রাশিয়া বিশ্বকাপের সাতকাহন

প্রকাশ | ১৮ জুলাই ২০১৮, ০৯:৫৫ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০১৮, ১২:৩৮

অনলাইন ডেস্ক

শেষ হয়ে গেল ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপ। ভাঙলো মিলনমেলা। আতশবাজির ঝলকানি আর জমকালো সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নিয়েছে ফ্রান্স। আগামী চার বছর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গর্ব করতে পারবে ফরাসিরা। অন্যদিকে আক্ষেপে পুড়বে ক্রোয়েশিয়া। প্রথমবারের মতো ফাইনালে এসে নিঃশ্বাস দূরত্বে থাকা শিরোপাটিকে বগলদাবা করতে পারল না তারা। তবে রাশিয়া বিশ্বকাপ শেষ হলেও তার রেশ থাকবে আরো কিছুদিন। কিছু কিছু স্মৃতি ও ঘটনা হয়ে থাকবে কালের সাক্ষী, ইতিহাসের সাক্ষী। তেমন কিছু ঘটনা নিয়েই বিশ্বকাপের সাতকাহন। লিখেছেন আমির হোসেন

 

ফ্রান্সের দ্বিতীয় শিরোপা জয় : বিশ্বকাপের ইতিহাসে তৃতীয় দল হিসেবে দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের স্বাদ পেল ফরাসিরা। তাদের আগে উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের দুটি শিরোপা জিতেছিল। প্রথমবারের মতো ফাইনালে আসা ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত তারা ছিল অপরাজিত। তরুণ তুর্কি কিলিয়ান এমবাপ্পে নজড় কেড়েছেন ফুটবল বিশে^র। অ্যান্তনিও গ্রিজমান জানান দিয়েছেন তার সামর্থের। উমতিতি, পাভার্ড, ভারানেরাও ঝান্ডা উড়িয়েছেন ফরাসি ফুটবলের। তাদের পারফরম্যান্সে ভর করে ২০ বছর পর বহুল কাক্সিক্ষত শিরোপা ঘরে তোলে ফ্রান্স।

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) : এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয় ভিএআর তথা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি। সামান্য কিছু বিতর্ক ছাড়া বলতে গেলে সফলতাই পেয়েছে এই প্রযুক্তি। রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রথম দল হিসেবে ভিএআর ব্যবহার করে পেনাল্টি পেয়েছিল ফ্রান্স। আর ফাইনালেও তারা শেষবারের মতো ভিএআর ব্যবহার করে পেনাল্টি পেয়েছে। এই ভিএআরের কারণে রাশিয়া বিশ্বকাপ দেখেছে হলুদ কার্ডের ছড়াছড়ি। পেনাল্টির ছড়াছাড়ি। এবারের বিশ্বকাপ ২১৯টি হলুদ কার্ড দেখেছে। পেনাল্টি দেখেছে রেকর্ড ২৯টি। পেনাল্টি থেকে গোল হয়েছে ২২টি!

ফেভারিটদের গড়পড়তা হোঁচট : এবারের বিশ্বকাপের ফেভারিটদের তালিকায় ছিল জার্মানি, আর্জেন্টিনা, স্পেন, পর্তুগাল ও ব্রাজিলের নাম। কিন্তু তাদের কেউই কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পেরুতে পারেনি। ২০১৪ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি গ্রুপ পর্বে মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় প্রথম রাউন্ড থেকেই। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও স্পেন গ্রুপ পর্ব পেরুতে পারলেও শেষ ষোলোর বৈতরণী পেরুতে পারেনি। আর্জেন্টিনা ৪-৩ গোলে ফ্রান্সের কাছে হেরে, রোনালদোর পর্তুগাল উরুগুয়ের কাছে ও স্পেন স্বাগতিক রাশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয়। ব্রাজিল শেষ ষোলো পেরুতে পারলেও কোয়ার্টার ফাইনালের বেশি যেতে পারেনি। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। এর মধ্য দিয়ে ফেভারিট দলগুলোর স্বপ্নভঙ্গ হয়। বিদায় নেয় মেসি, রোনালদো ও নেইমারের মতো বড় তারকারা।

মেসি-রোনালদোর অধরা শিরোপা : বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে রাশিয়া এসেছিলেন বর্তমান বিশে^র সেরা দুই ফুটবলার লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। রোনালদো প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে দুর্দান্ত শুরু করলেও শেষ ষোলোর বেশি যেতে পারেননি। ফলে তার মতো একজন বড় মাপের তারকা এবারও শিরোপা না জিতেই ফিরেছেন। অবশ্য তিনি একটি হ্যাটট্রিকসহ চারটি গোল করেছেন। তবে নক-আউট পর্বে গোল না পাওয়ার রেকর্ড আরো প্রলম্বিত করেছেন (৫১৪ মিনিট)। একইভাবে লিওনেল মেসি আবারও শিরোপাবঞ্চিত হয়ে দেশে ফিরেছেন। অনেক কষ্টে-শিষ্টে মেসির আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব পার হলেও শেষ ষোলোতেই থেমে গেছে তাদের বিশ্বকাপ মিশন। মেসি আবারও নক-আউট পর্বে গোল পাননি। এ নিয়ে ৭৬০ মিনিট তিনি বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে গোলবঞ্চিত থাকলেন ভিন গ্রহের এই ফুটবলার।

মহাবিস্ময় ক্রোয়েশিয়া ও রাশিয়ার চমক : সদ্য বিশ্বকাপের মহাবিস্ময় ছিল ক্রোয়েশিয়া। প্রথমবারের মতো স্বপ্নের ফাইনালে উঠে গেছে ক্রোটরা। মডরিচ-রাকিটিচদের নিয়ে গড়া সোনালি প্রজন্ম দেশকে উপহার দিয়েছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাদের সাফল্য। কিন্তু শেষ অবধি রূপকথার আসরের মধুর সমাপ্তি হয়নি ক্রোটদের। ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ৪-২ গোলে হেরে রানার্সআপ হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকতে তাদের। এই বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন গ্যালারিতে থাকা দেশটির প্রেসিডেন্ট কলিন্দা গ্রাবার কিতারোভিচ। আসরে ক্রোয়েশিয়ার প্রতিটি ম্যাচে গ্যালারিতে ছিলেন তিনি।

ক্রোয়েশিয়া যদি আসরের মহাবিস্ময় হয়ে থাকে তাহলে চমকের নাম রাশিয়া। যারা এই বিশ্বকাপের স্বাগতিক দল। আয়োজক দেশ হওয়ায় র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বকাপ অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে তলানিতে থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপ খেলতে পেরেছে। তাদের নিয়ে অবশ্য নিজ দেশের মানুষও খুব বেশি আশা করেনি। রাশিয়ানদের প্রত্যাশা ছিল বড় জোড় দ্বিতীয় রাউন্ড। কিন্তু তারা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলেছে। শেষ ষোলোতে তারা স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে টাইব্রেকার নামক ভাগ্য পরীক্ষায় ৪-৩ ব্যবধানের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। সেখানে ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে। ম্যাচ নিয়ে যায় টাইব্রেকারে। সেখানে অবশ্য ভাগ্যের কাছে হেরে যায় স্বাগতিকরা। ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় শেষ আট থেকে। তবে রাশিয়ার এমন পারফরম্যান্স গর্বিত করেছে গোটা জাতিকে।

গোলবন্যার আসরে আত্মঘাতীর মেলা : রাশিয়া বিশ্বকাপে ৬৪ ম্যাচে মোট ১৬৯টি গোল হয়েছে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০১৪ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৭১ গোল হয়েছিল। সদ্য সমাপ্ত আসরে অবশ্য দুটি গোল কম হয়েছে। রাশিয়ার মঞ্চে ১৬৯ গোলের মধ্যে সেট পিস থেকে এসেছে রেকর্ড ৬৯ গোল (সর্বোচ্চ)। এর আগে ২০০৬ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সেট পিস থেকে ৬২ গোল এসেছিল। রেকর্ড হয়েছে আত্মঘাতী গোলেও। এই আসরে ১২টি গোল এসেছে আত্মঘাতী থেকে। যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে সবচেয়ে বেশি আত্মঘাতী গোলের রেকর্ড। এবারের বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে এসেছে রেকর্ড ২২ গোল। দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি গোল করেছে বেলজিয়াম, ১৬টি। ব্যক্তিগতভাবে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন করেছেন সর্বোচ্চ ৬ গোল।

নায়ক যখন গোলরক্ষকরা : গোলবন্যার মধ্যেও কিছু কিছু গোলরক্ষক ছিলেন অসাধারণ। তাদের মধ্যে বেলজিয়ামের থিবাউট কোর্তোয়া, ফ্রান্সের হুগো লরিস, ক্রোয়েশিয়ার দানিয়েল সুভাসিচ ও ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড। এ ছাড়াও কোস্টারিকার কেইলর নাভাস ও মেক্সিকোর গুইলার্মো ওচোয়া দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছেন। তারা সবাই এক কিংবা একাধিক ম্যাচে অতিমানবীয় পারফরম্যান্স করেছেন। বিশেষ করে বেলজিয়ামের কোর্তোয়া। তিনি এক ব্রাজিলের বিপক্ষেই ৯টি সেভ করেছিলেন। বলতে গেলে তিনি একাই হারিয়ে দিয়েছিলেন ব্রাজিলকে। বিশ্বকাপে মোট করেছেন ২২টি সেভ। এ ছাড়া জাপানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে যে গোলটি করেছিল বেলজিয়াম সেটাও হয়েছিল তার বুদ্ধিমত্তার কারণে। টুর্নামেন্টজুড়ে নান্দনিক সব সেভ করে নিশ্চিত সব গোল বাঁচিয়েছেন তিনি। তাই গোল্ডেন গ্লাভসও উঠেছে তার হাতেই।

পিডিএসও/হেলাল