নাটকীয়তায় ভরপুর অবিস্মরণীয় ফাইনাল

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৯, ০৯:১৮ | আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৯, ১১:২৪

সাহিদ রহমান অরিন

অবিশ্বাস্য, অভূতপূর্ব, অভাবনীয়, অকল্পনীয়, অননুমেয় কিংবা অতুলনীয়। এ রকম কোনো বিশেষণই হয়তো এই ম্যাচটার জন্য যথেষ্ট নয়। এক বাক্যে—সর্বকালের সেরা ফাইনাল। যে ফাইনালে সেয়ানে-সেয়ানে টক্কর শেষে বিশ্ব পেল ক্রিকেটের নতুন সম্রাটদের। ক্রিকেট সাম্রাজ্যের নবসম্রাট আর কেউ নয়; খেলাটার জনক, উদ্ভাবক ও রক্ষক ইংল্যান্ড।

পুরো একশ ওভারের খেলা শেষেও যখন দুদলকে আলাদা করা গেল না, তখন পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সুপার ওভারে গড়াল ম্যাচ। রুদ্ধশ্বাস সেই সুপার ওভারেও চরম নাটকীয়তা। ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড দুদলই তুলল সমান ১৫ রান। কিন্তু বাউন্ডারি গণনায় এগিয়ে থাকায় চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরল ইংলিশরাই। ক্রিকেট তীর্থভূমি লর্ডসে স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর ফাইনাল শেষে শিরোপা ধরল ইয়ন মরগান বাহিনী।

অন্যদিকে টানা দুবার স্বপ্নভঙ্গ হলো কিউইদের। শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে ইংল্যান্ড যতটা সৌভাগ্যবান, নিউজিল্যান্ড যেন ততটাই দুর্ভাগা! ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুটি ফাইনাল হারল উইলিয়ামসন-টেলররা। অথচ এই টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটা মুহূর্ত শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ে গেছে তারা। সামান্য পুঁজি নিয়ে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রতিপক্ষকে দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছে। রবিবাসরীয় ফাইনালেও মাথার ঘাম পায়ে ফেলে লড়েছে কিউইরা। কিন্তু ভাগ্যদেবী সহায় হলেন না।

টুর্নামেন্টের শেষ বল। দরকার ২ রান। জোফরা আর্চারের ইয়র্কার লেংথের ডেলিভারিটাকে লেগ সাইডে ঠেলে দিয়ে ছুটলেন গাপটিল ও নিশাম। প্রথম রান অনায়াসেই নেওয়ার পর ভাগ্য নির্ধারণী শেষ রানের জন্য ভোঁ-দৌড়। কিন্তু রয়ে গেল মাত্র কয়েকটা ইঞ্চির ব্যবধান। নিউজিল্যান্ড আর বিশ্বকাপ শিরোপার মধ্যে শেষ পর্যন্ত ব্যবধান হয়ে দাঁড়াল ওই কয়েকটা ইঞ্চি। গাপটিল দৌড়ে দুটো রান পুরো করতে পারলে ট্রফিতে ইংল্যান্ড নয়, বরং লেখা হতো নিউজিল্যান্ডের নাম। তাই বলতেই হচ্ছে—ইংল্যান্ডের কাছে নয়, নিউজিল্যান্ড হেরে গেল ভাগ্যের কাছেই। নইলে সুপার ওভারেও ইংল্যান্ডের সমান রান করেও কেন পরাজিত বীর হয়ে মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়তে হবে নিশাম-গাপটিলদের! কেনই বা ভাগ্যের খেয়ালি শিকার হয়ে শেষ ওভারে ওরকমভাবে চারটি অতিরিক্ত রান পাবে ইংল্যান্ড!

খেলাটা হয়তো সুপার ওভার অবধি গড়াতই না, যদি ইংল্যান্ডের ইনিংসের শেষ ওভারে ভাগ্য ওরকমভাবে বিদ্রƒপ না করত ব্ল্যাক ক্যাপসদের সঙ্গে। ৩ বলে দরকার ৯ রান, স্ট্রাইকে বেন স্টোকস। ওদিকে বল হাতে ট্রেন্ট বোল্ট। চতুর্থ বলটা ইয়র্কার লেংথেই করেছিলেন বোল্ট, পড়িমরি করে কোনো রকমে দুই রানই পূর্ণ করতে পারছিলেন না স্টোকস। অথচ বাউন্ডারি থেকে করা গাপটিলের থ্রোটা উইকেটকিপার পর্যন্ত না পৌঁছে স্টোকসের ব্যাটে লেগে বাউন্ডারি হয়ে গেল! যেখানে দুই রানই হয় না, সেখানে ওই বলে ইংল্যান্ড পেয়ে গেল ছয়টি রান!

ইংল্যান্ডের দরকার তখন ২ বলে ৩। অথচ ওই অবস্থাতেও আশা ছাড়েনি উইলিয়ামসনের দল। পঞ্চম বলে ২ রান নিতে গিয়ে রান আউট আর্চার, কিন্তু স্ট্রাইকে ঠিকই ফিরলেন স্টোকস। শেষ বলে ২ নিলেই চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড, এমন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়েও চাপে ভেঙে পড়েনি নিউজিল্যান্ড। শেষ বলে জোড়া রান নিতে গিয়ে এবার রানআউট মার্ক উড। ইতিহাসে প্রথমবার ফাইনাল হলো টাই!

রোববার ক্রিকেটের মক্কায় টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা নিউজিল্যান্ডকে ৫০ ওভারে ২৪১ রানে আটকে রাখে ইংল্যান্ড। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৫৫ রান করেন হেনরি নিকোলস। এ ছাড়া ৪৭ রান করেন টম ল্যাথাম। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৮৬ রানে জেসন রয়, জো রুট, জনি বেয়ারস্টো ও অধিনায়ক ইয়ন মরগানের উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় ইংল্যান্ড। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে দলকে খেলায় ফেরান বেন স্টোকস ও জস বাটলার। পঞ্চম উইকেটে তারা ১১০ রানের জুটি গড়েন। এরপর ৭ রানের ব্যবধানে বাটলার ও নতুন ব্যাটসম্যান ক্রিস ওকসের উইকেট হারিয়ে ফের চাপের মধ্যে পড়ে যায় ইংল্যান্ড। তবে অনবদ্য ব্যাটিং করে যান বেন স্টোকস।

এর আগে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে ২৯ রানে ওপেনার মার্টিন গাপটিলের উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড। গত বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান করে যাওয়া কিউই এ ওপেনার এবারের আসরে চরম ব্যর্থ। ১০ ম্যাচ খেলে মাত্র ১৮৬ রান করেন। এরপর ওয়ান ডাউনে নামা কেন উইলিয়ামসনের সঙ্গে ৭৪ রানের জুটি গড়েন হেনরি নিকোলস। বিশ্বকাপে ধারাবাহিক রান করে যাওয়া নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক ৫৩ বলে ৩০ রান করে ফেরেন। ইনিংসের শুরু থেকে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে যাওয়া হেনরি নিকোলস লিয়াম প্ল্যাঙ্কেটের গতির বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন। তার আগে ৭৭ বলে চারটি চারের সাহায্যে ৫৫ রান করেন তিনি। এরপর ২৩ রানের ব্যবধানে ফেরেন নিউজিল্যান্ডের অন্যতম ভরসা রস টেইলর। বিশ্বকাপে কেন উইলিয়ামসনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান করে যাওয়া টেইলর এদিন সুবিধা করতে পারেননি। ৩১ বলে ১৫ রানে ফেরেন তিনি। তবে ব্যাটিংয়ে নেমে ভালোই খেলছিলেন জেমস নিশাম। ২৫ বলে ১৯ রান করেন প্ল্যাঙ্কেটের দ্বিতীয় শিকার হয়ে ফেরেন তিনি। ব্যাটসম্যানদের আসা-যাওয়ার মিছিলে ব্যতিক্রম ছিলেন টম ল্যাথাম। তার ৫৬ বলের ৪৭ রানের সুবাদে ২৪১ রান তুলতে সক্ষম হয় নিউজিল্যান্ড।

তবে আনন্দ-বেদনা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, জল্পনা-কল্পনা আর চরম নাটকীয়তার পর ক্রিকেট দেবতা খেলাটার জনক ইংল্যান্ডকেই প্রথমবারের মতো শিরোপা জয় উদ্যাপনের সুযোগ করে দেন। এর মধ্য দিয়ে আগামী চার বছরের জন্য ক্রিকেটের নতুন শাসকদের পেয়ে গেল বিশ্ব।

ইংল্যান্ড একাদশ : জেসন রয়, জনি বেয়ারস্টো, জো রুট, ইয়ন মরগান (অধিনায়ক), বেন স্টোকস, জস বাটলার (উইকেটরক্ষক), ক্রিস ওকস, লিয়াম প্ল্যাঙ্কেট, আদিল রশিদ, জোফরা আর্চার এবং মার্ক উড।

নিউজিল্যান্ড একাদশ : মার্টিন গাপটিল, হেনরি নিকোলস, কেন উইলিয়ামসন (অধিনায়ক), রস টেলর, টম ল্যাথাম (উইকেটরক্ষক), জিমি নিশাম, কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম, মিচেল স্যান্টনার, ম্যাট হেনরি, লকি ফার্গুসন এবং ট্রেন্ট বোল্ট।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

নিউজিল্যান্ড : ২৪১/৮, ৫০.০ ওভার

নিকোলস ৫৫, ল্যাথাম ৪৭, উইলিয়ামসন ৩০

ওকস ৩৭/৩, প্ল্যাঙ্কেট ৪২/৩, আর্চার ৪২/১

ইংল্যান্ড : ২৪১ অল আউট, ৫০.০ ওভার

স্টোকস ৮৪*, বাটলার ৫৯, বেয়ারস্টো ৩৬

নিশাম ৪৩/৩, ফার্গুসন ৫০/৩, গ্র্যান্ডহোম ২৫/১

সুপার ওভার

ইংল্যান্ড : ১৫/০

নিউজিল্যান্ড : ১৫/১

ফল : বাউন্ডারি গণনায় এগিয়ে থাকায় ইংল্যান্ড জয়ী

ফাইনাল সেরা : বেন স্টোকস (ইংল্যান্ড)

টুর্নামেন্ট সেরা : কেন উইলয়ামসন (নিউজিল্যান্ড)

পিডিএসও/হেলাল