ফরাসি সাফল্যের মন্ত্রগাথা

প্রকাশ | ১৭ জুলাই ২০১৮, ০৮:১১ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৮, ০৯:৪০

অনলাইন ডেস্ক

স্বপ্নের একটা রাতই পার করল ফ্রান্স। পরশু বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় স্বর্গে উঠে ফরাসিরা। ঘরের মাঠে সৌরভ ছড়ানো ফরাসি বিপ্লব হলো রাশিয়ার রঙ্গমঞ্চেও। মস্কোর ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে কুড়ি বছর পর আবারো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফ্রান্স। ফরাসিদের এই সাফল্যের নেপথ্য নায়ক দিদিয়ের দেশম।

কুড়ি বছর আগে খেলোয়াড় ও অধিনায়ক ভূমিকায় সোনালি ট্রফির স্বাদ পেয়েছিলেন এই কিংবদন্তি। চার বিশ্বকাপ পর এবার কোচ হিসেবে বাজিমাত করছেন দেশম। দুই ভূমিকায় এই খেতাব জয়ের বিরল এক কীর্তি হলো তাতে। তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে দুই ভূমিকায় বিশ্বজয় করে গোটা ফুটবল দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছেন দেশম।

কিন্তু তার সাহসী সব সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছিল। দুই বছর আগে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তরুণ প্রতিভাকে বাদ দিয়েছিলেন তিনি। দেশের ইতিহাসে অন্যতম কিংবদন্তি করিম বেনজেমার ক্যারিয়ারটাই তো শেষ করে দিয়েছেন এই কোচ। তারও আগের কথা। গত বিশ্বকাপে সামির নাসরির মতো প্রতিভাকে ছাড়াই বিশ্বকাপে ফ্রান্স দলকে খেলিয়েছিলেন তিনি।

এসব সিদ্ধান্তই তার মুন্ডুুপাতের জন্য যথেষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়। তবে খেলোয়াড় ভূমিকায় এতটা আলোড়ন তুলতে পারেননি তিনি। কিন্তু নিজের কাজটা ঠিকঠাক করে গেছেন দেশম। কোচিংয়ে চারপাশের তীব্র সমালোচনা কান ভারি হয়ে উঠলেও কাউকে পাত্তা দেননি তিনি। অনেক সংগ্রাম করে কাঠখড় পুড়িয়ে দল বানিয়েছেন দেশম। যেই দলটায় তরুণদের আধিপত্য। পগবা, এমবাপ্পের মতো এসব ফুটবলাররাই রাশিয়া বিশ্বকাপে গেয়ে গেছেন তারুণ্যের জয়গান। কম বয়সী দল নিয়েও যে সোনালি ট্রফি জেতা যায় সেটার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন দেশম। বিশ্বজুড়ে এখন চলছে তার বন্দনা।

প্রশংসা পাওয়ারই কথা। এই দলটাকেই ২০১৬ ইউরোর ফাইনালে তুলেছিলেন দেশম। কিন্তু সেমিফাইনালে জার্মানিকে বিদায় করার আত্মতুষ্টি পেয়ে বসেছিল ফরাসিদের। সেটার চূড়ান্ত মাশুল বিশ্বকাপের ফাইনালে দিতে হয়েছে ফরাসিদের। সেন্ট ডেনিসের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের গোলে পর্তুগালের বিপক্ষে কপাল পুড়ে তাদের। দুই বছরের ব্যবধানে আরো একটি ফাইনাল। এবার অবশ্য ম্যাচের আগে থেকেই সর্বোচ্চ সতর্ক ছিলেন দেশম।

ছাত্রদের আগেই উচ্ছ্বাসে গা না ভাসিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। তার দিকনির্দেশনা অবশ্য ফ্রান্সের এই প্রজন্মের ফুটবলাররা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। গুরুর দেওয়া এসব টনিকই ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের নেপথ্য কারণগুলোর মধ্যে প্রধান হয়ে উঠেছিল।

দেশমের দলের বিশ্বজয়ের উৎসবটা রাশিয়ার খন্ড খন্ড জায়গায় হলেও আসল উদ্যাপনটা চলছে ফ্রান্সে। প্যারিস থেকে লিঁল, মার্শেই থেকে মপঁয়ে সব খানেই উৎসবের নীল ঢেউ উঠেছে। কুড়ি বছর পরে ফ্রান্সের ফের বিশ্বজয়ের আবেগের স্রোত তখন বয়ে যাচ্ছে ইতিহাস প্রসিদ্ধ প্যারিসের রাজপথে। কিন্তু সব আবেগ যেন কেড়ে নিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর। পরশুর মস্কোর ফাইনালে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে লুঝনিকি স্টেডিয়ামের ভিআইপি গ্যালারিতে ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্রাবার কিতারোভিচকে চুম্বন করলেন তিনি। একবার নয়, তিন তিনবার। সঙ্গে উষ্ণ আলিঙ্গন। বিশ্বজয়ীদের ছাপিয়ে ফাইনালে রাতে প্রাদপ্রদীপে চলে এলেন দুই দেশের দুই রাষ্ট্রপ্রধান।

গ্যালারি থেকে যখন মাঠের বিজয় মঞ্চে নেমে এলেন তারা তখনই কেঁদে উঠল মস্কোর আকাশ। আকাশ ভেঙে নেমে এলো বৃষ্টি। এর সঙ্গে স্যাম্পেনের বৃষ্টি। ড্রেসিংরুম, সংবাদ সম্মেলন কক্ষ কিংবা সবুজ প্রান্তর কোথায় না উল্লাস করেছেন ফরাসি ফুটবলাররা। তাদের আনন্দে শামিল হয়ে সমর্থকরাও করেছেন পাগলামি। কত লোকের হাতে ভুভুজেলা, কেউ বা গান গাইছে। আকাশ আলোয় আলো আতশবাজিতে। প্যারিস, মস্কোতে রাত নামলেও ফরাসি ফুটবলার ও সমর্থকদের চোখে রাত নামেনি।

এসব উল্লাসের মধ্যমণি ফুটবলারদের সঙ্গে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁও। অভিজাত বলে বদনাম রয়েছে। অনেকের মতে, সাধারণের কাছের মানুষ নন। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতে সেসব অভিযোগই যেন ধুয়ে মুছে গেল। গ্রিজম্যান-পগবা-এমবাপ্পেদের জয়ের আনন্দে গ্যালারি থেকে দুই হাত তুলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন তিনি। মাঠে নেমে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজলেন। এরপর ড্রেসিং রুমে গিয়ে ফুটবলারদের সঙ্গে ‘ড্যাব মুভ’ও করে দেখালেন। বিশ্বজয়ের রাতে ফরাসি প্রেসিডেন্টকে নতুন করে দেখল গোটা দুনিয়া। বৃষ্টিকে পরোয়া না করে ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কিতারোভিচকে পাশে নিয়ে ভিজলেন, উচ্ছ্বাস করলেন। এক পর্যায়ে তার খুব কাছেই চলে এসেছিল কিতারোভিচ। ফাইনালের সব রোমাঞ্চ ছাপিয়ে গোটা দুনিয়ার চোখ আটকে গেল সেখানেই। সেখানেই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো আবার ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

পিডিএসও/হেলাল