ইংল্যান্ডের হারে লাভ হলো টাইগারদের

সবার আগে সেমিতে অস্ট্রেলিয়া

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৯, ০৭:৫১

সাহিদ রহমান অরিন

রাউন্ড রবিন পর্বের শেষভাগে এসে বিশ্বকাপ আসর হুট করেই জমে উঠেছে। ফলে নিজেদের ম্যাচ নিয়ে ছক-কষাকষির পাশাপাশি অন্য ম্যাচেও চোখ রাখতে হচ্ছে দলগুলোকে। কাল ক্রিকেটের তীর্থভূমি লর্ডসে দুই আজন্ম শত্রু ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া লড়াইয়ের শুরু থেকেই মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ ছিল তামিম ইকবালের। বাংলাদেশ ওপেনার স্কোর দেখতে দেখতে বলছিলেন, ‘৩৫০ করতে হবে, আজকে (কালকে) আমি অস্ট্রেলিয়ার সাপোর্টার।’ পাশেই দাঁড়ানো অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা তামিমকে থামিয়ে মজা করে বললেন, ‘আমি তো ছোট থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ভক্ত!’

ম্যাশ-তামিমের এই ঠাট্টা যে শুধুই রসিকতা অর্থে নয়, সেটা বোধহয় কারো বুঝতে বাকি নেই। ইংল্যান্ড জিতলে টাইগারদের সেমি-স্বপ্ন যে ফিকে হয়ে যেত! তাই দুই পাণ্ডবের মতো ১৬ কোটি বাংলাদেশিও কাল অজিদেরই সমর্থন দিয়ে গেছেন। দিন শেষে টাইগারভক্তদের চাওয়া পূরণও হয়েছে।

হট ফেভারিট, পরাক্রমশালী স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে গতকাল মঙ্গলবার ফের শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালের টিকিটও পেয়ে গেছে তারা। চিরশত্রুদের অজিরা হারিয়েছে ৬৪ রানের বড় ব্যবধানে। সাত ম্যাচে তাদের পয়েন্ট এখন ১২। তাদের থেকে ৪ পয়েন্ট কম নিয়ে চতুর্থ স্থানেই রয়ে গেছে ইংল্যান্ড। সমানসংখ্যক ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে এখন থ্রি লায়ন্সদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে বাংলার বাঘেরা। তার মানে, ইংলিশদের পরাজয়ে বাংলাদেশের সেমিতে ওঠার সমীকরণটা আরেকটু সহজ হলো। 

জেসন রয়বিহীন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের লক্ষ্যটা বেশ বড়ই ছিল, ২৮৬। এই রান তাড়া করতে নেমে জেসন বেহরেনডর্ফের ইনসুইংয়ে দ্বিতীয় বলেই মিডল স্টাম্প হারান জেমস ভিন্স। রানের খাতা খোলার আগেই ১ উইকেট নেই ইংল্যান্ডের। ৪ ওভারের মধ্যে ফিরেছেন ভরসার প্রতীক জো রুটও। করেছেন মাত্র ৮ রান। শুরুতেই জোড়া উইকেট খুইয়ে ওই যে চাপে পড়ল আয়োজকরা, খানিক বাদে সেটা রূপ নিল বিপর্যয়ে। যখন ভয়ংকর হয়ে ওঠার আগেই প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন অপর ওপেনার জনি বেয়ারস্টো (২৭) ও অধিনায়ক ইয়ন মরগানকেও (৪)। ইংলিশদের প্রথম ৪ উইকেট ভাগাভাগি করে নিয়েছেন অজিদের দুই বাঁহাতি পেস অস্ত্র মিচেল স্টার্ক ও জেসন বেহরেনডর্ফ। মার্কাস স্টয়নিস একটা শিকার না ধরলে হয়তো চিরশত্রুদের সব কটি উইকেট সমানভাগে ভাগ করে নিতেন এই দুজন। সেটা হয়নি বলে স্টার্ক-বেহরেনডর্ফের মনে কোনো আক্ষেপ নেই। স্টার্ক শেষ পর্যন্ত শিকার ধরেছেন ৪টি। তাকে ছাড়িয়ে গেছেন বেহরেনডর্ফ। ৪৪ রান খরচায় ৫ উইকেট নিয়েছেন নাথান কুল্টার-নাইলের বদলে সুযোগ পাওয়া এই দীর্ঘদেহী। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটাই তার সেরা বোলিং ফিগার। নিজের ক্যারিয়াটাকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ড আর ভেন্যু হিসেবে ক্রিকেটের মক্কা লর্ডসকেই বেছে নিয়েছেন বেহরেনডর্ফ।

চার সতীর্থকে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে দেখে কিছু একটা করার পণ নিয়ে ক্রিজে পা ফেলেছিলেন সহ-অধিনায়ক জস বাটলার। বেন স্টোকসকে সঙ্গে নিয়ে বিপর্যয়টা সামাল দিচ্ছিলেন ভালোই। কিন্তু বাটলার (২৫) খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগেই স্টয়নিসের বলে খাজার হাতে বন্দি। অবশ্য বাটলারের বিদায়ের পরও দমে যায়নি ইংল্যান্ড। নতুন সঙ্গী হিসেবে ক্রিস ওকসকে পেয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন স্টোকস। কিন্তু স্টার্কের চোখ ধাঁধানো রিভার্স সুইং স্টোকসের স্টাপ উপড়ে ফেললে শেষ হয় ৮৯ রানের সংগ্রামী ইনিংস। এর মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ড আক্ষরিক অর্থে ম্যাচ থেকেও ছিটকে পড়ে। স্টোকসের বিদায়ের পর স্বাগতিকরা আর মাত্র ৪৪ রান যোগ করতে পেরেছে। ইংল্যান্ডের প্রথম চার উইকেটের মতো শেষ চার উইকেটও ভাগ করে নিয়েছেন সেই স্টার্ক ও বেহরেনডর্ফ।

এর আগে ক্রিকেটের তীর্থভূমি লর্ডসে টস জিতে প্রথমে অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাট করতে পাঠান মরগান। উইলোখণ্ড হাতে ১৮ ওভারে শত রানের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়া। চলতি বিশ্বকাপে ওপেনিং জুটিতে এই নিয়ে তিনবার ১০০ রানের পার্টনারশিপ গড়লেন অ্যারোন ফিঞ্চ ও ডেভিড ওয়ার্নার। ফিফটি হাঁকানোর পরপরই ওয়ার্নার থামলেও দলপতি ফিঞ্চ সৈ-সৈ সেঞ্চুরি করেই ফিরেছেন। এদিন রান সংগ্রাহকদের তালিকায় শীর্ষে থাকা টাইগার অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে ছাড়িয়ে গেছেন দুজনই। ওয়ার্নার আউট হলে দ্বিতীয় উইকেটে জুটিতে ৫০ রান যোগ করেন ফিঞ্চ ও উসমান খাজা। ব্যক্তিগত ২৩ রানে খাজা বোল্ড আউট হন বেন স্টোকসের বলে। এরপরই চলতি বিশ্বকাপের নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নেন ফিঞ্চ। ১১টি চার ও ২টি ছয়ের মারে সাজানো ছিল ফিঞ্চের ইনিংস। এরপরই পথ হারিয়ে ফেলে অজিরা। ইংলিশ বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে রান তোলার গতি কমে যায় তাদের। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (১২) ও মার্কাস স্টোইনিস (৮) দ্রুতই বিদায় নেন। স্কোর বোর্ডে রান তখন ৫ উইকেটে ২২৮ রান।

স্টিভেন স্মিথও ইনিংস বড় করতে পারেননি। ৩৮ রান করে ওকসের বলে আর্চারের হাতে ক্যাচে পরিণত হন স্মিথ। শেষ দিকে অ্যালেক্স ক্যারির ২৭ বলে ৩৮ রানের সুবাদে ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৮৫ রান তোলে অস্ট্রেলিয়া। ইংলিশ বোলার ওকস দুটি এবং আর্চার, মার্ক উড, বেন স্টোকস ও মঈন আলি একটি করে উইকেট নেন।

‘দুই মোড়ল’ ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া যখন মুখোমুখি তখন বিশ্বকাপের মঞ্চে যে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যাবে, তেমন প্রত্যাশাতেই ছিল ক্রিকেটবিশ্ব। কিন্তু আয়োজক হওয়ার পরও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ বোধহয় ক্রিকেট অনুরাগীদের একটু হতাশই করেছে। কিন্তু ম্যাচটা একপেশে হওয়ায় টাইগারভক্তদের কী আসে-যায়? সেমিতে ওঠার সমীকরণ যখন এতটা জটিল, তখন ইংলিশদের এই ব্যর্থতা বাংলাদেশের আরেকটা জয়ের মতোই! 

পিডিএসও/হেলাল