এখনো আশা ছাড়িনি বিশ্বব্যাপী মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকায় যে প্রতি মুহূর্তে মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে, তার একটা সমাধান ইচ্ছা করলে তথাকথিত বিশ্ব পঞ্চায়েতরাই দিতে পারে। তারাই হয়তো একদিন তার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। হয়তো আল্লাহর সহায়তায় পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসবে। আমরা দেখছি প্রতিনিয়তই সর্বত্র মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে, তাই বলে তার প্রতিবাদ হিসেবে আমরা আরেকটা মানবতাবিরোধী কর্মকা-ে জড়িত হতে পারি না। তাতে মানবতা রক্ষা না হয়ে মানবতার বিপর্যয়ই আসে। তাই মানবতার কথা যারা ভাবেন, যারা মানবতার কর্মী, তাদের কাছে আমাদের কামনা মানবতার লঙ্ঘন সম্পর্কে এমন কিছু লেখেন, যাতে মানবতাবিরোধী কর্মকা-ে জড়িতরা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে মানবতাবিরোধী কর্মকা- থেকে সরে আসে। অন্যদিকে পত্রপত্রিকা কিংবা কোনো সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের কোনো লেখা কিংবা মন্তব্য করা আমাদের উচিত নয়, যার কারণে মানবতার কর্মীরা উচ্ছৃঙ্খল কিংবা উগ্র হয়ে আরেকটা মানবতাবিরোধী কর্মকা-ে জড়িত হতে উৎসাহিত করে। সৃষ্টিকর্তার এ মাটিতে এমন কোনো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সাহসী শক্তি নেই যে, এ অসহায় জনগোষ্ঠীর সাহায্যে এগিয়ে আসবে; অত্যাচারী দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করার জন্য, তাদের রক্ষার জন্য নেই কোনো সাহসী ভীমসেন? তাদের রক্ষায় অত্যাচারী নব্য রডরিক্সের উপযুক্ত শাস্তি দিতে নেই কোনো তরুণ তারেক বিন জিয়াদ। আজ নেই কোনো ৭১-এর যিশু তথা সঙ্গীন হাতে বীর বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা, যারা জীবন বাজি রেখে শায়েস্তা করতে পারে আজকের অত্যাচারী মিয়ানমারের নব্য খান সেনাদের। এই অবহেলিত মানবগোষ্ঠী জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে যেখানেই পালিয়েছে, একটু আশ্রয়ের খোঁজে সেখানেই তাদের বাঁধা পড়তে হয় নতুন শৃঙ্খলে, কারণ ওরা পরিচয়হীন মানব। এই হতভাগ্য, অত্যাচারিত মানবের একটি পরিচয় বিপন্ন, বিধ্বস্ত সে রোহিঙ্গা, সে রোহিঙ্গা মায়ের সন্তান, তাই সে আজ অসহায় রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। কথিত সন্ত্রাসের শেষ শিকড়টি উপড়ে ফেলা তথা আরাকানকে বাঙালিমুক্ত করার হুঙ্কার দিয়েছেন ক্ষমতালিপ্সায় অন্ধ, উগ্র এক নারী নেত্রী। তার সামরিক বাহিনীর বহু দিনের লালিত স্বপ্ন আজ পূরণের পথে কসোভো ও বসনিয়ার মতো মুসলিমসহ বাঙালিমুক্ত করে আরাকানে বিজয় উৎসব করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সু চি ও তার সামরিক বাহিনী।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

rahihan567@yahooh.com

"