‘বিনাযুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদেনী’

প্রকাশ | ১৪ জুন ২০১৮, ১১:২৪ | আপডেট: ১৪ জুন ২০১৮, ১১:৪১

মনসুর হেলাল

আপনি ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা? আবার এমন প্রশ্নও হতে পারে, আপনি আর্জেন্টিনা না ব্রাজিল? কারণ, এখানে দেশের নাম উচ্চারণেও আগে-পিছের ব্যাপার আছে। কারণ, আপনি প্রথমে কোন দেশের নাম উচ্চারণ করলেন, সমর্থকরা সেসব বিষয়েও তীক্ষ্ম নজর রাখেন। কয়েক দশক আগে আমাদের দেশেও আবাহনী-মোহামেডানের খেলা নিয়ে সারাদেশে এ ধরনের আবেগ বিরাজ করত। খেলা শুরুর কয়েক দিন আগে গোটা দেশ ছেয়ে যেত সাদাকালো ও নীল-হলুদ পতাকায়, যা এখন শুরু হয় বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর আগে।

দুুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে ফুটবলের যে ঐতিহ্য ছিল, তা আজ কেবল ইতিহাসেরই অংশ। একসময় সালাউদ্দিন, এনায়েত, সলিমুল্লাহ, নওশের, কায়কোবাদ, হাফিজ, নান্নু, মঞ্জু, জহির, প্রতাপ, টিপু, সান্টু, গাজী, রামা, ভানু, বাদল রায়, আবুল, মুকুল, কায়সার হামিদ, সালাম, মুন্না, আশিষ, ইউসুফ, জনি, বাবুল, অমলেশ, এমিলি, কানন, সাব্বির, ওয়াসিমদের মতো ফুটবলাররা মাঠ মাতাতেন। আজ আর সেই খেলোয়াড়দের ছায়াও দেখা যায় না। ভুটান, মালদ্বীপের মতো দেশগুলো যখন বাংলাদেশের সঙ্গে চার-পাঁচটা করে গোল হজম করত, এখন তার উল্টোটা হচ্ছে বাংলাদেশের বেলায়। আরো দুঃখজনক হলো, বর্তমানে বাংলাদেশে ছেলেদের কোনো জাতীয় ফুটবল দল নেই। ভাবতেও অবাক লাগছে, প্রায় ২০ কোটি মানুষের এই দেশে ১১ জন ফুটবলারকে খোঁজে পাচ্ছে না বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও তার নিয়ন্ত্রক জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো! আমরা আর কত দিন অন্যদের খেলা দেখে তৃপ্তির ঢেকুর তুলব? এ প্রশ্নের জবাব আপাতত তোলা থাক, সংগত কারণেই ফিরে আসি শুরুর কথায়।

ক্রিকেটে পাকিস্তান-ভারত এবং ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া যেমন কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না, তেমনি বিনাযুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদেনীর মতো ফুটবলেও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ঠিক তেমনি। একই উপমহাদেশ, উপর্যুপরি প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও পানি ও তেলের মতো বৈরী এই দুই দেশের সম্পর্ক। ইতিহাস বলছে, এই দুদেশ ফুটবলে জনপ্রিয়তার লেবেল গায়ে জড়ানোর আগেই চরম দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। শুধু তাই নয়, দিনে দিনে তার উত্তাপ আরো বেড়েই চলেছে, যা একসময় শুধু এ দুদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে তাদের কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, অপেক্ষাকৃত যেকোনো দুর্বল দলের কাছে হারলেও ব্রাজিলের কাছে আর্জেন্টিনা কিংবা আর্জেন্টিনার কাছে ব্রাজিল হারতে রাজি নয়।

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সর্বপ্রথম মুখোমুখি হয় ১৯১৪ সালে। আর্জেন্টিনার ঘরের মাঠে। সেবার ৩-০ গোলের জয়ে শুরুর হাসি হেসেছিল আর্জেন্টিনা। সেইসঙ্গে সর্বশেষ দেখায়ও ব্রাজিলের মাঠে ১-০ গোলের জয় আর্জেন্টাইনদের। মজার ব্যাপার হচ্ছে, চিরশত্রুদের এ দুটো ম্যাচই ছিল ‘প্রীতিম্যাচ’! শুরু আর সারার গল্পে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও ভেতরের ম্যাচগুলোর পরিসংখ্যানে ব্রাজিলের জয়জয়কার। দ্বৈরথে সবচেয়ে বেশিবার জিতেছে ব্রাজিল। ৪৪ বার। সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়ও ব্রাজিলের। ৬-২।


আজেন্টিনা-ব্রাজিলের প্রসঙ্গ এলে সংগত কারণে শুরু হয় দুই দেশের দুই কিংবদন্তি পেলে ও ম্যারাডোনার মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে ভক্ত-সমর্থকদের নানা বাহাস। কারো দৃষ্টিতে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় পেলে, আবার কারো দৃষ্টিতে ম্যারাডোনা। তবে অনেকেই একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন, নিজেদের সময় তারা দুজনই সেরা


১৯৪৬ সালের কোনো এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দশ বছর এ দুদল এক অপরের বিপক্ষে মাঠে নামেনি। তবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার শত্রুতার শুরু ১৯২০ সাল থেকে। ওই বছরের ১২ অক্টোবর বুয়েন্স আয়ার্সে অনুষ্ঠিত এক প্রদর্শনী ম্যাচে আর্জেন্টাইন মিডিয়া ব্রাজিলিয়ানদেন ‘কালো বানর’ বলে অভিহিত করে। এতে চরম অপমানিত বোধ করে তারা। যার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বেশ কিছু ব্রাজিলিয়ান ম্যাচটিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ব্রাজিলিয়ানদের প্রথম একাদশ সাজানো কঠিন হয়ে গড়ে। শেষমেশ আটজনের দল নিয়ে মাঠে নামে ব্রাজিল। ব্রাজিলিয়ানদের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষিপ্ত হয়ে আর্জেন্টাইনরাও আটজনের দল নিয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেয়। খেলায় ৩-১ গোলে জয় পায় স্বাগতিকরা।

১৯৪৫ সালে এই দুই দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় এক ঠ্যাং ভাঙাভাঙির ম্যাচ। সে ম্যাচে ৬-২ গোলে জয় পেয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু এ জয়ের পেছনে ছিল তাদের অবৈধপন্থা। কথিত আছে, ব্রাজিলিয়ান একাডেমির মেনেজেস অবৈধ পথের আশ্রয় নিয়ে আর্জেন্টিনার বাতাগলিয়োরোর ঠ্যাং ভেঙে দিয়েছিল। ফলে সে ওই ম্যাচ খেলতে পারেনি। যদিও এটা অনেকের মতে ছিল নিছক দুর্ঘটনা। কিন্তু কে শুনে কার কথা। ম্যাচটি সংঘর্ষপূর্ণ হতে যা যা উপকরণের প্রয়োজন ছিল, তার সব রসদ নিহিত ছিল ওই ঘটনায়। ফলে অকথ্য গালাগালি ও অসংখ্য ফাউলে পরিপূর্ণ ছিল ম্যাচটি। যার ধকল এখনো এই দুই দলকে পোহাতে হচ্ছে। এই দুই দেশের হাতুড়ে-বাটালের সম্পর্ক নিয়ে গল্পকথার কোনো শেষ নেই। এমন আরেকটি হলো, ১৯৩৯ সালে পুলিশ পাহারায় মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টাইন দল। কারণ, ব্রাজিলকে দেওয়া একটা পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক এবং শেষমেশ আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক ছাড়াই পেনাল্টি থেকে ফাঁকা জালে গোল করে ব্রাজিল।

আজেন্টিনা-ব্রাজিলের প্রসঙ্গ এলে সংগত কারণে শুরু হয় দুই দেশের দুই কিংবদন্তি পেলে ও ম্যারাডোনার মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে ভক্ত-সমর্থকদের নানা বাহাস। কারো দৃষ্টিতে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় পেলে, আবার কারো দৃষ্টিতে ম্যারাডোনা। বলাই বাহুল্য, তাদের দুজনের মধ্যে আসলে কে সেরা এ নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। তবে অনেকেই একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন, নিজেদের সময় তারা দুজনই সেরা। কিন্তু তাও যেন উভয় দেশের সমর্থকরা মানতে নারাজ। এ বিতর্কের সুরাহা করতে ২০০০ সালে ফিফা ভোটাভুটির ব্যবস্থা করেছিল। ইন্টারনেটের এ ভোটের ফল দেখে ফিফার চক্ষু ছানাবড়া! তাদের ভাবনায় ছিল জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ভোটে। কিন্তু পেলে সেখানে পাত্তাই পায়নি। ম্যারাডোনা যেখানে ৫৩ দশমিক ৬ ভাগ ভোট পেলেন, সেখানে পেলের দিকে জমা পড়ল মাত্র ১৮ দশমিক ৫৩ ভাগ ভোট। এমন ফলাফল মোটেই প্রত্যাশা করেনি ফিফা। তাই আবার ভোটের আয়োজন করল। এবার আর ইন্টারনেটে নয়, ফিফা ‘ফুটবল ফ্যামিলি’ নামে একটা কমিটি তৈরি করল। তারাই থাকল শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় নির্বাচনে। এবার আর ম্যারাডোনা নয়, নির্বাচিত হলো পেলে। তবে এ ফল মেনে নেয়নি ম্যারাডোনার সমর্থকরা। আর্জেন্টিনারা এ ফলাফলকে তামাশা বলে আখ্যায়িত করল। বলতে শুরু করল, এটা পেলের প্রতি ফিফার প্রতিদান। কারণ, ফিফা তাদের সব কাজেই পেলের সমর্থন পেয়ে এসেছে। আর সম্পূর্ণ উল্টো ম্যারাডোনা। তিনি কোনো কাজেই ফিফাকে সমর্থন দেননি, বরং সুযোগ পেলেই ফিফার মুণ্ডুপাত ছাড়েননি এবং এখনো তাই করেন। সে তুলনায় পেলে অনেক নমনীয়। যাই হোক, পেলে ও ম্যারাডোনার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। বরং দিনে দিনে তাতে আরো ঘৃতাহুতি দেওয়া হচ্ছে।

তবে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের দ্বন্দ্ব যা-ই থাকুক, এই উভয় দলেই ছিলেন পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, রিভেলিনিও, সক্রেটিস, জিকো, কারেকা, কাকা, কাফু, রোনালদিনহো, রোনালদো, নেইমার, ফিওল, জানেত্তি, কেম্পেস, মোরেনো, বাতিস্তুতা, ডি স্টেফানোর মতো বিশ্বনন্দিত অসংখ্য খেলোয়াড়। তাদের ক্রীড়াশৈলী যুগ যুগ ধরে নবীনদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা যে, যে দলই সমর্থন করুন এটা একান্তই তাদের ভালোলাগার বিষয়। এখানে অন্যের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে আমরা চাই, কোনো ভালোলাগাই যেন অন্ধত্বের পর্যায়ে না যায়। আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের খেলা মানেই চিরায়ত সৌন্দর্যের প্রকাশ। তাই সব শত্রুতা ভুলে বারবারই দেখতে চাই এই দুই দলের নান্দনিক দ্বৈরথ।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
munsurhelal70@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল